সফদার ডাক্তার মাথাভরা টাক তার। দেশ রূপান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার দুলাল হোসেনেরও মাথাভরা টাক। তবে সেই মাথাভরা থাকে নিউজ আইডিয়ায়ও। শুধু আইডিয়া করেই বসে থাকেন না, আইডিয়াগুলোকে নিউজে রূপান্তর করতে দেরি করেন না। তার নিউজের হিসাব রাখাই কঠিন। কোনটা ছাপা হলো, কোনটা হলো না, আবার এর ফাঁকেই নতুন নিউজ ছেড়ে দিচ্ছেন। সব মিলিয়ে নিউজের খনি তিনি।
এই দুলাল হোসেনই দেশ রূপান্তরে এ বছরের অন্যতম সেরা রিপোর্টটি করেছেন। ১৮ সচিবকে প্লট উপহার শিরোনামে নিউজ করে ব্যাপক সাড়া ফেলেছেন। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এ নিউজের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন, ফলোআপ চেয়েছেন।
নির্বাচনী বছর হওয়ায় পাঠকরা মনে হয় এ নিউজের সঙ্গে নির্বাচন টেনে এনেছেন। নির্বাচন কমিশন সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের সচিবসহ নির্বাচন-সংশ্লিষ্টরা প্লট পাওয়ায় পাঠকরা বিষয়টি লুফে নিয়েছেন। যদিও নিউজে নির্বাচন ফোকাস করা হয়নি।
দেশ রূপান্তরে আলোচিত রিপোর্ট বাছাইয়ে একটা প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়। এতে সর্বোচ্চ মানের নিউজটাই পুরস্কৃত হয়। বার্তা সম্পাদক ও অতিরিক্ত বার্তা সম্পাদক মাসের আলোচিত রিপোর্ট বাছাই করেন। তাদের সঙ্গে আছেন প্রধান প্রতিবেদক ও অপরাধ বিভাগের প্রধান। এসবের সঙ্গে যোগ হয় সম্পাদকের মতামতও।
রিপোর্টারদের সবচেয়ে আগ্রহের বিষয় মাসের আলোচিত রিপোর্টের নাম নিয়ে। রিপোর্টারদের সাপ্তাহিক সভা হয় প্রতি শনিবার। প্রতি মাসের প্রথম শনিবার আগের মাসের সেরা রিপোর্টারের নাম প্রকাশ করা হয়। ১৮ সচিবকে প্লট উপহার লিখে গত অক্টোবর মাসের আলোচিত রিপোর্টের পুরস্কার পেয়েছিলেন দুলাল হোসেন।
দেশ রূপান্তর শুধু সরকারের সমালোচনাই করে না। সরকারের করা ভালো কাজ দায়িত্বশীলতার সঙ্গে তুলে ধরে। নান্দনিকতার সঙ্গে তা সাধারণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেয়।
আমাদের শহরে মেট্রো এসেছে। মেট্রোর বিশাল প্রভাব পড়েছে শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থায়। নগরজীবনে এমন প্রভাব পড়বে বিষয়টি আমরা বুঝতে পেরেছি বলেই কাগজের পুরো পৃষ্ঠা জুড়ে মেট্রোর ছবি ছাপা হয়েছে উদ্বোধনী দিনে। এর সঙ্গে লেখা। ওইদিন দেশের অন্যান্য কাগজে যেসব গুরুত্বপূর্ণ নিউজ ছাপা হয়েছে, দেশ রূপান্তরে তার সবই ছিল। বড় ছবি ছাপার পর কোনো গুরুত্বপূর্ণ নিউজই বাদ পড়েনি।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার জন্মদিনেও বড় ছবি ছাপা হয়েছিল। এত সুন্দর ছবি পৃষ্ঠা জুড়ে আগে কখনো ছাপেনি দেশ রূপান্তর। ছবির সঙ্গে একাধিক নিউজ করেন পাভেল হায়দার চৌধুরী। এসব নিউজে ব্যক্তি শেখ হাসিনা যেসব ক্ষেত্রে অপ্রতিরোধ্য তা তুলে ধরা হয়। অপ্রতিরোধ্য ছাপা হওয়ার পর অনেকে ভ্রু কপালে তুলেছেন। কিন্তু দেশ রূপান্তর নির্মোহ জায়গা থেকেই তা ছেপেছে। অপ্রতিরোধ্য লেখার জন্য পাভেল হায়দার চৌধুরী সেপ্টেম্বর মাসের সেরা রিপোর্টের পুরস্কার পান। পাভেল হায়দার চৌধুরী গত বছর দেশ রূপান্তরে সবচেয়ে বেশি রিপোর্ট করেছেন। সব পৃষ্ঠা মিলিয়ে তার রিপোর্টের সংখ্যা ১৬৮টি। যেকোনো কাগজের জন্যই পাভেল হায়দার চৌধুরী একজন সম্পদ।
