গণহত্যায় আজও প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র

গণহত্যা প্রশ্নে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সব সময়ই প্রশ্নবিদ্ধ। হোক সেটা ১৯৭১ সালে বাংলার বুকে পাকিস্তানি গণহত্যা অথবা গাজায় চলমান ইসরায়েলি বর্বরতা। দেশটি বিভিন্ন সময় গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কথা বলে বিশে^র বিভিন্ন দেশে নিজেও ‘সভ্য সঙ্গী-সাথীদের নিয়ে’ বর্বর গণহত্যা চালিয়েছে। আফগানিস্তান, ইরাক ও সিরিয়া তার সবশেষ নজির। ১৯৭১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জারের সমর্থন ছিল পাকিস্তান ও চীনের প্রতি। যে কারণে পাকিস্তানি সেনাদের বর্বর আক্রমণকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বারবার অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে এড়িয়ে গেছে।

পাকিস্তানকে দিয়েছে সামরিক ও আর্থিক সাহায্য। তবে মার্কিন প্রশাসনের সবাই অন্ধ ছিলেন না। মার্কিন কূটনীতিক আর্চার কেন্ট ব্লাড ছিলেন সামনের সারির এক কূটনীতিক, যিনি ঢাকার বুকে ঘটে যাওয়া বর্বর হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদ করেছিলেন। এই বর্বরতাকে ‘সুনির্দিষ্ট গণহত্যা’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।  

বর্তমান বিশ্বসভ্যতায় জেনোসাইড (Genocide) নিঃসন্দেহে এক ধরনের ভয়ংকর, ঘৃণ্য অপরাধ। এটা মানবতাবিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ। এই অপরাধ কখনো তামাদি হয় না, যেকোনো সময় এর বিচার করার অধিকার বিশ্ব সম্প্রদায় রাখে। রাফায়েল লেমকিন (Raphael Lemkin, 1900-1959)  নামের একজন পোলিশ-ইহুদি আইনজীবী ‘Genocide’ শব্দটির প্রবর্তক। শব্দটি এসেছে গ্রিক ও লাতিন থেকে। গ্রিক শব্দ ‘Genos’ শব্দের অর্থ Race or Tribe  আর লাতিন ‘Cide’ শব্দের অর্থ ‘Killing’. সহজ কথায় জেনোসাইড হলো এমন এক ধরনের আন্তর্জাতিক অপরাধ, যার প্রধান লক্ষ্য থাকে কোনো জাতি (Nation), গোত্র (Race), ধর্মীয় গোষ্ঠীকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করা। এই অপরাধে জাতি-গোত্র-ধর্মীয় গোষ্ঠীকে বিলীন করে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা থাকে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। লক্ষ্য ছিল বাঙালি জাতিকে চিরতরে পদানত বা নিশ্চিহ্ন করা। যে জেনোসাইডের কথা প্রথম বলেছিলেন আর্চার কেন্ট ব্লাড। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, একজন প্রত্যক্ষদর্শী কূটনীতিক আর্চার কেন্ট ব্লাড পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক পাকিস্তানি নিধনযজ্ঞকে জেনোসাইড বললেও মার্কিন কর্তৃপক্ষ কিন্তু এখনো এই হত্যাযজ্ঞকে জেনোসাইড হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি।

১৯৭১ সালে মার্কিন কূটনীতিক আর্চার কেন্ট ব্লাডের (Archer Kent Blood) কর্মস্থল ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকার কনস্যুলেট বা উপদূতাবাস। আগেও একবার তার ঢাকায় পোস্টিং ছিল। তিনি প্রথম ঢাকায় আসেন ১৯৬০ সালে। তখন তার পদবি ছিল ডেপুটি প্রিন্সিপাল অফিসার। তখন থেকেই এই শহর, এই দেশের মানুষের সঙ্গে জানাশোনা আর্চার কেন্ট ব্লাডের। এরপর একটা বিরতি দিয়ে আবার ঢাকায় আসেন ১৯৭০ সালে। এ সময় তিনি অনেকগুলো ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী হওয়ার সুযোগ পান। যেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ১৯৭০ সালের ভোলা সাইক্লোন (১২ নভেম্বর), ১৯৭০ সালের নির্বাচন, উত্তাল মার্চের অসহযোগ আন্দোলন এবং ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানের বর্বর আক্রমণ।

