জ্ঞান, বিজ্ঞান বা দর্শন; সব শাখার জন্যই আজকের পৃথিবী খ্রিস্টপূর্ব ছয়শ শতকের কাছে ঋণী। এ সময়ের কিছু আগে-পরে ভারতে জন্মে ছিলেন বুদ্ধ-মহাবীর, চীনে কনফুসিয়াস-লাওৎস। আর গ্রিসে সাত সাধু : থেলস, সোলন, পেরিয়ান্ডার, ক্লিওবুলাস, চিলো, বাইয়াস ও গিটাকান। তারা ‘সাত বিজ্ঞ জন’ বলে পরিচিত। ‘নিজেকে জানো’ বা ‘জানার বিকল্প কিছু নেই, এসব তাদেরই কথা। হেরোডেটাস জানান, ঈশপের জন্মও এ সময়েই। খ্রিস্টপূর্ব ৬২০-এ।
ঈশপের জীবন নিয়ে নিরেট কোনো তথ্য কারও কাছে নেই। মোটা দাগে বলা হয়, তিনি ছিলেন একজন ক্রীতদাস। মুক্ত হন গল্প বলার অসাধারণ ক্ষমতার জন্য। পরে কাজ করেছেন এক রাজার উপদেষ্টা হিসেবে। তার জীবন সম্পর্কে উল্লেখ আছে মৃত্যুর প্রায় একশ বছর পর হেরোডেটাসের লেখা ইতিবৃত্তে। এই গ্রিক মনীষী জানান, সামোসের ইভাসন নামে এক ব্যক্তির ক্রীতদাস ছিলেন তিনি। মৃত্যু হয় ডেলফিতে। একশ খ্রিস্টাব্দে, তার জন্ম ও জীবন নিয়ে আলোকপাত করেছেন আরেক গ্রিক ইতিহাসবিদ প্লুটার্ক। তিনি ঈশপকে পাচ্ছেন আজকের মরক্কোর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় নগরী লিডিয়ার রাজসভায়।
আরেক মতে, ঈশপ গ্রিসে এসেছিলেন ইজিয়ান দ্বীপ সামোস থেকে, নগরীটি আজকের তুরস্কে। এই সূত্র বলছে, দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে ব্যাবিলন চলে যান তিনি। কারও কারও মতে, ঈশপ পারসিয়ান। খ্রিস্টপূর্ব বারোশ শতকে আজকের তুরস্কে বসতি স্থাপন করা এক বলকান ট্রাইবে তার জন্ম। সে ট্রাইবের লোকেরা কথা বলত ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষায়। তাদের মধ্য থেকে নিয়মিত দাস সরবরাহ করা হতো গ্রিসে। ঈশপ শব্দটি এসেছে ইথিয়প থেকে, প্রাচীন গ্রিসে যা ইথিওপিয়া। নাম ও পশুপাখি নিয়ে গল্প বলার বিষয়টি বিবেচনা করে কেউ আবার বলছেন, ঈশপের জন্ম ইথিওপিয়ায়। সুতরাং গ্রিসে এসেছিলেন আফ্রিকা থেকে।
হেরোডেটাস ছাড়াও তার কথা বলেছেন অ্যারেস্টোফেনিস, জেনোফন, প্লেটো ও অ্যারিস্টোটল। ম্যাক্সিমাস তার বইয়ে ঈশপকে প্রথমে বোবা হিসেবে উপস্থাপন করেন। পরে নাকি দেবতার কৃপায় কথা বলতে শুরু করেন আর নীতিকথা বলার ক্ষমতা পান তিনি। এখানে আরও বলা হচ্ছে, তার নাক বোঁচা, হাঁটেন খুঁড়িয়ে আর হাতও অন্যদের চেয়ে ছোট। এভাবেই ক্রীতদাস ঈশপকে কুরূপে এঁকেছে গ্রিসবাসী।
ফ্রান্সিস বারলোর সংস্করণ জানাচ্ছে : একবার ঈশপকে কেউ একজন জিজ্ঞেস করেন, ‘তুমি কে?’