সরকারি চাকরি সোনার হরিণ। একবার পেয়ে গেলে সম্পদের পাহাড় গড়া যায়। যখন নিজে আর ভোগ করতে পারেন না তখন আত্মীয়স্বজনকে সুযোগ করে দেন। দেশ রূপান্তর এসব অনিয়মের হোতাদের কুকর্ম তুলে ধরে। এর জন্য অনেক দুর্ভোগের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। হুমকি-ধমকি, মামলা-হামলার ভেতর দিয়ে যেতে হয় রিপোর্টারদের। আরও বড় ক্ষতি হয় বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে। যারা সম্পদের পাহাড় গড়েন তারা সাধারণত নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে থাকেন। খবরের কাগজে তারা বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেন। বিজ্ঞাপন হচ্ছে সংবাদপত্রের জীবনীশক্তি। তা বন্ধ হয়ে গেলে তীব্র আর্থিক সংকটে পড়তে হয়। বিটুমিন চক্রে বিপিসি চেয়ারম্যানের ভাই। নাজমুল লিখন এ নিউজ লেখার পর বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেয় সংস্থাটি। তারপরও থেমে না থেকে পাঠকদের সঙ্গী করে এগিয়ে যায় দেশ রূপান্তর। নাজমুল লিখনের এ রিপোর্ট আগস্ট মাসের সেরা রিপোর্টের মর্যাদা পায়। প্রকৌশলে লেখাপড়া শেষ করে সাংবাদিকতায় ঢুকেছেন মেধাবী রিপোর্টার নাজমুল লিখন।
বিদেশি চারায় সর্বস্বান্ত কৃষক রিপোর্টে শরীফুল আলম সুমন একটি আনএক্সপ্লোর সমস্যা তুলে এনেছেন। তার বিট শিক্ষা। কৃষি বিটে তিনি দায়িত্ব নিয়েছেন দিন কয়েক হলো। খুবই অল্প সময়ে এ মাপের একটি রিপোর্ট করে তিনি দেশ রূপান্তরের লিডের বৈচিত্র্য ধরে রেখেছিলেন। এ রিপোর্টটি জুলাই মাসের সেরা রিপোর্ট হয়েছিল। এ ছাড়া মে ও ফেব্রুয়ারি মাসে যুগ্মভাবে জিতেছিলেন আরও দুটি আলোচিত রিপোর্টের পুরস্কার। চলতি বছর তিনিই সবচেয়ে বেশিবার মাসসেরা রিপোর্টের পুরস্কার পান। প্রায় প্রতি মাসেই তার রিপোর্ট মাসসেরা হওয়ার দৌড়ে থাকে। শরীফুল আলম সুমন শিক্ষা বিটে এমন কিছু রিপোর্ট করেছেন, যা সচরাচর ওই বিটের রিপোর্টাররা করেন না। এসব রিপোর্ট করে তিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যা তুলে আনেন। এ সেক্টরে গত বছর সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির রিপোর্ট করেছেন তিনি। যেখানে এ সেক্টরের রিপোর্টাররা ‘ডেজ ইভেন্ট’ নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন, সেখানে তিনি দুর্নীতির স্বরূপ উন্মোচন করার চেষ্টা করেছেন। শিক্ষা বিটের প্রথাবিরোধী শরীফুল আলম সুমনকে সম্প্রতি রিপোর্টিংয়ের বাইরেও আরও কিছু দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
মতিন আব্দুল্লাহ নীরবে চলেন। মেপে কথা বলেন। অনর্থক বিতর্কে জড়ান না। তিনি কথা বলেন কম, শোনেন অনেক বেশি। একজন ভাবুক ব্যক্তির যত গুণ দরকার, তার প্রায় সবই আছে। দেশ রূপান্তরের অন্যতম সেরা এ রিপোর্টার ‘হেসেখেলে হাওয়া ৩২২’ লিখে এপ্রিলের সেরা রিপোর্টার হয়েছিলেন।
সরোয়ার আলম দেশ রূপান্তরের অপরাধ বিভাগের প্রধান। তিনি ‘১৩ পরিবারের দখলে সেন্টমার্টিন’ লিখে মাসসেরা হয়েছিলেন মার্চে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রায় সব পর্যায়ে তার ব্যাপক যোগাযোগ। এ কারণেই ক্রাইমের রিপোর্টে দেশ রূপান্তর এগিয়ে থাকে।
আইনাঙ্গন নিয়ে বড্ড মেতে থাকেন উৎপল রায়। যদিও আইনের জটিল বিষয়গুলোকে তিনি তার গাম্ভীর্য দিয়ে আরও বেশি জটিল করে তোলেন। আদালতে পান থেকে চুন খসলেও তা তার নজর এড়ায় না। আদালতের দৈনন্দিন বিষয়ের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন বলেই পাঠক আরও বেশি বিশেষ নিউজ থেকে বঞ্চিত হন। গত বছর এ রিপোর্টারের ‘এক মামলায় ৭০ বছর’ পাঠকের মনোযোগ কেড়েছিল। গত মে মাসে ‘১৪৪ এজলাসের ভার’ লিখে আলোচিত রিপোর্টারের খেতাব জিতেছিলেন।
ফটো এডিটর হয়েও রিপোর্টারদের পুরস্কারে ভাগ বসিয়েছেন সাহাদাত পারভেজ। জানুয়ারিতে তার আলোচিত লেখা ছিল ‘মৃত ভেবে এতদিন দেখনি যারে’। এ ছাড়া ‘চেয়ারম্যানের ভাইকে ঋণ দিতে কত কান্ড’ লিখে জুন মাসের সেরা রিপোর্টার হয়েছেন এ জেড ভূঁইয়া আনাস।
এসব রিপোর্ট ভাইরাল হয়েছিল, আলোচনায় ছিল। এগুলোর বাইরেও অসংখ্য নিউজ আলোচনার টেবিলে জায়গা করে নেয়। পলিটিক্যাল বিটের বিভিন্ন রিপোর্টে দেশ রূপান্তর নিশ্চিতভাবেই এগিয়ে আছে। গুরুত্ব পেয়েছে ক্রাইমের বিভিন্ন নিউজ। দুর্নীতি সেটা প্রান্তিক বা কেন্দ্রীয় যে পর্যায়েই হোক না কেন, দেশ রূপান্তর তা তুলে আনার চেষ্টা করেছে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ‘এসো জিতি’ করে রিপোর্টিংয়ের ধারণাই পাল্টে দিয়েছে।
সবকিছু মিলে খবরে দেশ রূপান্তর খবরে এগিয়ে আছে এগিয়ে থাকবে।
শুধু খবরেই নয়, আরও কিছু বিষয় সংযোজন ও পুনর্বিন্যাস করে দেশ রূপান্তর পাঠকের চাহিদা পূরণ করতে চেয়েছে।
এতদিন অনলাইন গুরুত্ব পায়নি। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে আমাদের অনলাইনে প্রবেশ করেছেন ১৪ লাখ ১৯ হাজার পাঠক। গত মাসে এ পাঠক ছিল ৮৭ লাখ। ডিসেম্বর মাসে তা এক কোটিতে পৌঁছে যাবে। ২০২৪ সালে অনলাইন ইউজারের সংখ্যা হবে দুই কোটি। ডিজিটালও গুরুত্ব পেয়েছে। মিলিয়ন ভিউ ভিডিও ২৫টি। ফাইভ মিলিয়ন ভিডিওও আছে দেশ রূপান্তর ডিজিটালের।
রিপোর্টিং, অনলাইন বা ডিজিটালের বাইরে ফিচার, এডিটরিয়াল, স্পোর্টস সবকিছুতেই পরিবর্তনের চেষ্টা রয়েছে। শিল্প-সাহিত্য সংস্কৃতি অঙ্গনের খবরেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ‘ধ্রুপদি’ বের করে আমরা এ জগতেরও মনোযোগ আকর্ষণ করেছি। এ পাতার ব্যাপক সাড়া সেই প্রান্তিক পর্যায় থেকেও।
শুক্রবারে একটা ‘আড্ডা’ পাতা বের হয়। এটাও বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যায়ে দেশ রূপান্তরের একটা জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টা। শিশুদের পাতা ছিল না। এখন দেশ রূপান্তরেরও শিশু পাতা আছে। নামটা বড্ড মিষ্টি। পাতার নাম মিঠাই।
আইটির বাইরে কিছু নেই এখন। আইটি ছাড়া কি চলে? ঘুমাতে যাওয়ার আগপর্যন্ত আইটি। ঘুম থেকে উঠেই আইটি। সেই আইটি নিয়ে আমাদের আছে ‘ক্লিক’ পাতা। শিশু-কিশোরদের পাঠ্যাভ্যাস বাড়ানোর জন্য দেশ রূপান্তরে আছে ‘ক্লাসরুমের বাইরে’।
পুরনো পাতাগুলো কি চেঞ্জ হয়নি? হয়েছে তো। ‘রূপ রূপান্তর’ ছিল শুধু ফ্যাশনের পাতা। এখন তা পুরো লাইফস্টাইলের পাতা। ‘বিশেষ করে’ খবর বিশেষভাবে বলতে হবে। এই পাতাটা খোলস পাল্টে ফেলেছে।
রিপোর্টিং, খেলা, ফিচার সবকিছু মিলে পারিবারিক খবরের কাগজ হয়ে উঠেছে দেশ রূপান্তর।