২৫ মার্চ কালরাতে ঢাকার বুকে হিংস্র হায়েনার মতো হামলে পড়েছিল পাকিস্তানি বাহিনী। নিরস্ত্র, ঘুমন্ত বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মার্কিন ও চীনা সমরাস্ত্রে সজ্জিত হয়ে। ট্যাংক, কামান আর মেশিনগানের গর্জনে প্রকম্পিত হয়েছিল ঢাকার স্নিগ্ধ শরতের আকাশ, ঢাকার রাজপথ। ইয়াহিয়া খানের খুনপিয়াসী এই নরখাদকদের তাণ্ডব নিজ চোখে দেখেছেন আর্চার কেন্ট ব্লাড। ওই রাতে হানাদার বাহিনীর বর্বরতা প্রত্যক্ষ করে ২৭ মার্চ ১৯৭১ সালে মার্কিন দপ্তরে তিনি একটি তারবার্তা পাঠান। যার শিরোনাম ছিল ‘সিলেকটিভ জেনোসাইড’ বা সুনির্দিষ্ট গণহত্যা। এই বার্তায় তিনি লেখেন, ওই রাতে প্রাণ বাঁচাতে ঢাকার মানুষ পুরো শহরে ছোটাছুটি করেছেন, প্রাণ হারিয়েছে অন্তত ছয় হাজার মানুষ। এই তারবার্তার ভাষ্য ছিল এ রকম, ‘ÔHere in Decca [Dhaka] we are mute and horrified witnesses to a reign of terror by Pak Military. Evidence continues to mount that MLA authorities lave list Awami League supporters whom they are systematically eliminating by seeking them out in their homes and shooting them down. Among those marked for extinction in addition to A.L.Õ (The Blood Telegram, Gary J. Bass)

এখানেই শেষ নয়। পরে প্রথা ভেঙে পাকিস্তান বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সমালোচনা করে বিশেষ বার্তা পাঠান আর্চার কেন্ট ব্লাড। উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৭১ সালে শীতল যুদ্ধের বিশ্ব রাজনীতির পরিস্থিতিতে ইয়াহিয়া খানের পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান মিত্র ছিল রিচার্ড নিক্সনের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এ ছাড়া চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে পাকিস্তানের ভূমিকা থাকায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন পাকিস্তানের প্রতি বিশেষভাবে অনুরক্ত। এমন পরিস্থিতিতে নিক্সন প্রশাসনের কোপানলে পড়ার শতভাগ শঙ্কার মধ্যেও সাহসী সিদ্ধান্ত নেন কেন্ট ব্লাড। শুধু তা-ই নয়, এবার তিনি এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করেন অন্যান্য দূতাবাসের কর্মকর্তা ও বিভিন্ন মার্কিন সাহায্য সংস্থার কর্মকর্তাদের। ২০ জনের স্বাক্ষর করা এই বার্তাটি পাঠানো হয় ওয়াশিংটন, করাচি ও লাহোরের মার্কিন দূতাবাসগুলোতে। এই বার্তাটির শিরোনাম ছিল ‘ÔDissent From US Policy Toward East Pakistan’ বার্তাটি ছিল বেশ কড়া। পূর্ব পাকিস্তান ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সমালোচনা। তাতে বলা হয় ‘Our government has failed to denounce atrocities. Our government has failed to take forceful measures to protect its citizens while at the same time bending over backwards to placate the West Pak dominated government and to lessen likely and deservedly negative international public relations impact against them. Our government has evidenced what many will consider moral bankruptcy, ironically at a time when the USSR sent President Yahya (Khan) a message defending democracy, condemning arrest of leader of democratically elected majority party (incidentally pro-West) and calling for end to repressive measures and bloodshed. In our most recent policy paper for Pakistan, our interests in Pakistan were defined as primarily humanitarian, rather than strategic. But we have chosen not to intervene, even morally, on the grounds that the Awami conflict, in which unfortunately the overworked term genocide is applicable, is purely internal matter of a sovereign state. Private Americans have expressed disgust. We, as professional public servants, express our dissent with current policy and fervently hope that our true and lasting interests here can be defined and our policies redirected in order to salvage our nationÕs position as a moral leader of the free world.’ (The Blood Telegram, Gary J. Bass)

নিক্সন-কিসিঞ্জারের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্লাডসহ অন্য ২০ জন আমেরিকানের এই ঔদ্ধত্য একেবারেই মেনে নেয়নি। খড়্গ নেমে আসে আর্চার কেন্ট ব্লাডের ওপর। তিনি কূটনীতিক দায়িত্ব থেকে অপসারিত হন। পরে অবশ্য পররাষ্ট্র দপ্তরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে বিশেষভাবে সম্মানিত হয়েছেন। এদিকে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরতার বিষয়ে তিনি ‘দ্য ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি সুপাঠ্য বই লিখে যান, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম দলিল। বাঙালি জাতির যুদ্ধদিনের এই বিশেষ বন্ধু মারা যান ২০০৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ট কলিন্স, কলোরাডোতে।

২০২২ সালের ২১ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত অপরাধকে জেনোসাইড হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলার মাটিতে ঘটে যাওয়া অপরাধের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আজও নীরব। যদিও একজন মার্কিন নাগরিক আর্চার কেন্ট ব্লাড জেনোসাইড শুরুর প্রথম দিকেই এই বর্বর হত্যাকাণ্ডকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। বাংলাদেশের যুদ্ধদিনের বন্ধু একজন আর্চার কেন্ট ব্লাডের প্রতি কৃতজ্ঞতা।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়