রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম, তার স্ত্রী জোবেদা বেগম এবং তাদের দুই ছেলে মো. কাউছার আহমেদ অপু ও মো. মেহেদী হাসান বিপুর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রাথমিক অনুসন্ধানে (দুদকের অভ্যন্তরীণ নিজস্ব গোয়েন্দা অনুসন্ধান) জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের সুনিদিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়ার পর রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে কমিশন এ প্রকাশ্য অনুসন্ধান শুরু করেছে।
ইতিমধ্যেই দুদকের নোটিসের ভিত্তিতে রফিকুল ইসলাম কমিশনে সম্পদ বিবরণী দাখিল করেছেন। সেখানে তিনি প্রায় ১০০ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের ঘোষণা দিয়েছেন। এ ছাড়া রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অন্যের জমি দখলের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের আরেকটি পৃথক অভিযোগও রয়েছে। এ অভিযোগটিও অনুসন্ধান পর্যায়ে রয়েছে বলে দুদকের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে দুদক সচিব মো. মাহবুব হোসেন বলেন, অনুসন্ধান পর্যায়ে কিছু বলার সুযোগ নেই। অনুসন্ধান শেষে অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা কমিশনে প্রতিবেদন দাখিল করবেন। এরপর তা দেখে অভিযোগের সত্যতা বিষয়ে জানা যাবে।
যেভাবে অনুসন্ধান শুরু : ২০১৯ সালের শুরু দিকে রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ দুদকে আসে। ওই সময় কমিশন অভিযোগটি তার নিজস্ব গোয়েন্দা শাখার মাধ্যমে গোপন অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুসারে দুদকের গোয়েন্দা শাখা থেকে অভিযোগটির অনুসন্ধান করে দুদক চেয়ারম্যানের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। সেখানে রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে প্রকাশ্য অনুসন্ধানে মামলা করা যাবে বলে মতামত দেওয়া হয়। গোয়েন্দা শাখার এ মতামতের ভিত্তিতে কমিশন অভিযোগটি প্রকাশে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। দুদকের সহকারী পরিচালক শেখ গোলাম মওলাকে সহকারী পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। অনুসন্ধান পর্যায়ে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় ২০২১ সালের ২৬ ডিসেম্বর রফিকুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিস করে দুদক।
নোটিসে সম্পদ বিবরণী দাখিল না করলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা হয়। ২০২২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রফিকুল দম্পতি কমিশনে তাদের সম্পদ বিবরণী দাখিল করেন। এরপর তাদের সম্পদের যাচাই-বাছাইয়ের জন্য কমিশন কর্মকর্তা পরিবর্তন করে দুদকের উপপরিচালক মো. নাজমুল হোসাইনকে দায়িত্ব দেন। অন্যদিকে একই বছরের ১৬ মার্চ রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ভূমিদস্যুতা ও অন্যের জমি দখলের মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের পৃথক আরেকটি অভিযোগ কমিশনে আসে। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-২-এর থেকে এ অভিযোগটির অনুসন্ধান করা হচ্ছে। দুটি অভিযোগেরই অনুসন্ধান কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
রফিকুলের সম্পদের ফিরিস্তি : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, রফিকুল ইসলাম দুদকে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে স্থাবর-অস্থাবর মিলিয়ে প্রায় ১০০ কোটি টাকার হিসাব দিয়েছেন। রফিকুল ইসলামের বাড্ডায় (চ/৪১/২) ৫ শতাংশ জমির ওপর ভবন, একই এলাকায় রোজ মেরি-১ ও রোজ মেরি-২ নামের দুটি বাড়ি, নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন দাগে ৫৩ শতাংশ, ১৫ শতাংশ, ৬১ শতাংশ, ৭৯ শতাংশ ও অন্য একটি দাগে ১ দশমিক ২ একর জমি রয়েছে। জোয়ার সাহারা ভাটারা এলাকায় ৩৮ শতাংশ জমি রয়েছে (রূপগঞ্জ থানা সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ৩৪নং দলিল)। আয়কর অধ্যাদেশ ১৯এএএএএ এর আওতায় এ জমির অর্থ তিনি সাদা করেছেন। অর্থাৎ নির্দিষ্ট হারে সরকারকে ট্যাক্স দিয়ে কালো টাকা সাদা করেছেন। এ ছাড়া গুলশান পাকা মার্কেটে তিনটি দোকান রয়েছে। মেহেদী শপিং, বসুন্ধরা কে ব্লকে দুটি বাড়ি, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, ভুলতা, কায়েতপাড়া এলাকায় জমি, রংধনু অ্যাগ্রো, রংধনু সিএনজি ও শুভ সিএনজি স্টেশন রয়েছে। ফার্মার্স ব্যাংকের ১০ কোটি টাকার শেয়ার, এমকে প্লাস্টিক, তিনটি গাড়ি, বাজার সারাবেলা লিমিটেডে ৬০ লাখ টাকার শেয়ার ও মেহেদী ফুড কোডে ৪০ লাখ টাকার শেয়ার রয়েছে। এসব তথ্য রফিকুল তার আয়কর নথি ও দুদকে দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন।
