অস্তিত্বের লড়াই থেকে উড়ে চলার স্বপ্ন

অনেক বছর আগে ট্রেনে করে সিলেট থেকে ঢাকা আসছি। শায়েস্তাগঞ্জ স্টেশনে সম্ভবত, এক তরুণ উঠল ব্যস্তসমস্ত হয়ে। এখনো হয়, তবে তখন আরও বেশি ছিল বিষয়টা, একই সিট নম্বর দুজনকে দিয়ে দেওয়া। তরুণের সিটও আগে থেকে কেউ একজনের দখলে। সিট আমার, এই যে দেখেন টিকিট এরকম তর্ক মনোযোগ আকর্ষণ করে। দুজনের মধ্যে কে সঠিক দাবিদার, সেটাও বুঝতে ইচ্ছে হয়। চোখ সেদিকে ফেলতেই তরুণের পক্ষে চলে গেলাম। কারণ, তার হাতে ভোরের কাগজ পত্রিকা। তখন তারাই আজকের কাগজ-ভোরের কাগজ পড়ে, যারা চিন্তায় আধুনিক এবং অগ্রসর। নিজেও সেই পত্রিকার নিবিষ্ট পাঠক বলে, এক ধরনের অদ্ভুত নৈকট্য বোধ করলাম। পরে মুখের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত। আমার বহু বছর আগের স্কুলজীবনের বন্ধু। স্কুলের পর বাবার ট্রান্সফার সূত্রে হারিয়ে গিয়েছিল। ইন্টারনেট-ফেসবুকহীন সেই জীবন এমনই ছিল। চমকের। হারিয়ে যাওয়া বন্ধুকে ট্রেনের টিকিটের জন্য লড়াইরত অবস্থায় পুনরুদ্ধার। এত বছর পরও যখন গল্পটা মনে আসে তখন একটা অবাক ব্যাপার ঘটে। বন্ধু আবিষ্কারের চেয়েও পত্রিকাজনিত সহমর্মিতাই ছবি হয়ে আসে আগে।

সত্যি বললে, তখন এভাবেই পত্রিকা পড়া দিয়ে এক ধরনের সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস হতো। আজকের কাগজ-ভোরের কাগজ পড়বে প্রগতিশীল এবং ক্রীড়াপ্রেমী তরুণরা। সংবাদ পড়বে একটু বয়স্ক, বামঘেঁষা মানুষরা। ইত্তেফাক পড়বে অর্থোডক্স-ঐতিহ্যমুখী লোকজন। ইনকিলাব ডানপন্থিদের পত্রিকা, যখন বাংলার বাণী যে পড়বে সে নিশ্চিতভাবেই আওয়ামী লীগ কর্মী। পত্রিকাভিত্তিক এ শ্রেণিবিন্যাসটা এখন হারিয়ে গেছে। কারণ নিজেদের বড় করার বদলে আমরা এখন ব্যস্ত অন্য লড়াইয়ে। সময় এবং অন্য সব সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার বিরুদ্ধে এ এক কঠিন লড়াই। একভাবে বললে, অস্তিত্বের লড়াই। আর অস্তিত্বের এই যে লড়াই, সেখানেও একটা প্যারাডক্স আছে। আমরা ভাবি, অনলাইন, ডিজিটাল, সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদির কারণে সংকট, কিন্তু সেটাও সম্ভবত সরলীকরণ। কারণ, আমরা যে এখন প্রচার সংখ্যার লড়াইয়ে নেই তার কারণ তো এটাও যে, এখন বেশি না ছেপেও পাঠকের কাছে পৌঁছানো যায়। অনলাইন, ওয়েবসাইট সেই সুযোগ করে দিচ্ছে। ডিজিটাল মাধ্যম, সোশ্যাল মিডিয়া দিয়ে অন্যভাবেও যাওয়া যাচ্ছে অনুসরণকারীদের কাছে। সব মিলিয়ে এখনকার শিক্ষা বোধহয় এই যে, মিডিয়াকে হতে হবে সর্বমুখী। যা, পত্রিকা-টিভি-অনলাইন সবাই হয়ে যাচ্ছে বা গেছে। আমাদেরও তাই পত্রিকার সঙ্গে অনলাইন-ডিজিটাল সব বিভাগ সরব ও সক্রিয়। নতুন সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে সেখানে মনোযোগ-উদ্যোগ-বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে। তারা এগোচ্ছে।

কিন্তু মূল জায়গা তবু ছাপা পত্রিকাই। সংখ্যা বা সেই শক্তিজনিত প্রভাব গেছে, কিন্তু একেবারেই কি গেছে? আরেকটা গল্প বলি। ঘটনাচক্রে এটাও ট্রেনের। যেতে যেতে কথা হচ্ছিল একদল তরুণের সঙ্গে। অবাক হয়ে দেখলাম, তাদের জগৎ মূলধারার মিডিয়ার চেয়ে বহু বহু দূরে। শেষ কবে পত্রিকা কিনেছে মনে করতে পারে না। শেষ কবে টিভি ছেড়েছে সেটাও তারা জানে না। ‘তাহলে খবরাখবর তোমরা কিছু রাখো না?’

‘রাখি না মানে?’ রেগে উঠল একজন।

তারপর কী কী খবর তারা রাখে ফিরিস্তি দিতে শুরু করল। অবাক হয়ে দেখলাম, খবরাখবর তারা রাখে এবং এমন সব খবরাখবর যার অনেক কিছু আমরা জানিই না। জেনারেশন গ্যাপ! মূলধারা ধার হারিয়ে ভুল ধারা হয়ে গেছে? তাই মনে হতো কিন্তু যখন একটা বিষয়ে তাদের মধ্যে বিতর্ক দেখা দিল তখন তাদেরই একজন দাবি করল, ‘আমি ঠিক। অমুক পত্রিকায় লিখেছে।’ দেশের শীর্ষ একটি গণমাধ্যমের উল্লেখ। এবং সে সেই পত্রিকার সাইটে গিয়ে সেটা দেখাল। বাকিরা মেনেও নিল। বুঝলাম, খবর তারা তাদের মোবাইলেই পায়। সহজলভ্য-বিনামূল্যের বলে তাতে মেতে থাকে কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস করে প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমকেই। আর তাই চলতি ট্রেনে আরেকটা বোধ তৈরি হলো। মূলধারার গণ্যমাধ্যম ভুল ধারা হয়নি বরং মূল্যবান ধারা হয়েছে। গুরুত্ব তৈরি হয়েছে অন্যভাবে। দায়িত্ব এখন অন্যরকমের। নিজের সেই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলো, পরে আসা একটা জরিপেও। যেখানে তরুণরা বলছে, খবর পড়ে তারা সোশ্যাল মিডিয়ায় কিন্তু বিশ্বাস করে সবচেয়ে বেশি ছাপা পত্রিকাকে। ছাপা পত্রিকা সেখানে সবরকম মাধ্যম থেকে এগিয়ে। তার মানে, এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় যত খবর ছড়াবে এর ছাঁকনির দায়িত্ব মূলধারার। দায়িত্ব আছে আরও। সারা দিন অসংখ্য খবর ঘুরে বেড়াবে, পত্রিকাগুলো সেগুলো বাছাই করে সাজিয়ে জানায়, কোন খবরটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনটা পড়া উচিত। একই কাজ করে টিভিগুলো বা মূলধারার অনলাইন। কিন্তু এ দায়িত্ব পালন করার ধরনও বদলেছে। সেই ধরনের সঙ্গে তাল মেলানোর ধারাতেই আসবে ‘দেশ রূপান্তর’। আমরা পাঁচ বছর পূর্ণ করছি আজ। সেটা অনেক আনন্দের। আনন্দে বিশেষ মাত্রা যোগ করছে গত এক বছরের পথচলা। অন্যভাবে সাজিয়ে সকালের পত্রিকা দিয়ে দিনের ধরন বুঝিয়ে দেওয়ার যে চিন্তা, সেটা পাঠকরা গ্রহণ করেছেন দারুণভাবে। ছবির ব্যবহার, গ্রাফিকস, শিরোনাম ইত্যাদি দিয়ে প্রচলিত ধারাটা বদলে দিতে চেয়েছি কিছু কিছু ক্ষেত্রে।

