দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন সমঝোতা নিয়ে জটিলতার পরিপ্রেক্ষিতে দোদুল্যমান অবস্থায় পড়েছে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। গতকাল আওয়ামী লীগের সঙ্গে দুই দফা বৈঠকেও আসন সমঝোতা হয়নি। যে কারণে জাপা নির্বাচন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিতে পারে। প্রত্যাহারের চিঠি প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে বলে দলটির একটি সূত্র জানিয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু গতকাল শনিবার রাতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে ফোন করেন। তিনি আজ রবিবার সকালের মধ্যে আসন সমঝোতার বিষয়টি চূড়ান্ত করতে বলেন ওবায়দুল কাদেরকে। অন্যথায় তারা নির্বাচন থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেবেন। নির্বাচন কমিশনকে এ-সংক্রান্ত যে চিঠি দেওয়া হবে, সেটাও টাইপ করে রাখা হয়েছে বলে জানান চুন্নু।
এর আগে শনিবার রাতে জাপার কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদের বাসায় দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা অংশ নেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৈঠকে উপস্থিত থাকা এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে যে তালিকা দেওয়া হয়েছে তা ৩০-এর কম। এই তালিকায় আমাদের দলের ৫ কো-চেয়ারম্যানের মধ্যে কেবল আনিসুল ইসলাম মাহমুদের নাম আছে।’
জাপার এই নেতা বলেন, এই তালিকা মহাসচিব উপস্থাপন করলে বৈঠকে থাকা নেতারা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন এবং নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়ে মত প্রকাশ করেন। নেতাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জাপা মহাসচিব আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে বিষয়টি অবহিত করেন। জাপার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যেসব আসন সমন্বয় হয়েছে, সেখান থেকে শুধু নৌকার প্রার্থী প্রত্যাহার করলেই হবে না, আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও প্রত্যাহার করতে হবে। আর যদি নৌকা প্রত্যাহার করে এবং স্বতন্ত্র না সরায় তাহলে কমপক্ষে ৫০ আসন দিতে হবে। আওয়ামী লীগ এটা না মানলে জাপা নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদককে জানানো হয়েছে।
জাতীয় পার্টির দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণ কিংবা বর্জনের একক সিদ্ধান্ত নেবেন জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের। এ লক্ষ্যে গত ৫ নভেম্বর দলের এক বৈঠকে সর্বসম্মতভাবে চেয়ারম্যানকে এ ক্ষমতা দেওয়া হয়। আসন সমঝোতা না হলে জাপা নির্বাচনে অংশ নেবে না এ রকম সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছেন জিএম কাদের। ফলে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হলেও জাপার দলীয় প্রতীকের চিঠি কাউকে দেওয়া হয়নি। কারণ শেষ মুহূর্তে জিএম কাদের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চাইলেও অনেকেই বেঁকে বসতে পারেন।
জাপার ওই সূত্র জানায়, এ ক্ষেত্রে ২০১৪ সালের নির্বাচনে দলটির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মতো ভুল করতে চান না তার ছোট ভাই জিএম কাদের। ২০১৪ সালের দশম সংসদ নির্বাচন থেকে শেষ মুহূর্তে জাতীয় পার্টি নিজেদের প্রত্যাহারের বিষয়টি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিলেও প্রার্থীদের হাতে প্রতীক বরাদ্দের চিঠি থাকায় তারা এরশাদের নির্দেশ না মেনে রওশনের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নেন।
এবারও জাতীয় পার্টির ভেতর নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়া নিয়ে দুটি মত রয়েছে। জিএম কাদের আগে থেকেই বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার বিষয়ে সরব ছিলেন। কিন্তু ভারত সফর করে আসার পর তিনি আর প্রকাশ্যে কোনো কথা বলছেন না। দলটির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বিভিন্ন সময় নির্বাচনে না যাওয়ার কথা বললেও শেষ মুহূর্তে এসে দলীয় মনোনয়নপত্র বিতরণ প্রক্রিয়া শুরু করেন। তবে প্রথম থেকে জাপার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও সংসদে বিরোধী দল নেতা রওশন এরশাদ নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেন। কিন্তু দলীয় কোন্দলের কারণে তিনি ও তার অনুসারী কয়েকজন মনোনয়ন পাননি। গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী জাপার নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বলে কয়েকটি গণমাধ্যম খবর দেয়। এর পরদিন রওশন এরশাদ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে জাপার সঙ্গে আসন সমঝোতা বা জোট না করার জন্য অনুরোধ জানান। এরপরই আসন সমঝোতার জন্য জাপার সঙ্গে আওয়ামী লীগের আলোচনা গতি পায়। শেষ পর্যন্ত ২৬ আসন সমন্বয় হলেও আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রত্যাহার নিয়ে দলটি বেঁকে বসেছে। আজ সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। এরপরই আওয়ামী লীগ প্রার্থী প্রত্যাহারের জন্য নির্বাচন কমিশনে তালিকা দেওয়ার কথা।