রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যরা একই জমি বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি ও ৩টি ব্যাংকে বন্ধক রেখে হাজারের বেশি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, রফিক ও তার ছেলে কাউসার আহমেদ অপু নিজেদের জমি বিক্রি করেন। পরে বিক্রি করা জমি নিজের পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও ক্রয়-বিক্রয় করে জাল দলিল তৈরি করেন। জাল দলিলের জমি আবার বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এওয়াজ বদল করেন। এওয়াজ বদলে পাওয়া সেসব জমি ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ও ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের বসুন্ধরা শাখায় বন্ধক রেখে ঋণ নেন। এভাবে জালিয়াতি করে প্রায় ১ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
রফিকুল ইসলামের জমি ক্রয়-বিক্রয় ও ব্যাংকঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে ভয়ংকর জালিয়াতির তথ্য উঠে এসেছে এক অনুসন্ধানে। তিনি একদিকে জালিয়াতি করে ৩টি ব্যাংকের ৯৪৫ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এর মধ্যে ৪৭৫ কোটি টাকা নিয়েছেন সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে, যা সুদসহ এখন দাঁড়িয়েছে ৭২৫ কোটি টাকায়। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক থেকে নিয়েছেন ২৭০ কোটি টাকা, সুদ-আসলে যা এখন বেড়েছে। ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে নিয়েছেন ২০০ কোটি টাকা, এই ব্যাংকেরও সুদ-আসলে পাওনা বেড়েছে। সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের পাওনা সুদ-আসলসহ হিসাব করলে তার কাছে ব্যাংকের পাওনা দাঁড়ায় ১ হাজার ৬২০ কোটি টাকাও বেশি। যদিও ঋণের কিস্তির টাকা না দেওয়ায় তিনি খেলাপি হতে চলেছেন।
তিনটি ব্যাংক থেকে ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিলেও মর্টগেজ হিসেবে রাখা হয়েছে একই জমি। সেই জমিগুলোর অধিকাংশই হয় ঋণ নেওয়ার আগে বা ঋণ নেওয়ার পরে বিক্রি করে সটকে পড়েছেন রফিকুল ইসলাম। অন্যদিকে জমি ব্যাংকে বন্ধক রাখলেও সেই তথ্য গোপন করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করেন। তিনি এমন প্রতারণা করে ৪২৫ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রফিকুল ইসলামের এমন জালিয়াতিতে ব্যাংক কর্মকর্তারাও জড়িত থাকতে পারেন। তা না হলে বিক্রি করা জমি দেখিয়ে কীভাবে ঋণ পেলেন। আর ঋণ নেওয়ার পর বন্ধকী জমি কীভাবে বিক্রি করেন? কারণ ব্যাংক তো মর্টগেজের জমি সরজমিনে গিয়ে দেখে। জমির ভ্যালু নির্ধারণ সরজিমনে না গিয়ে কীভাবে করেছে? জমির মালিকানা যাচাইয়ে রেজিস্ট্রি অফিসে খবর নেওয়ার কথা। রফিকুল ইসলামকে ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে কি এসব নিয়ম মানা হয়নি?
৯৪৫ কোটি টাকা লুটপাটে ৩ ব্যাংকের সঙ্গে যেভাবে প্রতারণা : অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, রফিকুল ইসলাম ৫ দফায় রংধনু বিল্ডার্স (প্রাইভেট) লিমিটেড ও মেসার্স মেহেদী মার্টের নামে এসআইবিএল থেকে ৪৭৫ কোটি টাকা ঋণ নেন। এর মধ্যে ২০১৭ সালের ১৮ মে নেন ৬০ কোটি টাকা। একই বছরের ৩০ আগস্ট নেন ৮৫ কোটি টাকা। এরপর ২০১৯ সালের ১৮ মে নেন ২১৫ কোটি টাকা। ২০২১ সালের ১৫ জুলাই নেন ৩০ কোটি এবং ২০২২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর নেন ৮৫ কোটি টাকা। রফিকুল ইসলাম ঋণ পরিশোধে অনিয়ম করায় বর্তমানে তার কাছে