অর্থাভাবে গড়ে ওঠেনি শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভ

আজ শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে জাতির অনেক সূর্যসন্তানকে হত্যা করা হয়েছিল। যদিও এর সূচনা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই। কিন্তু চূড়ান্ত রূপ পায় বিজয় লাভের ঠিক আগমুহূর্তে। এই সূর্যসন্তানদের স্মরণে ঠাকুরগাঁওসহ দেশের জেলা পর্যায়ের কোথাও আজও গড়ে ওঠেনি কোনো স্মৃতিস্তম্ভ। এমনকি ইতিহাসের বাইরে এখনো রয়েছে অনেক বুদ্ধিজীবীর নাম। এই ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে না জানালে অসম্পূর্ণ থেকে যাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস—এমন কথাই বলছেন একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী সন্তান এবং মুক্তিযুদ্ধ গবেষকরা।

বাঙালি সাহিত্যিক, দার্শনিক, শিক্ষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিকসহ সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংগঠকরা পশ্চিম পাকিস্তানের জান্তা শাসক আর তার দোসোরদের চক্ষুশূল হবেনই, কেননা এই মানুষগুলোই মুক্তির পথ মসৃণ করেছেন নিজেদের ভাবনা-চিন্তা-চেতনা দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস জুড়ে দেশের সর্বত্রই বুদ্ধিজীবীদের খুঁজে বের করে নির্মম গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী, যা বাস্তবায়নে হাত ছিল আল-বদর, আল শামস ও রাজাকার বাহিনীর। 

বুদ্ধিজীবীদের সঠিক তালিকা প্রণয়নে যখন রাষ্ট্রীয় সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়। এরপর ২০২০ সালে ঠাকুরগাঁওয়ে মাঠ পর্যায়ে গবেষণা শুরু করেন ১৯৭১: গণহত্যা নির্যাতন ও আর্কাইভ জাদুঘরের গবেষক ফারজানা হক। তিনি এ পর্যন্ত দুই ধাপে এই জেলায় নতুন করে ৩৪ জন বুদ্ধিজীবীর নাম তুলে আনতে পেরেছেন। যাদের অধিকাংশই শিক্ষক ও চিকিৎসক। সেই সাথে সংগ্রহ করেছেন তাদের ছবি ও ব্যবহৃত অনেক স্মারক।

১৯৭১: গণহত্যা নির্যাতন ও আর্কাইভ জাদুঘরের গবেষক ফারজানা হক বলেন, বুদ্ধিজীবীদের নাম বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত চিত্র উঠে আসে না। সারা দেশে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নাম গেজেটভুক্ত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তরুণ এই গবেষক বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মকে জানতে হবে এবং জানাতে হবে।

আজ মুক্তিযুদ্ধের ৫২ বছর পেরিয়েছে। কিন্তু আজো দেশের বুদ্ধিজীবীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ হয়নি, তাদের স্মরণে স্থানীয় পর্যায়ে নির্মিত হয়নি স্মৃতিস্তম্ভ। তাই এই দিনটি জেলা পর্যায়ে কেটে যায় নীরবে। গেল তিন বছর আগে ঠাকুরগাঁও প্রেস ক্লাব চত্বরে জেলার শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হলেও অর্থের অভাবে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। তাই কিছুটা ক্ষোভ সাংবাদিক ও একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী সন্তানদের।

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের সন্তান অনুপম মনি বলেন, স্বাধীনতার ৫২ বছর পেরিয়েছে। আজো শহীদদের মর্যাদা দেওয়া হয়নি, এটি জাতির জন্য দুঃখজনক। বর্তমান সরকারের কাছে দাবি জানাই, অবিলম্বে শহীদদের প্রকৃত তালিকা গেজেটভুক্ত করে মর্যাদা দেওয়া হোক।

প্রবীণ সাংবাদিক আব্দুল লতিফ বলেন, দেশের জাতিকে মেধাশূন্য করতেই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের খুঁজে খুঁজে বের করে হত্যা করা হয়। তাদের কথা এখন নতুন প্রজন্মের কাছে অজানা। তাই নতুন পাঠ্যক্রমে জেলা পর্যায়ের বুদ্ধিজীবীদের জীবনী তুলে আনার দাবি জানান তিনি।

তিনি আরও বলেন, শুধুমাত্র ঢাকার রায়ের বাজারে বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মিত হয়েছে। কিন্তু জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে এখনো কোথাও এই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের স্মরণে কোনো স্থাপনা নির্মিত হয়নি। অবিলম্বে জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে তাদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ বা স্মতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হোক। তবেই এই প্রজন্ম বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ কেন হয়েছিল জানতে পারবে।

ঠাকুরগাঁও প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক লুৎফর রহমান মিঠু বলেন, শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণে তিন বছর আগে প্রেস ক্লাব চত্বরে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের জন্য ভিত্তিপ্রস্থর স্থাপন করা হয়। কিন্তু অর্থের অভাবে আজো নির্মাণ কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। এজন্য সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

যাদের রক্তের বিনিময়ে লাল সবুজের পতাকা, একটি স্বাধীন মানচিত্র- তাদের মর্যাদা দেওয়ার পাশাপাশি প্রতিটি জেলায় স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করে স্থাপন করা হোক- এমনটাই প্রত্যশা সুশীল সমাজের।