তো  মা  দে  র   ব  ই

গবেষকের দৃষ্টিতে লোকঐতিহ্য

আপডেট : ১০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:৫৭ এএম

যেকোনো দেশের শিকড় হিসেবে স্বীকৃত সে দেশের লোক ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। একটি জাতির দর্শন, মানুষের মন ও মনন বুঝতে হলে প্রথমেই যা সুচারু দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করতে হয় তা হলোসে দেশের মাটিঘেঁষা সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতিতেই তাদের হাজার বছরের পথরেখা অঙ্কিত থাকে বলে প্রতিটি আত্মমর্যাদা সম্পন্ন জাতি তাদের উত্তর প্রজন্মকে সে দেশের লোকসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত করে। তুলে ধরে আপন দেশের কৃষ্টিকে।

আমাদের এই ব-দ্বীপও নিজের ঐতিহ্য ও শিল্পে সমৃদ্ধ। এ দেশের মাটি, প্রকৃতি ও আবহাওয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য করে গড়ে তুলেছে নিজের পরিচয় ও ঐতিহ্য। বিশ্বায়নের এই যুগে বৈশ্বিক হতে গিয়ে আমরা ক্রমশ নিজের শিকড়কে ভুলে যেতে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা, তোমাতে বিশ্ব মায়ের আঁচল পাতা।’ বিশ্ব মা বিচ্ছিন্ন কোনো সত্ত্বা নয়। বিশ্ব মা স্বদেশ মায়েরই বর্ধিত সংস্করণ। তাই নিজের দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ভুলে বিশ্ব সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হওয়া আকাশ কুসুম কল্পনামাত্র। তা ছাড়া নিজ দেশের সংস্কৃতি সম্পর্কে না জানলে অন্য দেশের সংস্কৃতি বোঝাও সম্ভব হয় না। সংস্কৃতি গড়ে ওঠে জাতিগত দর্শন ও নৈতিকতার ওপর। সেই সূত্র বুঝতে অক্ষম হলে অন্য দেশের সংস্কৃতি বোঝা ও সম্মান জানানো সম্ভব হয় না। সে জন্য নিজ দেশের সংস্কৃতি, বিশেষ করে মাটিঘেঁষা সংস্কৃতি জানা ও বোঝা অতিগুরুত্বপূর্ণ।

নিজ দেশের লোকসংস্কৃতি বোঝার সবচেয়ে সহজ ও কার্যকরী উপায় হলো, তা যাপন করা। কোনো জনপদের লোকসংস্কৃতি গবেষকের খাতা বা বইয়ের পাতার থেকেও জীবন্ত হয়ে থাকে সেই জনপদের মানুষের জীবনে। তবে গবেষকের খাতা বা বইয়ের পাতা আমাদের সেই জনপদের মানুষের কাছে যেতে সাহায্য করে। বাংলাদেশের লোক ঐতিহ্য তেমন একটি বই। এই সংকলন গ্রন্থে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশের খ্যাতনামা লোক-গবেষকদের মূল্যবান প্রবন্ধ, যা যেকোনো অনুসন্ধিৎসু পাঠককে বাংলাদেশের লোকঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে ও বুঝতে সাহায্য করবে।

এই বইয়ে বর্ণিত হয়েছে লোকসংগীত সম্পর্কে, লোকনাট্য সম্পর্কে, লোকক্রীড়া সম্পর্কে। পুরাণ লোকঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই বইয়ে লোকপুরাণ ও মিশ্রমাধ্যমে সৃষ্ট চিত্র সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে।

লোকসংগীত অংশে যেমন উঠে এসেছে মুসলমান কবিদের শ্রেষ্ঠ অবদান পল্লীগাথা, তেমনি উঠে এসেছে মনসার ভাসান সম্পর্কেও। অনেকেই বাউল গান ও কবিগান একই ধারার মনে করে থাকেন। কিন্তু বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর ও যতীন সরকারের দুটি ভিন্ন প্রবন্ধ উপস্থাপনের মাধ্যমে সম্পাদক জনমানুষের এই ভ্রান্তি দূর করার প্রয়াস পেয়েছেন।

লোকনাট্য সাধারণত জনসাধারণ চিত্ত বিনোদনের জন্য রচিত হলেও এর মাধ্যমে নৈতিকতা ও ঐতিহ্য প্রবাহিত হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। সেই মূল্যবান লোকঐতিহ্যের উপাদান সম্পর্কে মোহাম্মদ সাইদুর রহমানের প্রবন্ধ ‘লোকনাট্য কলা’ প্রবন্ধও যুক্ত হয়েছে বইটিতে। চাঁদ সদাগরের কেচ্ছা, গাজীর পট প্রভৃতি নির্দিষ্ট কাহিনি উপস্থাপন করলেও স্থানভেদে কিছু বৈচিত্র্য দেখা যায়। সে সম্পর্কে গবেষকের দৃষ্টি প্রতিফলিত হয়েছে লোকপুরাণ ও মিশ্রমাধ্যম অংশে।

নিজের দেশের লোকঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে তরুণদের এই বইটি দারুণ সাহায্য করবে তা বলাই বাহুল্য। সম্পাদক সার্থকভাবে লোকঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান সম্পর্কে তুলে ধরেছেন তার সম্পাদিত এ বইয়ে।

সুলতানা রাজিয়া

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত