নির্বাচনের অংশ হয়েই ‘খুশি’

একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরও জাতীয় পার্টিকে (জাপা) ২৯টি আসনে ছাড় দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। এবার তিনটি কমিয়ে ২৬ আসন ছাড় দিয়ে জাপাকে ‘সন্তুষ্ট’ রাখতে পেরেছে ক্ষমতাসীনরা। এ কারণে নানা মহলে আলোচনা হচ্ছে, তাহলে সরকারি দলের সঙ্গে এত দেনদরবার করে কী লাভ হলো?

জানতে চাইলে জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কী পেলাম সেটা বড় কত নয়, একটা অনিশ্চয়তা দূর হলো এবং জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত হলো। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সরকার পরিবর্তনের একমাত্র মাধ্যম নির্বাচন, এখন আমরা সেই প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছি।’ জনগণ যদি ভোট দেয় তাহলে জাপা বড় জয় পাবে বলে তিনি মনে করেন।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে জাপাকে ছেড়ে দেওয়া ২৯ আসনের মধ্যে ২২টিতে জয়লাভ করে দলটি। এবার বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো নির্বাচন বর্জন করায় জাপা আশা করেছিল তাদের অন্তত ৪০টি আসন দেওয়া হবে। এ নিয়ে দেনদরবার চালিয়ে আসছিল তারা।

আওয়ামী লীগের সঙ্গে ২৬টি আসনে সমঝোতার ভিত্তিতে জাপা নির্বাচনে গেলেও এসব আসনের কয়টিতে তারা জয়লাভ করবে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। দলের ভেতরেও এ নিয়ে আলোচনা ছিল শনিবার রাত পর্যন্ত। জাপা নেতারা মনে করছেন, নৌকার প্রার্থী প্রত্যাহার করে নিলেও আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী মাঠে থাকায় তারা বড়জোর সাত-আটটি আসনে জয় পাবেন। এতে দলের দুরবস্থায়ই মানুষের কাছে উন্মুক্ত হবে। তার চেয়ে ভোটে না গিয়ে ‘হিরো’ হওয়ার পথ বেছে নেওয়ার প্রস্তাবও আসে নেতাদের কাছ থেকে। সেদিন রাতে দলের বনানী কার্যালয়ের সামনে নির্বাচনে যাওয়ার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়। গতকাল রবিবার সকালে বিক্ষোভ হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিকেলে জাপা নেতাদের সমঝোতা করতে হয়েছে।

নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে ছয় দফা বৈঠক হয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে জাপার। কিন্তু সমঝোতার পথ না খোলায় শেষ পর্যন্ত নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চিঠিও প্রস্তুত করা হয়। গতকাল সকাল থেকে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে। বৈঠক সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনে না যাওয়ার পক্ষে মত দেন অনেক সিনিয়র নেতা। এ লক্ষ্যে তারা কার্যালয়ের সামনে নেতাকর্মীদের দিয়েও মিছিল করান। একপর্যায়ে জাপা চেয়ারম্যানের বনানী কার্যালয়ের আশপাশে পুলিশের সতর্ক অবস্থান দেখা যায়। এ ছাড়া কার্যালয়ের ভেতরে গিয়ে সরকারি সংস্থার লোকজন গিয়ে কথা বলেন জিএম কাদের ও অন্য নেতাদের সঙ্গে। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে দলের মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু যখন নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেন তখন তার পাশে ছিলেন না জাপার ছয় কো-চেয়ারম্যানের কেউ। আসন সমঝোতার পর জাপা কো-চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ ঢাকার রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর চিঠি দিয়ে ঢাকা-৬ আসন থেকে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। কাজী ফিরোজের মতো সমঝোতার তালিকায় জায়গা হয়নি জাপা কো-চেয়ারম্যান আবু হোসেন বাবলা ও সালমা ইসলামের।

