মৃত্যুর ক্ষতি হাজার কোটি

চলতি বছর ডেঙ্গু রোগী ও মৃত্যু অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মারা গেছে ১ হাজার ৬৬১ জন। তাদের গড় বয়স ৪৫ বছরের মধ্যে। বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক জীবন বর্তমানে ১৫-৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত। সেই হিসাবে মারা যাওয়া এসব মানুষ কমপক্ষে আরও ২০ বছর অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারতেন। কিন্তু অল্প বয়সে মারা যাওয়ায় এখন দেশকে অর্থনৈতিক ক্ষতি গুনতে হচ্ছে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি। মৃত্যু যত বাড়বে এই ক্ষতির পরিমাণ ততই বাড়বে।

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। ইনস্টিটিউট মৃত্যুর সংখ্যা, বয়স ও মাথাপিছু আয় হিসাব করে এমন তথ্য পেয়েছে।

এই ইনস্টিটিউট ডেঙ্গু চিকিৎসায় ব্যক্তির ব্যয় নিয়েও গবেষণা করেছে। তাতে দেখা গেছে, এ বছর সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গিয়ে ব্যক্তির পকেট থেকে ব্যয় হয়েছে জনপ্রতি গড়ে ১৯ হাজার টাকা করে এবং বেসরকারি হাসপাতালে গড়ে ৫০ হাজার টাকা। সে হিসেবে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর পরিবারগুলোর ব্যয় হয়েছে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি হাসপাতালে প্রায় ৪২২ কোটি এবং বেসরকারিতে প্রায় ৪৭৬ কোটি টাকা।

এসব তথ্য জানান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ও গবেষণা দলের প্রধান সৈয়দ আবদুল হামিদ। তিনি জানান, গবেষণায় সরকারি হাসপাতালের মধ্যে রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ঢাকার বাইরে কয়েকটি সরকারি হাসপাতাল এবং বেসরকারি ছয়টি হাসপাতালের প্রায় ২০০ রোগীর খরচের হিসাব নেওয়া হয়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

এই গবেষক বলেন, মৃত্যুর কারণে যে অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে এবং ডেঙ্গু চিকিৎসায় ব্যক্তির পকেট থেকে কী পরিমাণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে, সেটা বোঝাতে এই গবেষণা করা হয়েছে। মৃত্যু রোধ করা গেলে এবং সরকারি হাসপাতালে সব সেবা নিশ্চিত করা গেলে এই অর্থের সাশ্রয় হতো।

ডেঙ্গুতে মৃত্যুর অর্থনৈতিক ক্ষতি নিরূপণ প্রসঙ্গে ইনস্টিটিউটের গবেষণায় পাওয়া হিসাব বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত মারা গেছে ১ হাজার ৬৬১ জন। বর্তমানে দেশে মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৭৬৫ ডলার বা ৩ লাখ ৪ হাজার ১৫০ টাকা (১ ডলার ১১০ টাকা হিসাবে)। যারা মারা গেছেন তারা বেঁচে থাকলে ২০ বছরে আয় করতে পারতেন ১ হাজার ১০ কোটি ৩৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা; অর্থাৎ ডেঙ্গুতে মৃত্যু রোধ করা গেলে এই পরিমাণ অর্থ দেশের অর্থনীতিতে যুক্ত হতো।

অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মারা যাওয়া ব্যক্তিদের প্রায় ৬০ শতাংশের বয়স ৪৫ বছরের মধ্যে। বাকি ৪০ শতাংশের বয়স ৪০ বছরের বেশি। গড় বয়স ৪৫ বছর। সেই হিসাবে আরও ২০ বছর তারা অর্থনীতিতে সক্রিয় থাকতে পারতেন।’

এই গবেষক আরও বলেন, গবেষণায় আরেকটা বিষয় ছিল, যারা ডেঙ্গুতে মারা যাচ্ছে, তাদের জীবনের যে মূল্য, সেটার পরিমাণও যে অনেক বেশি, সেটা দেখানো। জীবনের মূল্য টাকা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। যারা মারা গেছেন, বেঁচে থাকলে তাদের কেউ বড় নেতা হতে পারতেন, বিজ্ঞানী হতে পারতেন, বড় শিল্পপতি হতে পারতেন। সমাজে অনেক অবদান রাখতে পারতেন। কিন্তু মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সে সব সম্ভাবনা শেষ হয়ে গেল।

তিনি বলেন, যে অর্থনৈতিক ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে, সেটা মৃত্যুর সরকারি হিসাব অনুযায়ী। এর বাইরে মৃত্যু আরও বেশি। এ ছাড়া মাথাপিছু যে আয়, সেটাও সবার সমান নয়। সে হিসাবে অর্থনৈতিক ক্ষতি আরও বেশি দাঁড়ায়।

