১৯৭১ সালে চেয়ারম্যান মাও-সে-তুংয়ের গণচীন পাকিস্তানি গণহত্যায় নিশ্চুপ থেকেছে। ইয়াহিয়াকে অকাতরে দিয়েছে সামরিক সাহায্য। বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকাতে জাতিসংঘে নিয়েছে কট্টর অবস্থান।
তৃতীয় বিশ্বের প্রতিনিধি ও বিপ্লবীদের বন্ধু চীনের এই ন্যক্কারজনক ভূমিকা আজও বিস্ময় জাগায় বিশ্বের প্রতিটি বিবেকবান মানুষের মনে। যে দেশ শত বছর ধরে জাপান ও ব্রিটিশ শাসনে নিপীড়িত, বর্বর গণহত্যার শিকার সেই দেশ কীভাবে পাকিস্তানের দোসর হলো, তা সত্যিই গবেষণার বিষয়।
বাঙালির যুদ্ধদিনে গণচীন শত্রুতাপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দেশটির সঙ্গে অনেক আগে থেকেই বাংলাদেশের উষ্ণ সম্পর্ক ছিল। পাকিস্তান আমলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দুইবার চীন সফর করেছেন। মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী চীনপন্থি রাজনীতি করেছেন। চীনের চেয়ারম্যান মাও-সে-তুংয়ের সঙ্গে ভাসানীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। এ ছাড়া চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, সমাজ সংস্কার ও রাজনীতি অনুসরণ করতেন বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। কিন্তু তারপরও বৈশি^ক রাজনীতির কূটচালে চীন পাকিস্তানকে ঘৃণ্য সমর্থন দিয়েছে। যা অব্যহত ছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ শুরু করে ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ পাওয়া পর্যন্ত।
২৫ মার্চ কালরাতে বর্বর গণহত্যা ও সাড়ে ৭ কোটি মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার হরণের প্রচেষ্টায় পকিস্তানের বিরুদ্ধে বিশ^ব্যাপী নিন্দা শুরু হয়। ভারত, সোভিয়েত রাশিয়া থেকে শুরু করে বিশে^র বিবেকসম্পন্ন রাষ্ট্রগুলো সামরিক শক্তি প্রয়োগের নিন্দা করে। এ সময় চীনের নীতি ছিল ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’। এমন বাস্তবতায় চীনকে শক্তভাবে পাশে চায় পাকিস্তান। দেশটির প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এ বিষয়ে পদক্ষেপ চেয়ে ৩০ মার্চ চীনের প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেন। এর বিপরীতে তখনকার চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই ৯ এপ্রিল পাকিস্তানকে একটি চিঠি দেন। যাতে তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা ও জাতীয় সংহতির কথা উল্লেখ করেন। তবে মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে সে সময় চীনা প্রধানমন্ত্রী জোরালো বা পরিষ্কারভাবে কিছু বলেননি। বাংলার মাটিতে পাকিস্তানি বর্বর গণহত্যা বন্ধে চীনের কোনো আগ্রহ ছিল না। অন্যদিকে যুদ্ধের সময় মওলানা ভাসানী সাহায্য চেয়ে বন্ধু মাও-সে-তুংকে চিঠি লিখলেও নিরুত্তর ছিল গণচীন। এমনকি চীনের সরকার নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমে বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে একটি শব্দও প্রকাশিত হয়নি। তবে ১ এপ্রিল চীনা দৈনিক পিপলস ডেইলিতে একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল, যাতে পূর্ব পাকিস্তানের সংঘাতকে দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় হিসেবে অভিহিত করা হয়। অন্যদিকে অব্যাহত ছিল সামরিক সহায়তা।
১৯৭১ সালে বাংলার মাটিতে বর্বর গণহত্যায় পাকিস্তানি বাহিনী যেসব অস্ত্র ব্যবহার করেছে, সেগুলোর বেশিরভাগই ছিল চীনা উপহার। এ ছাড়া পাকিস্তানি সেনাদের ব্যবহার করা প্রায় প্রতিটি বুলেটেই লেখা ছিল মেড ইন চায়না। ১৯৬২ সালে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ ও ১৯৬৯ সালে সোভিয়েত রাশিয়ার সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষের পর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় চীন পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করে। আর ৬০’এর দশকের মাঝামাঝিতে দেশটি পাকিস্তানকে সামরিক সরঞ্জাম দেওয়া শুরু করে। একপর্যায়ে চীন পাকিস্তানের প্রধান সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এ সময় পাকিস্তানের সামরিক শাসক আইয়ুব খান চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরাদার করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তিনি তার ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স’ গ্রন্থে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।
ভারতীয় সেনাবাহিনীর তরফ থেকে প্রকাশিত এক তথ্যে দেখা যায়, ১৯৭১-৭২ সালে চীন পাকিস্তানে যেসব সামরিক সরঞ্জাম পাঠিয়েছে সেগুলোর মধ্যে ছিল ২০০-এর বেশি ট্যাংক, এক স্কোয়াড্রন বোমারু বিমানসহ অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম। যে অস্ত্র ব্যবহৃত হয় বাঙালি নিধনযজ্ঞে। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১৯৭১ সালে বাংলার মাটিতে পাকিস্তানি গণহত্যা নিয়ে নিশ্চুপ থাকলেও পাকিস্তানি অভিযানে চীনপন্থি বা মাওপন্থি নেতাকর্মী নিহত হওয়ার বিষয়ে বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন ছিল চীন। ১৯৭১ সালে নভেম্বরে আরও বেশি সামরিক সাহায্যের জন্য পিকিং সফরে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো। ওই সময়ের একটি বৈঠকের বিষয়ে বাঙালি কূটনীতিক জি ডব্লিউ চৌধুরি বলেছেন, চীনা প্রধানমন্ত্রী চৌ এন লাই পাকিস্তানিদের হাতে ৬৪ জন পিকিংপন্থি রাজনৈতিক কর্মী ও নেতা নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
এদিকে যুদ্ধের শেষ দিকে সরগরম হয়ে ওঠে নিউইয়র্কের জাতিসংঘের সদর দপ্তর। মধ্য নভেম্বরে এটা মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায় খুব দ্রুত ঢাকার পতন হতে যাচ্ছে। তখন জাতিসংঘে তৎপর হয় পাকিস্তানের মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন, সঙ্গে ছিল প্রভাবশালী মুসলিম দেশগুলো। ৩ ডিসেম্বর পাক-ভারত আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ শুরুর পরই যুদ্ধ বিরতির জন্য প্রস্তাব দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এ সময় বাংলাদেশকে চীন ‘তথাকথিত বাংলাদেশ’ বলে উল্লেখ করে। নিরাপত্তা পরিষদে চীনা প্রতিনিধি হুয়াও কুয়া ছিলেন বেশ আক্রমণাত্মক। বাংলাদেশকে হুয়াও কুয়া উল্লেখ করেন ভারতের করদরাজ্য হিসেবে।
যুদ্ধের শেষ দিকে পাকিস্তানের প্রত্যাশা ছিল, বিপর্যয় ঠেকাতে চীন সরাসরি এ যুদ্ধে যোগ দেবে। আত্মসমর্পণের আগে ইসলামাবাদ থেকে এ কে নিয়াজীকে আশ্বস্ত করা হয়েছিল খুব দ্রুত চীনা সাহায্য আসছে। যদিও শেষ পর্যন্ত চীন সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেয়নি। আটকানো যায়নি বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়