তবে অনুসন্ধানের বিষয়ে কথা বলতে রাজি হননি মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিচালক মো. নাজমুল হোসাইন। তিনি বলেন, ‘অনুসন্ধান পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য প্রকাশ পেলে অনুসন্ধানের বেঘাত ঘটতে পারে। এ ছাড়া এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য কমিশনের নির্ধারিত মুখপাত্র রয়েছেন।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অনুসন্ধানের বিষয়বস্তুর পরিধি অত্যন্ত বিশাল। তিনি শুধু শতকোটি টাকার সম্পদের ঘোষণা দিয়েছেন। এর বাইরেও তার আরও কিছু সম্পদ রয়েছে কি না এবং তার ঘোষিত সম্পদের মূল্যের সঠিকতা যাচাই করা হচ্ছে। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা ভারমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারলে মামলা করার মতো যথেষ্ট উপাদান নথিতে রয়েছে।
আইন ও মানবাধিকার সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের অভিযোগ : এদিকে চলতি বছর ৩ অক্টোবর আইন ও মানবাধিকার সুরক্ষা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের পৃথক আরেকটি অভিযোগ দুদকে দাখিল করা হয়। অভিযোগটি আগের অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করে অনুসন্ধান করার জন্য প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, যা কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে। এ বিষয়ে সংস্থাটি পরবর্তী সময়ে একটি সংবাদ সম্মেলনও করেছে।
সংস্থার পক্ষ থেকে দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়, রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম চলতি বছর জুন মাসে জালিয়াতির মাধ্যমে বিক্রীত জমির দলিল বন্ধক রেখে ফাস্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, বসুন্ধরা শাখা থেকে ঋণ গ্রহণের নামে রফিকুল ইসলাম ২৭০ কোটি টাকা লুণ্ঠন করে নিয়েছে। তিনি ২০২২ সালের শেষদিকে এসব জমি বিক্রি করে দিলেও ঋণ নেন চলতি বছরের জুন মাসে। ঋণের টাকা কোথায় বিনিয়োগ করা হয়েছে, তা কিছুই জানে না ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ। চলতি বছর ২২ জুন রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম, তার ছেলে মেহেদী হাসান দীপু, কাউসার আহমেদ অপু ও মালিহা হোসেন ব্যক্তিরা জোয়ার সাহারা, ভাটারা ও গুলশান মৌজার ৩৩৭ দশমিক ৫৯ শতাংশ জমি বন্ধক রেখে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের বসুন্ধরা শাখা থেকে ২৭০ কোটি ঋণ নিয়েছেন। এর মধ্যে ভাটারা মৌজার চারটি প্লটে রফিকুল ইসলামের বিক্রি করে দেওয়া ৯৩ দশমিক ৮৭ শতাংশ জমিও রয়েছে।
ব্যাংকের নথি অনুসারে, রফিকুল ইসলাম ২০১৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের কাছ থেকে এওয়াজ বদল দলিল মূলে জমির মালিক হয়েছিলেন। এর মধ্যে ভাটারা মৌজার ই-ব্লকের ৪৮২, ৪৮৩, ৪৮৪, ৪৮৭, ৪৮৮ ও ৪৮৯ প্লটের ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ, ৫০৭, ৫০৮, ৫১১ ও ৫১২ প্লটের ১৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ৫৩০, ৫৩১, ৫৩২, ৫৩৩, ৫৩৪ ও ৫৩৫ প্লটের ২২ দশমিক ৭০ শতাংশ, ৫৫১, ৫৫২, ৫৫৬, ৫৫৭ ও ৫৫৮ প্লটের ২৭ দশমিক ৫১ শতাংশ জমি রয়েছে। উল্লিখিত জমি ২০২২ সালের ১৮ এপ্রিল সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে বন্ধক রেখে ঋণ নিলেও রফিকুল ইসলাম তা পরিশোধ করে দেন একই বছরের ২৯ সেপ্টেম্বর। একই দিন এসব জমির মধ্যে ৪৮২, ৪৮৩, ৪৮৪, ৪৮৭, ৪৮৮ ও ৪৮৯ প্লটের ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ ও ৫৩০, ৫৩১, ৫৩২, ৫৩৩, ৫৩৪ ও ৫৩৫ প্লটের ২২ দশমিক ৭০ শতাংশ আবুল কাশেম গংদের কাছে বিক্রি করে দেন রফিকুল ইসলাম। এ ছাড়া ২০২২ সালের ২১ নভেম্বর ৫৫১, ৫৫২, ৫৫৬, ৫৫৭ ও ৫৫৮ প্লটের ২৭ দশমিক ৫১ শতাংশ জমি বিক্রি করেন ইমরান করিমের কাছে। গত বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি তামান্না সুলতানার কাছে ৫০৭, ৫০৮, ৫১১ ও ৫১২ প্লটের ১৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ জমি বিক্রি করে দেন রফিকুল ইসলাম। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর ৮ ডিসেম্বর ইস্ট ওয়েস্ট প্রপার্টি ডেভেলপমেন্ট কর্র্তৃপক্ষ ইমরান করিমের পক্ষে জমির মালিকানা পরিবর্তনের অনুমোদন দিয়েছে। এ ছাড়া আবুল কাশেম গংদের মালিকানাধীন ২৮ দশমিক ১৩ শতাংশ এবং তামান্না সুলতানার নামে ১৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ জমির মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি। এ ছাড়া আবুল কাশেম গংদের মালিকানাধীন ২২ দশমিক ৭০ শতাংশের আরেকটি প্লটের মালিকানা পরিবর্তন হয়েছে চলতি বছর ১৯ মার্চ।