২০২৩ সালের অক্টোবরের শুরুতে পাকিস্তানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার অবৈধ বিদেশিদের প্রত্যাবাসনে নতুন পরিকল্পনা ঘোষণা করে। অনথিভুক্ত সব অভিবাসী এবং যাদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়েছে তাদের বিতাড়নের কথা বলা হয় নতুন এই পরিকল্পনায়। যদিও এটির ভাষা ছিল অস্পষ্ট, কিন্তু তাদের বার্তাটি ছিল স্পষ্ট। বলা হচ্ছে, এটি হলো শরণার্থী ও অভিবাসীদের দমনের দীর্ঘস্থায়ী প্রচারণার সর্বশেষ কিস্তি। এই নতুন পরিকল্পনায় বিদেশিদের একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে টার্গেট করা হয়েছে। সেটি হলো আফগানরা।
আফগান শরণার্থীদের পাকিস্তান থেকে বের করে দেওয়ার ইচ্ছা দেশটির নতুন নয়। ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের পর থেকে পালিয়ে আসা লক্ষাধিক শরণার্থীর আবাসে পরিণত হয়েছে পাকিস্তান। আফগানদের ওপর নির্যাতন শুধু বেড়েছেই। ২০২১ সালের আগস্টে তালেবানদের ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকে ছয় লাখ আফগান নাগরিক ইতিমধ্যে পাকিস্তানে আশ্রয় চেয়েছে।
এর আগে ২০১৬ সালে পাকিস্তান থেকে আফগানদের জোরপূর্বক বিতাড়িত করার জন্য আক্রমণাত্মক ব্যবস্থা গ্রহণ করে দেশটির সরকার। চলতি বছরের ১ নভেম্বর প্রত্যাবাসনের নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কয়েক হাজার এরই মধ্যে ফিরে গেছে। তারপরও আরও অনেকে রয়ে গেছে। তারা তালেবানের অধীনে জীবনযাপনে ফিরতে রাজি নন।
‘নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ’ প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পরও পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত ক্রসিংয়ে বিশৃঙ্খলা এবং অব্যবস্থাপনার লক্ষ্য করা গেছে। বিশাল আফগান শরণার্থী প্রত্যাবাসনের সর্বশেষ প্রচেষ্টাটি এখনও সবচেয়ে ঝামেলাপূর্ণ দেশটির কাছে।
এদিকে, আফগান শরণার্থী প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে পাকিস্তান সরকার তার অবস্থান নরম করেছে। পাকিস্তানে প্রায় ১ দশমিক ৪ মিলিয়ন আফগান শরণার্থীর বসবাসের সময়সীমা বছরের শেষ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন সংস্থার চাপের পড়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে অনথিভুক্ত আফগানদের জন্য সময় বাড়ানো হয়নি। ভয়ের বিষয় হলো- ইসলামাবাদ আফগান শরণার্থীদের বের করে দেওয়ার বিষয়ে আগের চেয়ে আরও বেশি কঠোর।
পাকিস্তান থেকে প্রত্যাবাসনের ঝুঁকির সম্মুখীন ব্যক্তিদের মধ্যে সাংবাদিক এবং নারী অধিকার কর্মীরাও আছেন। তারা তালেবান ক্ষমতায় আসার পর আফগানিস্তান থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন। তারপর থেকে দুই বছরে তালেবানরা নির্যাতন করতে পারে এমন আশঙ্কাকে সঠিক বলে প্রমাণ করেছে। কারণ সাংবাদিকরা চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন- তাদের মধ্যে অনেককে কারাবন্দি করা হয়েছিল বা দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। এছাড়াও বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার জন্য নারী আইনজীবীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়েছিল, মারধর করা হয়েছিল এবং আটক করা হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আফগানদের ওপর করা নির্যাতনের সংবাদ প্রচার করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এসব ঘটনায় নিন্দাও জানিয়েছে। এমন নির্যাতনের শিকার হয়ে আবার আফগানিস্তানে ফিরে গেলে তাদের জন্য নির্মম বাস্তবতা অপেক্ষা করছে। তবুও ক্ষতিগ্রস্তদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ না করে পাকিস্তানের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আফগান শরণার্থীদের বের করে দেওয়ার প্রচেষ্টা জোরদার করেছে। তাদের দুর্দশায় পাশে না থেকে দূরে সরে গেছে।
চলতি বছরে পাকিস্তানে ২৪টি আত্মঘাতী বোমা হামলার মধ্যে ১৪টিতে আফগানরা জড়িত বলে অভিযোগ করেছেন বেলুচিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জুবায়ের জামালি। সেই সঙ্গে তিনি বলেছেন, তারা দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। এটি আর সহ্য করা হবে না। এ বিষয়গুলো সরকারের শীর্ষ পর্যায়েও আলোচনা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার উল হক কাকার একবার যুক্তি দিয়েছিলেন যে অনথিভুক্ত অভিবাসীরা অপরাধী ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছে। এই কথার বলা বলা হচ্ছে- পাকিস্তানের সমস্যাগুলোকে ধামাচাপা দিতে আফগান শরণার্থীদের বলির পাঁঠা বানাচ্ছে দেশটির বর্তমান।
এদিকে, আফগান শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের সময়সীমা ১ নভেম্বর পেরিয়ে যাওয়ার এক সপ্তাহ পর কাকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আশ্বস্ত করেছে যে, আফগানরা যারা আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী বা সরকারের নিযুক্ত ছিল, বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা বা সাহায্য সংস্থার জন্য কাজ করেছে তাদের আফগানিস্তানে ফেরত পাঠানো হবে না। তবে এই ঘটনায় চাপ বাড়তে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
আফগান শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের কিছু ঝুঁকিও রয়েছে। আফগানিস্তানে উদ্বাস্তুদের ব্যাপক প্রত্যাবাসন দেশটিতে অস্থিতিশীল প্রভাব তৈরি করতে পারে। এমনকি তালেবানের ক্ষমতাকে হুমকির মুখেও ফেলতে পারে। তালেবান এতদিন ধরে দেশের নিয়ন্ত্রণের জন্য লড়াই করেছে। তাদের জন্য এই পরিণতি ভালো হবে না। তাই পাকিস্তানকে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার জন্য অনুরোধ করেছেন তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ।
যদি পাকিস্তান প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে অবিচল থাকে; তবে ধারণা করা হচ্ছে- তালেবানরা চরমপন্থী হয়ে ওঠতে পারে। আফগানিস্তান তার নাগরিকদের গ্রহণ করতে অস্বীকার করতে পারে, সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ করে দিতে পারে। এতে হাজার হাজার আফগান শরণার্থী পাকিস্তানে আটকা পড়তে পারে। যাইহোক, যা নিশ্চিত তা হলো যে একবার ধূলিকণা স্থির হয়ে গেলে- পাকিস্তান নিজেকে আরও খারাপ অবস্থানে খুঁজে পাবে। সূত্র : ইনকস্টিকমিডিয়া