যেহেতু মানুষ তাৎক্ষণিক খবর চায় এবং সেই অনুযায়ী দেওয়ার প্ল্যাটফর্মও আছে, আমরা তাই আমাদের অনলাইনকে দেখছি তাৎক্ষণিক খবর দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে, যা অন্যরাও করছে। ডিজিটাল মাধ্যম সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সংযোগ রাখছে। আর খবর যেহেতু দেওয়াই হয়ে যাচ্ছে, তাই পরদিনের পত্রিকাকে প্রাসঙ্গিক রাখতে বদল নিয়ে আসতে চাইছি প্রকাশের ধরনে। খেয়াল করলে দেখবেন, বড় বা বিশেষ ঘটনায় আমাদের প্রকাশভঙ্গি থাকে অন্যরকম। আমরা ঘটনার বড়ত্ব দেখাই প্রকাশের ধরন দিয়ে। অনলাইন-ডিজিটাল তাদের কাজ করার পরও ছাপার শক্তি রয়ে গেছে কিছু। একে স্থায়িত্ব, তার সঙ্গে মানুষের অনুভূতির সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে তাকে বিষয়টার ব্যাপকতা বা বাস্তবতা বোঝানোর এ ধরনটা আমাদের পাঠকদের মনোযোগ কেড়েছে এবং শুভানুধ্যায়ীরা কেউ কেউ যে এর মধ্যে ছাপা পত্রিকার ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন, তা আমাদের অনুপ্রাণিত করে। ছাপা পত্রিকা টিকতে হবে, কারণ সত্যি বললে বাংলাদেশের বাস্তবতায় এ মাধ্যমেই এখনো সাংবাদিকতার সুযোগ অনেক বেশি। গত এক বছর খেয়াল করুন, এখান থেকেই বেরিয়েছে বড় বড় সব খবর। আর খবর প্রকাশে দেশ রূপান্তর সবসময় এগিয়ে থাকার চেষ্টা করে। সেই চেষ্টা এই বছর আরও বেশি করে ছিল। আরও ধারাবাহিক থাকার চেষ্টা ছিল আমাদের। পাঠকদের বিচারের ফলাফল আশাব্যঞ্জক। আর এ নতুনত্বের চেষ্টা সম্ভব হয়েছে অসম্ভব কিছু মেধাবী আর নিবেদিতপ্রাণ সহকর্মী সঙ্গে আছে বলেই। ধন্যবাদ আর কৃতজ্ঞতা তাদের প্রতি।

ছাপার ধরনে নতুনত্বের চেষ্টা। অনলাইনে এগিয়ে থাকার নিরন্তর তৎপরতা। ডিজিটালে বর্তমান সময়ের চাহিদাকে ধারণ করা। দেশ রূপান্তর ছাপা কাগজকে মূলে রেখে দুই উইংকে শক্তিশালী করে সত্যিকারের নির্ভরযোগ্য সর্বমুখী মিডিয়া হিসেবে আগামীর দিকে এগোচ্ছে দৃঢ় পায়েই। এবং চাই সব মিডিয়াকে নিয়ে একসঙ্গেই এগোতে। এবং নিশ্চয়ই চাই যত বেশি সম্ভব পাঠককে সঙ্গে রাখতে।

একটা সময় মিডিয়া মানুষের মতামত তৈরি করত। এই পাগুলে সময়ে বিষয়টা হয়ে যাচ্ছে উল্টা। এখন উল্টা জনমতটা জেনে যাওয়ায় তাৎক্ষণিক হাওয়ায় সংবাদমাধ্যমই সেটা দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে জনমত আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই আবেগতাড়িত, রাজনৈতিকভাবে তীব্র ও উগ্র। তাতে ভেসে যাওয়াটা তাই অনেক ক্ষেত্রে ভ্রান্তির ফাঁদ।

সরকারি রক্তচক্ষু, বিরোধীদের উগ্রতা, জনমতের তীব্রতা, ব্যবসায়িক জটিলতা। থরে থরে সাজানো বাধা।

চ্যালেঞ্জ এখন এমন নানামুখী বাধার ফাঁদ কেটে বেরোনোর। সংবাদ আর সাংবাদিকতাকে রক্ষার।

সম্ভব? আমরা আফসোস করি মানুষ তো দূরে সরে যাচ্ছে আমাদের কাছ থেকে। কিন্তু দূরে যাওয়া বা দূর দূর করা মানুষকেও আমাদের প্রয়োজন। যেমন তাদেরও প্রয়োজন সৎ আর নীতিমুখী সাংবাদিকতার।

দেশ রূপান্তর সেই চিন্তা থেকেই নতুন করে সাজছে। মন্ত্র দুটো- আমরা যুগের হুজুগে ভেসে যাব না। কিন্তু যুগোপযোগী থাকব।

যারা দূর দূর করছে তাদের দূরে ঠেলব না। দূরত্বটা ঘোচাব। নতুন এ সজ্জায় তাই সঙ্গী হওয়ার আমন্ত্রণ। দেখবেন আমরা টিকেই থাকব না শুধু। উড়ব একদিন।