নদীমাতৃক এ দেশে যুদ্ধে সফলতা পেতে জলপথ কবজা করার কোনো বিকল্প নেই। জালের মতো বিছানো জলপথ এই বঙ্গকে রক্ষা করেছে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে। এই ইতিহাস বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধাদের যেমন জানা ছিল, তেমনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীও জানত। যুদ্ধরত সেনাবাহিনীর রসদ, অস্ত্র, গোলাবারুদ ইত্যাদি স্থলপথের পাশাপাশি জলপথেও পরিবহন করা হতো। গেরিলারা অতর্কিত আক্রমণ করে স্থলপথে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর রসদ পৌঁছানো যখন প্রায় অসম্ভব করে তুলেছিল। তারা তখন আরও বেশি জলপথের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। সে সময় বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কিছু অকুতোভয় নৌ গেরিলা একসঙ্গে চারটি বন্দরে আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৌপথে সহায়তাকারী অংশকে একদম অকেজো করে ফেলে। ফলে রসদহীন, অস্ত্র-গোলাবারুদহীন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আর বেশিদিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে না পেরে যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্থন করতে বাধ্য হয়। যুদ্ধের পটপরিবর্তনকারী এই অপারেশনের নাম অপারেশন জ্যাকপট।
নৌ সেক্টর শুরুর কথা
১৯৬৯ সালে পাকিস্তান দুটি সাবমেরিন কেনে ফ্রান্সের কাছ থেকে। পাকিস্তানের জলসীমায় আনার আগে সেই সাবমেরিনেই ১৯৭০ সালের জানুয়ারিতে শুরু হয় পাকিস্তানি নৌবাহিনীর সেনা সদস্যদের প্রশিক্ষণ। একটি সাবমেরিন আগেই চলে যায়। অপর সাবমেরিন পিএনএস মানগ্রোতে প্রশিক্ষণরত ৫৭ জন নৌসেনার মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাঙালি। রেডিওতে বাঙালির ওপর অতর্কিতে হামলার খবর পেয়ে তারা ঠিক করেন পালিয়ে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেবেন।
সেও এক দুঃসাহসিক অভিযান। পথে পাকিস্তানি সরকার নানা প্রলোভন ও বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলেও ভারতীয় কূটনৈতিক কর্মকর্তাদের দক্ষতা ও বাঙালি নৌসেনাদের দৃঢ় মনোবলের কাছে পরাজিত হয় তাদের সব চেষ্টা। তাদের নিয়েই গড়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের দুর্ধর্ষ সাঁতারু মুক্তিবাহিনী। পরে বাংলাদেশের সমগ্র জলপথকে একটি সেক্টরের আওতায় এনে এর দায়িত্ব দেওয়া হয় নৌ সেক্টরকে।
প্রশিক্ষণ
ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা আটজন বাঙালি নৌসেনাকে নিয়েই মুক্তিবাহিনীর নৌকমান্ডো দল গঠনের পরিকল্পনা করেন ভারতীয় নৌবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক ক্যাপ্টেন মিহির কুমার রায়। এই পরিকল্পনায় ছিল ৬০০ জন বাঙালি তরুণকে নৌকমান্ডো প্রশিক্ষণ দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নৌবন্দর, পোতাশ্রয় এবং নৌপথকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্য অকার্যকর ও অনিরাপদ করে তোলা। ভারতের মুর্শিদাবাদের ভাগীরথী নদীর পূর্ব তীরে পলাশী গ্রামে নৌকমান্ডোদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। শরণার্থী শিবির, মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ক্যাম্প থেকে শারীরিকভাবে সক্ষম এমন যুবকদের বাছাই করে নিয়ে আসেন মিহির কুমার। এরপর শুরু হয় প্রশিক্ষণ। ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। ভোরে বাঁশির শব্দে সাঁতারের পোশাকে মাঠে উপস্থিত হতে হতো। শরীরচর্চা, দৌড় অনুশীলন, নৌকমান্ডোর দায়িত্ব ও কর্তব্য, বিস্ফোরকের ব্যবহার, জাহাজের দুর্বল জায়গা চিহ্নিতকরণ, সাঁতার প্রশিক্ষণ। এ ছাড়া ছিল ক্ষুদ্রাস্ত্র, ফায়ারিং, বিস্ফোরকের ব্যবহারের প্রশিক্ষণ। শেখানো হতো অস্ত্র ছাড়া লড়াইয়ের কৌশল।
দিনের প্রশিক্ষণ শেষে শুরু হতো অন্ধকারে দূরপাল্লার সাঁতারের প্রশিক্ষণ। দুই মাস প্রশিক্ষণের পর শুরু হয় অ্যাডভান্সড প্রশিক্ষণ। মানচিত্র পঠন, লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিতকরণ, শত্রু এলাকায় অনুপ্রবেশ, প্রস্থান, বেঁচে
থাকার পদ্ধতি, ‘লিমপেট মাইন’-এর ব্যবহার ইত্যাদি। ১৯ জুন প্রথম দল সফলতার সঙ্গে নৌকমান্ডো প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করে।
আক্রমণ
অভিযানের জন্য প্রত্যেক নৌকমান্ডোকে একটি লিমপেট মাইন, এক জোড়া অ্যাবি সুইমিং ফিন, একটি চাকু, শুকনা খাবার ও অর্থ। শুধু টিম লিডাররাই জানতেন কখন কীভাবে আক্রমণ করার নির্দেশ আসবে। টিম লিডারদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল নারী কণ্ঠের ‘আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ^শুরবাড়ি’ গানটি বাজার আটচল্লিশ ঘণ্টা পরে চূড়ান্ত আক্রমণ হবে। আর এই গানের চব্বিশ ঘণ্টা পরে যদি পুরুষ কণ্ঠে ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান’ বাজে তাহলে বুঝতে হবে পরিকল্পনা ঠিক আছে। আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী অর্থাৎ চব্বিশ ঘণ্টা পরে হবে চূড়ান্ত আক্রমণ। আর যদি নির্দিষ্ট সময়ে পুরুষ কণ্ঠে এই গান না বাজে তাহলে পরিকল্পনায় রদবদল হয়েছে বুঝতে হবে। ১৩ আগস্ট সকালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে শিল্পী আরতি মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে বেজে ওঠে প্রথম গান ‘আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ^শুরবাড়ি’। টিম লিডাররা শুরু করলেন প্রস্তুতি। লক্ষ্যস্থল রেকি করা ইত্যাদি। পরের গান বাজার কথা ১৪ আগস্ট। কিন্তু সেদিন নির্দিষ্ট গান বাজল না। বাজল ১৫ আগস্ট। শিল্পী পংকজ মল্লিকের ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান’ শোনার সঙ্গে সঙ্গে তারা চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। সবাই অল্প-স্বল্প খাবার খেয়ে নিজ নিজ ফিনস, ডেগার, সুইমিং কস্টিউম, সেফটি ফিউজ জ¦ালানোর জন্য পলিথিনে মুড়ে একটা দেশলাই নিলেন। শরীরে মাখলেন প্রচুর সরিষার তেল।
মধ্যরাতের পর নৌকমান্ডোরা গামছা দিয়ে বুকে মাইন বেঁধে পানিতে নামেন। তারা নিঃশব্দে পাকিস্তানি জাহাজে লিমপেট মাইন বসিয়ে ফিরে আসেন তীরে। আর ভোরের আলোকে আরও আলোকিত করে মাইনের বিস্ফোরণ। জাহাজ এমনভাবে ধ্বংস হয়েছিল যে বন্দরগুলো আর ব্যবহার উপযোগী ছিল না।