পাকিস্তানে আবারও আলোচনায় বালুচিস্তান সংকট। বালুচিস্তান প্রদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং জোরপূর্বক গুমের ঘটনার প্রতিবাদে প্রায় মাসব্যাপী লংমার্চ গত বুধবার রাতে দেশের রাজধানী ইসলামাবাদে ঢুকতে চাইলে বাধা দেয় নিরাপত্তা বাহিনী বাধা দেয়। বুধবার রাত থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার দুই শতাধিক বালুচকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন, অধিকার কর্মী ও রাজনৈতিক দল।
বালুচ নারীরা গত ৬ ডিসেম্বর বালুচিস্তানের তুরবাত শহর থেকে লংমার্চ শুরু করে যা ২৬ দিন পর গত বুধবার ইসলামাবাদে এসে পৌঁছায়। লংমার্চের নেতৃত্ব দেওয়া মাহরাং বালুচকে কর্মসূচি থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা জলকামান ও টিয়ারগ্যাস ব্যবহার করে বিক্ষোভ সামলায়। রাতের বেলা বালুচ নারী-পুরষদের পেটাতে পেটাতে গাড়িতে তুলতে দেখা গেছে।
পাকিস্তানের বৃহত্তম প্রদেশ বালুচিস্তানে গুম এবং বিচার বহির্ভূত হত্যার ইতিহাস দীর্ঘদিনের। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাজনীতিক, সাংবাদিক, মানবাধিকার কর্মী ও শিক্ষার্থীরাই এসবের শিকার হন। বালুচ অধ্যুষিত ভূখণ্ডটি এখন প্রধানত ইরান, আফগানিস্তান ও পানিস্তানের বিভক্ত হয়ে পড়েছে। আলাদা জাতিগত পরিচয় থাকলেও ভূখণ্ডের বড় অংশ বালুচিস্তান নানা নাটকীয়তায় পাকিস্তানের অংশ হয়ে যায়। এখানে মূলধারার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের পাশাপাশি নানাভাগে বিভক্ত জাতিগত সশস্ত্র বিদ্রোহীরা তৎপর। পাকিস্তানের ইসলামাবাদ কেন্দ্রিক প্রশাসন এবং সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে বারবার অভিযোগ ওঠে, হত্যা-গুমের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার ওপর ভর করে বালুচিস্তানের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন দমন করতে চায় তারা।
ইসলামাবাদে ‘মার্চ এগেইনস্ট বালুচ জেনোসাইড’-এর প্রবেশ ঠেকাতে রাজধানীর নানা প্রান্তে প্রতিবন্ধক স্থাপন করে নিরাপত্তা বাহিনী। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে স্থাপিত মঞ্চ গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। রাজধানীর রেডজোন ঘিরে নানা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয় যাতে বিক্ষোভকারীরা নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে ঢুকতে না পারে। গ্রেপ্তার হওয়ার আগে মাহরাং বালুচ বলেন, ‘আমরা দুদিন আগে আমাদের প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করি। গুম হওয়া কিংবা নিহত হওয়া হাজার হাজার পুরুষের মা, বোন ও কন্যারা এই বিক্ষোভে সামিল হয়েছে।’
গত ২৯ অক্টোবর পাকিস্তানের সন্ত্রাসবিরোধী সংস্থা ২৪ বছর বয়সী যুবক বালাচ মোলা বকশকে বিস্ফোরক রাখার অভিযোগে তুলে নিয়ে যায়। গত ২৩ নভেম্বর তার জামিন আবেদন জমাদানের আগের দিন পুলিশ জানায়, বালুচিস্তানের শহর তুরবাতে বন্দুকযুদ্ধে ‘নিষিদ্ধ সংগঠনের’ চারজন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে যার মধ্যে বখশও রয়েছে। অবশ্য পরিবারের দাবি, হেফাজতে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে তাকে। ওই ঘটনার পর বালুচরা নতুন করে ফুসে ওঠে।
আয়তনের তুলনায় কম জনসংখ্যাবহুল বালুচিস্তানে গ্যাস, কয়লা, কপার ও স্বর্ণের খনি রয়েছে। কিন্তু বালুচদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় সরকারের বঞ্চনায় বালুচিস্তান দেশের সবচেয়ে দরিদ্র প্রদেশ। অবশ্য বালুচিস্তানের গোয়াদর বন্দর এবং চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের কাশগরকে যুক্ত করে অর্থনৈতিক করিডোর স্থাপনের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে অধিকাংশ বালুচ এসব উদ্যোগ নিয়ে সন্তুষ্ট নয়।
পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশন বালুচদের ওপর চালানো এই আক্রমণের নিন্দা জানিয়েছে এবং গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তি চেয়েছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া শাখা বিক্ষোভকারীদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত বলপ্রয়োগের নিন্দা জানিয়েছে।
সরদার আখতার মেঙ্গালের নেতৃত্বাধীন বালুচিস্তান ন্যাশনাল পার্টি (বিএনপি-এম) উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জরুরি বৈঠক ডেকেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মেঙ্গাল লেখেন, ‘ইসলামাবাদে যা ঘটেছে তাতে পরিষ্কার হয়েছে, রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ বালুচিস্তানের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যুটিকে কীভাবে বিবেচনায় নেয়।’ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) এই ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে।