কারসাজি ১৮০ কোটি জরিমানা ১৮ লাখ

ভারতে পেঁয়াজ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা জারির পর হুট করে দ্বিগুণ হয়ে যায় বাংলাদেশের বাজারে পেঁয়াজের দাম। সরবরাহ সংকট দেখিয়ে একশ্রেণির ব্যবসায়ী বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে। তারা প্রতি কেজি পেঁয়াজ থেকে প্রায় ১০০ টাকা করে হাতিয়ে নেয়। এই হিসাবে তিন দিনে তারা পেঁয়াজের বাজার থেকে হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ১৮০ কোটি টাকা। যদিও বাজার নিয়ন্ত্রণে গত শনিবার থেকেই মাঠে নামে প্রশাসন। তিন দিনে ৩৩৫ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানাও করেছে। আদায় করেছে প্রায় ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা, যা কারসাজির তুলনায় খুবই সামান্য।

কারসাজির হিসাব কষে কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারি হিসাবে প্রতিদিন দেশে পেঁয়াজের চাহিদা প্রায় ৬৭ লাখ কেজি। এর মধ্যে তিন দিনে প্রতি কেজি পেঁয়াজে গড়ে ৯০ টাকা করে বাড়তি আদায় করেছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা। সেই হিসাবে তিন দিনে প্রায় ১৮০ কোটি টাকা হাতিয়েছে অসাধু চক্র।

তিনি আরও বলেন, ব্যবসায়ীরা এর আগে পণ্য মজুদ করে জনগণের অর্থ লুটপাট করেছেন। এর দায়ে সরকার দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী জড়িত ব্যবসায়ীদের শাস্তির মুখোমুখি করেনি। তাই দেশে বারবার মজুদকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটে।

ভারতীয় পেঁয়াজ রপ্তানি বন্ধের খবর প্রচার হওয়ার পর গত শনিবার থেকেই পাইকারি ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজের দাম এক লাফে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেন। এর প্রভাব পড়ে খুচরা বাজারেও। এরই পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার থেকে অভিযানে নামে ভোক্তা অধিদপ্তর। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগরসহ দেশের সব বিভাগ ও জেলাপর্যায়ে ভোক্তা অধিদপ্তরের বাজার অভিযানে কারসাজির দায়ে ৩৩৫ প্রতিষ্ঠানকে জরিমানার আওতায় আনা হয়েছে। এতে সারা দেশে ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। অধিদপ্তরের ডিজি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

পাশাপাশি পেঁয়াজের দাম নিয়ে কারসাজি করায় ভোক্তা অধিকার সচেতনতাবিষয়ক বিতর্ক প্রতিযোগিতার সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ব্যবসায়ীদের সমালোচনা করেন ভোক্তার ডিজি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান। তিনি বলেন, ভোক্তা অধিকার রক্ষায় অধিদপ্তর চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজন ভোক্তাদের সচেতনতা। ভোক্তারা যত দিন পর্যন্ত তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন না হবেন, তত দিন পর্যন্ত ভোক্তা অধিকার রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

এদিকে গতকাল সোমবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারসহ এর আশপাশের বাজার ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ পাইকারের কাছে দেশি পেঁয়াজ নেই। কিছু ভারতীয় পেঁয়াজ পাওয়া গেলেও তা চাহিদার তুলনায় সামান্য। তবে স্বস্তির খবর, বাজারে দেশি মুড়িকাটা পেঁয়াজের সরবরাহ বেড়েছে। ফলে মুড়িকাটা পেঁয়াজের দাম কেজিপ্রতি ১০ থেকে ২০ টাকা কমেছে। বর্তমানে প্রতি কেজি মুড়িকাটা পেঁয়াজ ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এক দিন আগেও বিক্রি হয়েছে ১১০ থেকে ১৩০ টাকায়। একইভাবে আমদানি করা পেঁয়াজ কেজিতে ২০ থেকে ৩০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায়।

জানতে চাইলে কারওয়ান বাজারের পেঁয়াজের পাইকারি ব্যবসায়ী লতিফুর দেশ রূপান্তরকে জানান, ‘গত দু-তিন দিন বাজারে প্রচুর নতুন পেঁয়াজ এসেছে। এতে সন্ধ্যার পর থেকে সব ধরনের পেঁয়াজ কেজিতে প্রায় ২০ টাকা কমেছে। বর্তমানে ভারতীয় পেঁয়াজের কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকায়, যা এক দিন আগেও বিক্রি করেছি ১৮০ টাকা করে। দেশি মুড়িকাটা পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ১১০ থেকে ১২০ টাকায়। তা আজ বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা দরে।’

তবে উত্তর বাড্ডা বাজার ও মুদি দোকানগুলোতে কেজিতে ৪০ টাকা কমে প্রতি কেজি ভারতীয় পেঁয়াজ ২০০ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। বাড্ডা কাঁচাবাজারের মুদি দোকানি কাশেম দেশ রূপান্তরকে বলেন, এক দিন আগে ২৪০ টাকার নিচে কোনো দোকানে পেঁয়াজ বিক্রি হয়নি। কিন্তু বর্তমানে কেজিতে ৪০ টাকা কমে বিক্রি হচ্ছে ২০০ থেকে ২১০ টাকায়।

এদিকে চট্টগ্রামের ভোগ্যপণ্যের বৃহত্তম পাইকারি বাজার চাক্তাই খাতুনগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানকালে কয়েকটি জায়গায় ব্যবসায়ীদের পেঁয়াজ গুদামজাত করে রেখে দাম বাড়ানোর কারসাজিও ধরা পড়ে। অনিয়মের জন্য বেশ কটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হলেও বাজার পরিস্থিতির কেন হেরফের হয়নি?

পেঁয়াজ নিয়ে এই সংকটের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরে গত রবি ও গতকাল সোমবার দুদিনে ২২৬ টন আমদানি করা পেঁয়াজ খালাস হয়েছে। চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক মো. শাহ আলম দেশ রূপান্তরকে জানান, রবিবার চীন থেকে আনা একজন আমদানিকারকের ১৬৮ এবং গতকাল সোমবার পাকিস্তান থেকে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) আমদানি করা ৫৮ টন পেঁয়াজ খালাসের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, চলমান পেঁয়াজ সংকট নিয়ে গতকাল চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের সঙ্গে এক বৈঠকে রাতারাতি পেঁয়াজের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির জন্য আমদানিকারকদের দায়ী করেছেন পাইকারি ব্যবসায়ীরা। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে দুপুরে অনুষ্ঠিত বৈঠকে খাতুনগঞ্জ আড়তদার কল্যাণ সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সীমান্তের আমদানিকারকরা যে দাম নির্ধারণ করে দেন, সেই দামেই বিক্রি করতে হয় খাতুনগঞ্জের আমদানিকারকদের। আড়তদাররা শুধু কেজি হিসাবে কমিশন পান। অবশ্য বৈঠকে কোনো আমদানিকারক উপস্থিত ছিলেন না।

খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজের বৃহৎ বাজার হামিদুল্লাহ মিয়ার বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. ইদ্রিস দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশীয় পেঁয়াজ বাজারে আসতে শুরু করায় আগামী সপ্তাহের দিকে বাজারে সরবরাহ সংকট কেটে গেলে স্থিতিশীলতা ফিরে আসতে পারে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, দেশে পেঁয়াজের চাহিদা ২৬ লাখ ২৫ হাজার টন। এর মধ্যে এক-তৃতীয়াংশ চাহিদা আমদানি থেকে মেটাতে হয়। আর আমদানি করা পেঁয়াজের ৭৫-৮০ শতাংশ আসে ভারত থেকে। এ ছাড়া চীন, পাকিস্তান, মিয়ানমারসহ কয়েকটি দেশ থেকে পেঁয়াজ আমদানি করা হয়। কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, চলতি বছর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ৫ মাসে ৫ লাখ ৭১ হাজার ৫৩৪ টন পেঁয়াজ আমদানি হয়েছে।

শরীয়তপুরে দুই পেঁয়াজ ব্যবসায়ীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা : দুই পেঁয়াজ ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছেন জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। গতকাল অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সুজন কাজী ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আব্দুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে দুটি টিম শহরের আংগারিয়া বাজার ও পালং বাজারে যৌথ অভিযান পরিচালনা করে। অভিযানের সময় ক্রেতাদের কাছ থেকে দাম বেশি নেওয়া ও ক্রয় রসিদ না থাকায় আংগারিয়া বাজারের মেসার্স মাহাবুব হাসান খান ট্রেডার্সকে ৫ হাজার এবং পালং বাজারের মশিউর রহমান খানকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

দেশীয় পেঁয়াজের সরবরাহ বাড়ায় হিলিতে কমতে শুরু করেছে পেঁয়াজের দাম : দেশীয় নতুন পেঁয়াজ উঠতে শুরু করায় সরবরাহ বাড়ায় পেঁয়াজের দাম কমতে শুরু করেছে। এতে করে খুশি নিম্ন আয়ের মানুষ। সামনের দিনে দাম আরও কমবে বলে দাবি বিক্রেতাদের। এদিকে অচিরেই পুরনো এলসির পেঁয়াজগুলো দেশে ঢুকবে, এতে দাম আরও কমবে বলে দাবি আমদানিকারকদের। গতকাল সোমবার হিলি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে অধিকাংশ দোকানেই শোভা পাচ্ছে দেশীয় পেঁয়াজ। আর এসব পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকা কেজি দরে। দু-একটা দোকানে আমদানি করা ভারতীয় পেঁয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, যা বিক্রি হচ্ছে ১৮০ টাকা কেজি দরে।

হিলি বাজারে পেঁয়াজ কিনতে আসা আশরাফুল ইসলাম বলেন, এক লাফে ৯০ থেকে ৯৫ টাকার পেঁয়াজ ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি উঠে গিয়েছিল। তবে বাজারে দেশীয় পেঁয়াজ উঠতে শুরু করায় গতকাল থেকে আবারও দাম কমতে শুরু করেছে। আজ (গতকাল) ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। রাজ্জাক হোসেন নামে অন্য এক ক্রেতা বলেন, ‘পরশু দিন পেঁয়াজ ২০০ টাকায় উঠে গিয়েছিল, আজ পেঁয়াজের দাম অনেকটাই কমেছে। এখন ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে দেশীয় পেঁয়াজ।’

হিলি স্থলবন্দরের পেঁয়াজ আমদানিকারক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পেঁয়াজ নিয়ে আর বাড়তি কিছু হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, দেশীয় পেঁয়াজ ইতিমধ্যেই উঠতে শুরু করেছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে বাজারে পর্যাপ্ত পরিমাণে দেশীয় পেঁয়াজ সরবরাহ হবে।’

প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম এবং শরীয়তপুর, হিলি, হাকিমপুর (দিনাজপুর) প্রতিনিধি