চিকিৎসায় ব্যয় প্রায় ৯০০ কোটি টাকা : গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার সরকারি হাসপাতালে জনপ্রতি রোগীর গড় ব্যয় হয়েছে ২৫ হাজার এবং ঢাকার বাইরে সরকারি হাসপাতালে ১০-১২ হাজার টাকার মধ্যে। সেই হিসাবে সরকারি হাসপাতালে একজন ডেঙ্গু রোগীর গড় ব্যয় ১৯ হাজার টাকা। অন্যদিকে, বেসরকারি হাসপাতালে গড়ে রোগীদের ব্যয় হয়েছে ৫০ হাজার টাকা।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এখন পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু রোগীর ৭০ শতাংশ সরকারি হাসপাতালে এবং বাকি ৩০ শতাংশ বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। সেই হিসাবে ১০ ডিসেম্বর পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৬২ জন। জনপ্রতি ১৯ হাজার টাকা খরচ ধরলে এসব রোগীর পরিবারের পকেট থেকে গেছে ৪২১ কোটি ৯১ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। আর বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে ৯৫ হাজার ১৭০ জন। জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা খরচ ধরলে এসব রোগীর পরিবারের ডেঙ্গুর চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে ৪৭৫ কোটি ৮৫ লাখ  টাকা; অর্থাৎ সরকারি ও বেসরকারি মিলে ব্যয় হয়েছে ৮৯৭ কোটি ৭৬ লাখ ৭৮ হাজার টাকা।

এই খরচের বিষয়ে অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকারি হাসপাতালে রোগীপ্রতি খরচ ১৯ হাজার টাকা। ২০১৯ সালে এই খরচ ছিল ১০ হাজার টাকার মতো। যে জিনিসগুলো হাসপাতাল থেকে পাচ্ছে না, সেগুলো কিনতে হচ্ছে। এটা সেই খরচ। এর মধ্যে আছে রোগীর যাতায়াত, খাওয়া, রোগীর আত্মীয়স্বজনের যাতায়াত ও থাকা-খাওয়া, ওষুধ ও রোগ পরীক্ষা। ২০১৯ সালে রোগীকে গড়ে আট দিনের মতো হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। এবার রোগীর চাপ বেশি থাকায় চার-পাঁচ দিনের মতো থাকতে হয়েছে।

এই গবেষক বলেন, সরকারি চিকিৎসা পেতে গিয়েও যে মানুষের পকেট থেকে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, সেটা বোঝাতেই এই গবেষণা। হাসপাতালে যদি সব পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকত, তা হলে আর রোগীদের বাইরে থেকে কিছু করতে হতো না। স্যালাইন যদি পর্যাপ্ত থাকত, তাহলে আর বাইরে থেকে কিনতে হতো না। কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব মাথায় রেখে সরকারি বাজেট থাকে না। হাসপাতালগুলোকে নিয়মিত বাজেট থেকে চালাতে হয়। ফলে ওষুধসহ যে সেবা, সেখানে ঘাটতি আছে। তখন রোগীদের বাইরে থেকে কিনতে হয়।

বেশ অসুবিধায় রয়েছে মানুষ : গবেষণার বরাত দিয়ে এই গবেষক বলেন, চিকিৎসার এ ব্যয়টা মানুষের পকেট থেকে যাচ্ছে। মানুষের সামর্থ্য বিবেচনায় বেশি যাচ্ছে। ধনীরা যেটা সংকুলান করতে পারে, একজন দরিদ্র মানুষ সেটা পারে না। তাদের পক্ষে হঠাৎ করে এই বাড়তি খরচের জোগান দেওয়া সম্ভব নয়। অনেক সময় তাদের আয়ের শতভাগেরও বেশি চলে যাচ্ছে চিকিৎসায়।

সমাধানে নতুনভাবে ভাবার পরামর্শ : প্রতি বছর মানুষ মারা যাবে, মানুষের অতিরিক্ত ব্যয় হবে, এর কি সমাধান হবে না? এমন প্রশ্ন রেখে তিনি সমাধানের ওপর জোর দেন।

অধ্যাপক হামিদ বলেন, সমাধান আগে একরকম ছিল, এখন নতুনভাবে ভাবতে হবে। কারণ আগে ডেঙ্গু শহরে সীমাবদ্ধ ছিল। মাত্র দু-তিনটি সিটি করপোরেশনে ডেঙ্গুর প্রকোপ ছিল। চলতি বছর গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু বিস্তার রোধ করার সুযোগ আছে কি নেই, তা চিন্তা করতে হবে। কারণ শহরে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। সেখানে ব্যবস্থাপনা আছে। সরকারের নজর বেশি। কিন্তু গ্রামেগঞ্জে কীভাবে নিয়ন্ত্রণ হবে, সেটা চিন্তা করতে হবে।

তিনি বলেন, ডেঙ্গু এখন সারা বছরের রোগ হয়ে গেছে। এ বছর ডিসেম্বরে ডেঙ্গু আছে। কাজেই সে ক্ষেত্রে বছর জুড়ে শহরে যে ব্যবস্থাপনা আছে, সেটা অব্যাহত রাখতে হবে। গ্রামের ক্ষেত্রে কী হবে, সেটা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে আদৌ নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ আছে কি না, নাকি ব্যবস্থাপনা করেই যেতে হবে। তবে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা রাখতে হবে বছর জুড়ে।

এই গবেষক মনে করেন, চিকিৎসার যে সুযোগ-সুবিধা আছে, সেটা ডেঙ্গুর সঙ্গে সমন্বিত নয়। এখন এই রোগের চিকিৎসায় জোর দিতে হবে। পাশাপাশি প্রতিরোধে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিতে হবে।