সুদ-আসলে ব্যাংকটির পাওনা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৭২৫ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের ২২ জুলাই ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের বসুন্ধরা শাখা থেকে ২৭০ কোটি টাকা ঋণ নেন তিনি। রফিকুল ইসলাম, ছেলে মেহেদী হাসান দিপু, কাওসার আহমেদ অপু ও ছেলের বউ মালিহা হোসেনের নামে এ ঋণ নেওয়া হয়। এ ছাড়া ইউনিয়ন ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ২০২১ সালের ২৬ আগস্ট ২০০ কোটি টাকা ঋণ নেন রফিকুল ইসলাম। কাওসার আহমেদ অপু ও রফিকুল ইসলামের নামে এ ঋণ নেওয়া হয়।
তিনটি ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের বিপরীতে বন্ধকী সম্পত্তির বিষয়ে অনুসন্ধানে উঠে আসে, রফিকুল ইসলাম জোয়ার সাহারা মৌজায় সিএস ও এসএ ৩২৫৯ নম্বর, আরএস ৯৫৯৫ এবং সিটি জরিপ ৩৮০০৭ নম্বর দাগে ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশ ভূমি ২০১৭ সালের ১৮ এপ্রিল ৩৯৮৪ নম্বর বন্ধকী দলিলে এসআইবিএলের বসুন্ধরা শাখায় বন্ধক রাখেন। জমি বন্ধক দেওয়ার ৮ মাসের ব্যবধানে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ১১৯৩৪ নম্বর সাফ কবলা দলিল মূলে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের কাছে বিক্রি করে দেন।
এদিকে এসআইবিএল থেকে ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট আরও ৮৫ কোটি টাকা ঋণ নেন রফিকুল ইসলাম। এই ঋণের বিপরীতে জোয়ার সাহারা মৌজার সিএস ও এসএ ৩২৮৫, ৩৩৫৯, ৩৩৭০ নম্বর, আরএস ১০০১৭, ১০০১৫, ১০০১৪ নম্বর, সিটি জরিপ-৪৮৮১৭, ৪৮৫৯৪, ৪৮৫৯৫ নম্বর দাগে ৩৮ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ জমির দলিল বন্ধক রাখেন তিনি। কিন্তু ২০২৩ সালের ২২ জুন এসআইবিএলের কাছে বন্ধক রাখা উল্লিখিত জমি ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কাছেও বন্ধক দেন। যার বন্ধকী দলিল নম্বর ৯৫৪৯।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, রফিকুল ইসলাম জালিয়াতি করেছেন তার পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতায়। এর মধ্যে ছেলে কাওসার আহমেদ অপুর মালিকানায় দেখানো ০.৩৬৩০ একর জমি এসআইবিলের বন্ধকী দলিলে ৮৬৭৯-এ বন্ধক ছিল। যার সিএস ও এসএ দাগ ১৯৪৬ ও ১৯২১, আরএস দাগ ৭৫১৪ ও ৭৫১৬, সিটি জরিপ দাগ ১৯১২১ ও ১৯১৩৩। ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট ওই জমি সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে যা বন্ধক দেওয়া হয়। অথচ একটি প্রতিষ্ঠানকে জমির আমমোক্তার বানিয়ে ২০২০ সালের ২৭ ডিসেম্বর মো. জাকির হোসেনের কাছে জমিটি বিক্রি করে দেন।
এ ছাড়া রফিকুলের ছেলে কাওসার আহমেদ অপু নারায়ণগঞ্জের নাওড়া মৌজায় আরএস ১১৪৬, ৩২৭, ৫৬৩৫, ৪৭, ২৪৯ নম্বর দাগে ৬৬ দশমিক ৮০ শতাংশ জমি ২০২০ সালের ১৮ জানুয়ারি তাসফিয়া আহসান জইতার কাছে বিক্রি করেন। জইতার কাছে বিক্রি করা জমি ২০২০ সালের ১১ অক্টোবর ৭৪৭৪ নম্বর সাফ কবলা দলিল মূলে তার পিতা রফিকুল ইসলামের কাছে পুনরায় বিক্রি করে জাল দলিল বানান। এরপর জইতার কাছে বিক্রি করা জমি রফিকুল ইসলামের মালিকানা দেখিয়ে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এওয়াজ বদল করে নতুন জমি নেন। জাল দলিলে পাওয়া এওয়াজ বদলের জমি এসআইবিএল ও ইউনিয়ন ব্যাংক থেকে প্রায় ২৩০ কোটি টাকা ঋণ নেন রফিকুল ইসলাম।
তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৯ সালের ৮ মে ৪৭১৯ নম্বর বন্ধকী দলিলে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক থেকে ২১৫ কোটি টাকা ঋণ নেন রফিক। এই ঋণের বিপরীতে ভাটারা মৌজার ১৯১৩৩, ১৯০২০, ১৯১৩২ নম্বর দাগে ৩৯ দশমিক ৬০ শতাংশ জমি বন্ধক রাখেন তিনি। জমিটি বন্ধক দেওয়ার দুই বছর পর বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানকে আমমোক্তার নিয়োগ দেন।
শুধু ছেলে নয়, প্রতারণার কাজে ছেলের বউদেরও ব্যবহার করেছেন রফিকুল ইসলাম। রূপগঞ্জের নাওড়া মৌজার ১১৭৬১ নম্বর দলিলের শূন্য দশমিক ৬১ একর জমির মালিকানায় ছিলেন রফিকুল ইসলাম। শূন্য দশমিক ৬১ একর জমির মধ্যে ২০১৬ সালের ৩ মার্চ মো. আকবর হোসেনের কাছে ২ লাখ ৯৬ হাজার টাকায় শূন্য দশমিক ১৫ একর বিক্রি করেন রফিক। বাকি ধমমিক ৪৬ একর জমির মধ্যে শূন্য দশমিক ১৫ একর জমি ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তামরিন মুজিবের কাছে বিক্রি করে দেন। দলিলে দেখা যায়, তামরিন মুজিবও ২ লাখ ৯৬ হাজার টাকায় ওই জমি কেনেন। এ ছাড়া ২০১৬ সালের ৫ জানুয়ারি শূন্য দশমিক ১৫ একর জমি কেনেন সাহানা আক্তার খানম। তিনটি পৃথক দলিলে শূন্য দশমিক ৪৫ একর জমির পর রফিকের মালিকানায় মাত্র ছিল ১৬ শতাংশ জমি। কিন্তু রফিক ২০১৭ সালের ১ ফেব্রুয়ারি ছেলের বউ মালিহা হোসেন ও হুমায়রা নুজহাতের কাছে পুনরায় ৬১ শতাংশ জমির পুরোটা বিক্রি দেখিয়ে জাল দলিল করেন। রূপগঞ্জের নাওড়া মৌজার শূন্য দশমিক ৬১ একর জমিটি ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এওয়াজবদল দলিলে জোয়ার সাহারা মৌজার শূন্য দশমিক ৬৩৪ একর জমি পায়।
তথ্য পর্যালোচনায় আরও দেখা যায়, মালিহা হোসেন ও হুমায়রা নুজহাতের কাছে জমি বিক্রির কিছু দিন পর ২০১৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি মালিহা তার স্বামী মেহেদী হাসান দিপুর নামে ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ ও হুমায়রা নুজহাত স্বামী কাওসার আহমেদ অপুর নামে ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ সম্পত্তি হেবা দলিল করেন। তার ছেলের বউরা জাল দলিলের জমিটি তাদের স্বামীদের নামে, অর্থাৎ রফিকুলের দুই ছেলেকে দেওয়ার পর তাদের নামে ৬৩ দশমিক ৪ শতাংশ জমি দেখিয়ে প্রথমে ২০১৯ সালের ৮ মে এসআইবিএলে বন্ধক রাখেন। পরে একই জমি ২০২৩ সালের ২২ জুন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কাছে বন্ধক রাখেন।
এ ছাড়া ভাটারা মৌজার ঢাকা সিটি জরিপ ৩০০৮-এ শূন্য দশমিক ১৫৫৩ একর জমি ছিল রফিকুল ইসলামের; যা ২০২২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তামান্না সুলতানার কাছে বিক্রি করে দেন; যার দলিল নম্বর ২৮০৮। অথচ জমিটি বিক্রির ১৬ মাস পর ২০২৩ সালের ২২ জুন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের কাছে ওই একই জমি বন্ধক দেন রফিকুল ইসলাম, ছেলে মেহেদী হাসান দিপু, কাওছার আহমেদ অপু ও পুত্রবধূ মালিহা হোসেন।
রফিকুল ইসলামের থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ই ব্লকের ৫৫১, ৫৫২, ৫৫৬, ৫৫৭ ও ৫৫৮ প্লট কেনেন মালিক ইমরান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তার আইনজীবী মলয় রায় বলেন, ‘গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর আমরা জানতে পেরেছি রফিকুল ইসলাম আমাদের জমি ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকে বন্ধক দিয়ে ঋণ নিয়েছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আমরা ব্যাংকে চিঠি দিয়েছি। জমির মালিক রফিক নন, আমরা সেটি জানিয়েছি। ব্যাংক কর্র্তৃপক্ষ অতিদ্রুত ব্যবস্থা নেবে আশ্বাস দিয়েছে।’