প্রকৃতিগতভাবে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে স্নেহ-মায়া-মমতা ও ভালোবাসা আল্লাহতায়ালা দিয়ে রেখেছেন। তারপরও পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য তিনি সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। পরিবারে সবচেয়ে সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র হলেন পিতা-মাতা বা তাদের ঊর্ধ্বে দাদা-দাদি ও নানা-নানি। পরিবারে সদাচরণের বড় হকদার হলেন আপন পিতা-মাতা। সুরা বনি ইসরাইলে আল্লাহতায়ালা তার নিজের ইবাদতের সঙ্গে সঙ্গে পিতা-মাতার খেদমতের জোর তাগিদ দিয়েছেন। পিতা-মাতা উভয়ই বা কোনো একজন বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের শানে উহ্ শব্দটিও উচ্চারণ করা যায় না, সবসময় তাদের সঙ্গে নম্র আচরণ করার কথা আল্লাহ বলেছেন। পিতা-মাতা মারা গেলে তাদের জন্য দোয়া করতে বলেছেন এবং দোয়ার ভাষাও শিখিয়ে দিয়েছেন। যিনি দোয়া কবুল করবেন এবং যিনি সন্তানকে দোয়া করতে বলেছেন ও ভাষা শিখিয়ে দিয়েছেন (রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বাইয়ানি সগিরা), সেই দোয়া ব্যর্থ হতে পারে না।
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) কতভাবেই না তাদের সঙ্গে সদাচরণের তাগিদ দিয়েছেন। বৃদ্ধাবস্থায় বাবা-মার প্রতি প্রসন্নচিত্তে তাকালে কবুল হজের সমান সওয়াবের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত; প্রভুর সন্তুষ্টি পিতার সন্তুষ্টিতে এবং প্রভুর অসন্তুষ্টি পিতার অসন্তুষ্টিতে। মূলত সন্তানের জন্য পিতা-মাতা জান্নাত অথবা জাহান্নাম।
সবচেয়ে আদরের ধন সন্তান
একটি পরিবারে সবচেয়ে আদরের ধন হলো সন্তান। মূলত সন্তানের মধ্য দিয়ে পিতা-মাতা বেঁচে থাকতে চান। সন্তানের শিক্ষা-দীক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আমরা যতখানি পেরেশান, সেই তুলনায় তাদের নৈতিক মান উন্নয়নে কোনো পেরেশানি নেই। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, সন্তানকে নৈতিক শিক্ষাদান অপেক্ষা বড় কিছু দেওয়ার নেই। আল্লাহপাক স্বামী-স্ত্রী ও সন্তান দ্বারা চোখকে শীতল করে দেওয়ার জন্য তার কাছে দোয়া করতে বলেছেন। সন্তানকে দীন শিক্ষা ও নামাজে অভ্যস্ত করাতে না পারলে তার চারিত্রিক অধঃপতন রোধ সম্ভব নয়। চারদিকে মাদক ও অশ্লীলতার সয়লাব। নামাজই পারে এ সয়লাব থেকে আমাদের সন্তানকে হেফাজত করতে। আল্লাহপাক জোর দিয়ে বলেছেন, নিশ্চয়ই নামাজ মানুষকে অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে দূরে রাখে। সন্তানকে মসজিদে নিয়ে যেতে হবে। তাদের হইচই, চেঁচামেচিতে নামাজের কোনো ক্ষতি হয় না। কোনো ক্ষতি হয় না তার প্রমাণ হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তার নাতিদ্বয়। নাতিরা নানাকে রীতিমতো ঘোড়া বানিয়ে পিঠে চেপে বসতো। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন রাহমাতুল্লিল আলামিন এবং তিনি শিশুদের খুব আদর করতেন। সেই রাহমাতুল্লিল আলামিন দশ বছর বয়সে শিশুরা নামাজে না এলে মৃদু আঘাত করার কথা বলেছেন।
তারাও পরিবারভুক্ত
পরিবার অত্যন্ত ব্যাপক। আমরা বলি বাবা-মার পরিবার আবার বলি শ্বশুর-শাশুড়ির পরিবার। একদিকে স্বামীর পক্ষে বাবা-মার পরিবার আবার সেটি স্ত্রীর পক্ষ থেকে বলা হয় শ্বশুর-শাশুড়ির পরিবার, তেমনি স্ত্রীর পক্ষে বাবা-মার পরিবার সেটি স্বামীর পক্ষে শ্বশুর-শাশুড়ির পরিবার। আত্মীয়তা দুই ধরনের এক. রক্তসম্পর্কীয়, দুই. বৈবাহিক সম্পর্ক। স্রেফ আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে অনেকে মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন। ইসলাম দুই ধরনের আত্মীয়তাকেই গুরুত্ব প্রদান করে। সুরা বনি ইসরাইলে যেখানে পিতা-মাতার প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, সেখানে আত্মীয়তার হক আদায় করার কথাও বলা হয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্পষ্ট উক্তি আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে যাবে না। আত্মকেন্দ্রিক নয়, আমাদের হতে হবে উদার ও প্রশস্ততার অধিকারী। জান্নাত কোনো কৃপণ, অর্থলোলুপ ও স্বার্থপরের জন্য নয়। আল্লাহ নিজে উদার এবং তিনি তার বান্দার মধ্যে উদারতা পছন্দ করেন। আল্লাহর বাণী, ‘স্বীয় মনের সংকীর্ণতা থেকে নিজেকে রক্ষা করল সেই প্রকৃত কল্যাণ লাভ করল।’ সুরা তাগাবুন : ১৬