বগুড়া-২ আসনটি জাতীয় পার্টির প্রার্থী শরিফুল ইসলাম জিন্নাহকে ছেড়ে দিয়েছে আওয়ামী লীগ। ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। জয়লাভ সহজ হয়ে গেল কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বলতে পারেন প্রথম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি। কিন্তু স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা আমার পক্ষে কাজ করবেন কি না, তা নিশ্চিত নয়।’

নিজেকে দলের (জাপা) একটা অংশের ষড়যন্ত্রের শিকার বলে মনে করেন আবু হোসেন বাবলা। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সমঝোতার তালিকায় শুরুর দিকে আমার নাম ছিল। কিন্তু আলোচনার একপর্যায়ে আমার দলের একটা অংশ ষড়যন্ত্র করে আমার নাম বাদ দেয়।’ তিনি বলেন, ‘আমি মাঠের যোদ্ধা। তাই এবারের নির্বাচন থেকে সরে না গিয়ে লাঙ্গল নিয়ে নির্বাচন করব।’

সংবাদ সম্মেলনে কো-চেয়ারম্যানদের উপস্থিত না থাকা নিয়ে জাপা মহাসচিব বলেন, ‘গত কয়েক দিনের টানা মিটিংয়ে অনেকেই ক্লান্ত ছিলেন। তবে সংবাদ সম্মেলনের সময় কার্যালয়ে ছিলেন রুহুল আমীন হাওলাদার ও আনিসুল ইসলাম মাহমুদ। দলে কোনো বিরোধ নেই।’

জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের মৃত্যুর পর প্রথমবারের মতো নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে দলটি। এরশাদের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও কৌশলের কারণে দলটি এতদিন ভোটের মাঠে লড়াই করছিল। তার অনুপস্থিতিতে এবার কেমন করবে তা নিয়েও আছে নানা অনিশ্চয়তা। গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতা ছাড়ার পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জেলে থেকে পাঁচটি আসনে জিতেছিলেন এরশাদ। তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা কাজে লাগিয়ে দল হিসেবে জাপা ৩৫টি আসনে জিতেছিল। গণআন্দোলনে যারা ক্ষমতাচ্যুত হলো তাদের এমন বিজয় অনেকেই অবাক করেছিল। এরশাদ জীবিত থাকতেই দলটি চারবার ভেঙেছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত এরশাদ নির্বাচনী রাজনীতিতে জাপার গুরুত্ব ধরে রাখতে পেরেছিলেন।

১৯৯৬ সালের জুনের নির্বাচনে ৩৩ আসনে জয়লাভ করেছিল জাপা। ওই সময়ও তিনি জেলে ছিলেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে ১৪টি আসনে জয়লাভ পায় জাপা। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোট করে জাপা। ২৯টি আসনে ছাড় দেয় আওয়ামী লীগ। এর মধ্যে ২৭টিতেই জয়লাভ করেন জাপার প্রার্থীরা। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জাপা প্রার্থী দিয়েছে এমন ২০টি আসনের একটিতেও জয় পায়নি জাপা। ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপি ও সমমনা দলগুলো এবারের মতো বর্জন করেছিল। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতা করে ৩৩টি আসনে জয় পেয়েছিল জাপা। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও জাপা প্রার্থীর ছিল এমন ৫৫টি আসনের মধ্যে ৪৬টিতেই হেরেছিল দলটি।

এবার আলোচনার টেবিলে দলের চেয়ে পরিবারকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন জিএম কাদের, এমন আলোচনাও আছে দলের ভেতর ও বাইরে। এরশাদ পরিবারের যে তিনজন মনোনয়ন পেয়েছেন, তাদের সবার আসনেই ছাড় দিয়েছে আওয়ামী লীগ। রংপুর-৩ আসনে জিএম কাদের, ঢাকা-১৮ আসনে তার স্ত্রী শেরিফা কাদের এবং রংপুর-১ আসনে জিএম কাদেরের বড় ভাইয়ের ছেলে হোসেন মকবুল শাহরিয়ারকে ছাড় দিয়ে দলীয় প্রার্থী প্রত্যাহার করে নিয়েছে আওয়ামী লীগ।