বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মানবাধিকার ও গণতন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখার আহ্বান জানিয়েছে বিশ্বের ছয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন। এর পাশাপাশি তারা ৭ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এখানে মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং নাগরিক সমাজের স্থান সংকুচিত হয়ে আসায় গভীর উদ্বেগও জানিয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার রবার্ট এ কেনেডি হিউম্যান রাইটসের ওয়েবসাইটে বাংলাদেশ : আর্জেন্ট কল টু সেফগার্ড হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি অ্যাহেড অব জানুয়ারি ইলেকশনস’ শীর্ষক যৌথ বিবৃতিতে এ উদ্বেগ জানানো হয়।
সংগঠনগুলো হলো রবার্ট এফ কেনেডি হিউম্যান রাইটস (আরএফকেএইচআর), ক্যাপিটল পানিশমেন্ট জাস্টিস প্রজেক্ট (সিপিজেপি), দ্য ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট টর্চার কনসোর্টিয়াম (ইউএটিসি), এশিয়ান ফেডারেশন অ্যাগেইনস্ট ইনভলান্টারি ডিজঅ্যাপিয়ারেন্সেস (এএফএডি), অ্যান্টি-ডেথ পেনাল্টি এশিয়া নেটওয়ার্ক (এডিপিএএন) ও ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সেস (আইসিএইডি)।
এ ছাড়া বিবৃতিতে তারা জানিয়েছে, ৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ জাতীয় নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এখানে মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং নাগরিক সমাজের স্থান সংকুচিত হয়ে আসছে। আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানাই বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে এবং মৌলিক অধিকার সুরক্ষিত রাখায় ব্যবস্থা নিতে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ২৮ অক্টোবর বিরোধীদের দমন করতে সহিংসতার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। এ বছর অক্টোবরের শেষের দিক থেকে রাজনৈতিক বিরোধীদের সমন্বিত র্যালি ও প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছে। এসব প্রতিবাদকারী ও রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীকে দমন করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সহিংসতা ফিরিয়ে এনেছে। এ দমন-পীড়নে একজন সাংবাদিকসহ ১৭ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন বিরোধী দলের ৮ হাজার ২৪৯ জন নেতা। এ ছাড়া হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে আয়োজিত মানববন্ধনে পুলিশ, ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে কমপক্ষে ৫০ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় জরুরি ভিত্তিতে একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো করেছে বলে বিবৃতিতে বলা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে আইনপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের বৈষম্যমূলক আচরণ এবং অতিমাত্রায় কাঁদানে গ্যাস, লাঠি, লাঠিপেটা, রাবার বুলেট ব্যবহার এবং একইরকম অন্যান্য ব্যবস্থার ব্যবহার উদ্বেগকে গুরুতর করে তুলেছে।
বিবৃতিতে জোরালোভাবে বলা হয়, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জরুরি ভিত্তিতে মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক মানদ- অনুসরণ করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে জাতিসংঘের ‘বেসিক প্রিন্সিপালস অন দ্য ইউজ অব ফোর্স অ্যান্ড ফায়ার আর্মস বাই ল এনফোর্সমেন্ট অফিশিয়ালস’ এবং জাতিসংঘের ‘হিউম্যান রাইটস গাইডেন্স অব লেস-লেথাল উইপন্স ইন ল এনফোর্সমেন্ট’।
বিবৃতিতে বলা হয়, অক্টোবরের শেষদিকে বাংলাদেশ সরকার গণহারে প্রায় ২০ হাজার মানুষকে আটক করেছে, যারা বিরোধী দলের বা বিরোধী দলের সমর্থক হিসেবে মনে করা হয়। ৮৩৪টি মিথ্যা মামলার অভিযোগে এদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বৈধ প্রেক্ষাপট থাকা সত্ত্বেও অব্যাহতভাবে এসব মামলায় জামিন অগ্রাহ্য করা হচ্ছে। যথাযথ প্রক্রিয়ার নিশ্চয়তাকেও বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। নিরাপত্তা হেফাজতে নির্যাতনের এ অভিযোগ শুধু গত মাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। আগেও একইরকম অভিযোগের প্রতিবেদন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রহার, বৈদ্যুতিক শক, ওয়াটারবোর্ডিং, ইচ্ছাকৃতভাবে গুলি করে দেওয়ার মতো দৃশ্য তৈরি করা হাঁটুর নিচে গুলি করা, ভুয়া মৃত্যুদ- কার্যকরের দৃশ্য তৈরি করা এবং জোরপূর্বক নগ্ন করা।
বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয়, সহিংসতা ও নির্বিচারে আটক বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অবস্থার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। জনগণ আগামী মাসে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি করছে যখন, তখন এসব নির্যাতন করা হচ্ছে। গণতন্ত্রের মৌলিক মূলনীতিকে সমুন্নত করার পরিবর্তে বাংলাদেশ সরকার সহিংস ও দমন-পীড়নের মতো পদক্ষেপ ব্যবহার করছে। তাতে ভয়, উদ্বেগ এবং নাগরিকদের জন্য চরম অনিরাপদ এক পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের জনগণ একটি সুষ্ঠু, গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজের জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। তাই আমরাও বাংলাদেশের মানুষের পাশে আছি। অবিলম্বে^ সহিংসতা, নিপীড়ন, রাজনৈতিক বিরোধীদের টার্গেট করে ভীতি প্রদর্শন বন্ধ রাখার জন্য আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে আহ্বান জানাই।