জবাবে ঈশপ বলেছিলেন : ‘আমি একজন নিগ্রো।’
জন্মস্থান প্রশ্নে জটিলতা আর যেহেতু ঈশপ তার নীতিকথাগুলো লিখে যাননি, বলতেন মুখে মুখে; সে কারণেই মার্টিন লুসারসহ বেশ কজন প-িত তার অস্তিত্বই অস্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, ঈশপ নামে কেউ ছিলেনই না। প্রচলিত লোককথাগুলোই তার নামের সঙ্গে যুক্ত।
প্রাচীন গ্রিসের ইতিহাসবোধের গভীরতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। পাওয়া গেছে সে সময়ের লিখিত ঐতিহ্যের সন্ধানও। প্রাজ্ঞজনদের অধিকাংশের লেখা বই আজ আমাদের হাতে। কিন্তু খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ অব্দের একজন সাধারণ ক্রীতদাসের লিপিজ্ঞান শূন্য হওয়া কি অস্বাভাবিক? এ প্রশ্নও তুলেছেন অনেকে। উদাহরণ হিসেবে সামনে এনেছেন মহাকবি হোমারকে। অন্ধ হোমার ইলিয়াড-অডিসি রচনা করেছেন মুখে মুখে। হাতে লেখা কোনো পান্ডুলিপি নেই। তাই বলে এ কথা তো আর বলা যাবে না যে, এই নামে কেউ ছিলেনই না।
গবেষকদের একটি অংশের দাবি, দাসত্ব থেকে মুক্তি পেলেও গ্রিসের অভিজাত সম্প্রদায় ঈশপকে সহজভাবে নেয়নি। পদে পদে করেছে নির্যাতন। তার পুঁথি থেকে থাকলেও তা নষ্ট করে ফেলা কি অস্বাভাবিক? এ প্রশ্নও তুলেছেন তারা।
শেষে সব বিতর্কের ইতি টানতে বেশিরভাগেরই আস্থা হেরোডেটাসে। ঈশপ বেঁচে ছিলেন খ্রিস্টপূর্ব ছয়শ শতকে। প্রথমে সামোস নগরে ইভাসনের ক্রীতদাস, পরে স্বাধীন হয়ে ক্রিসাসের রাজসভায় বসে শুনিয়েছেন : ‘আমি সামান্য কুকুর। বনে বনে কষ্ট করে খাবার সংগ্রহ করি। কিন্তু প্রভু গৃহে ভালো খাবারের লোভে গলায় শিকল পরতে পারব না।’
ঈশপের নীতিকথা
লিখিত ভাষা আছে কিন্তু ঈশপের নীতিকথা মুদ্রিত নেই এমন দেশ বিশ্বে বিরল। এর বড় কারণ, জীবনের প্রথম পর্যায়ে ক্রীতদাস ঈশপের নীতিকথায় তার ব্যক্তিজীবনের ক্ষোভ-অপমান ও প্রতিবাদ-প্রতিরোধের নানামুখী বয়ান স্পষ্ট হয়ে আছে নানা প্রতীক-রূপকের আড়ালে। তাই উপনিবেশ আক্রান্ত দেশগুলোতে সাম্রাজ্যবাদীদের কাঁধে চেপে ঈশপ এলেও, শোষণ-শাসনের হাতিয়ার তাকে করা যায়নি। উল্টো তার নীতিকথা গেছে ঔপনিবেশিক শক্তির বিপক্ষে। আঙ্গিকের দিক থেকে সহজ-সরল আর সম্পাদনার কবলে পড়তে না হওয়ায় শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বিদগ্ধ জনের পড়ার টেবিলেও ঈশপ জায়গা করে নেন অনায়াসে। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই তার নীতিকথা পাঠ্যসূচির অংশ হিসেবে আজও গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলায় ঈশপকে প্রথম ভাষান্তর করেন ঈশ^রচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনি জানান, রেভারেন্ড টামস জেমসের ইংরেজি থেকে উইলিয়াম গর্ডন ইয়ংয়ের আগ্রহে ঈশপের ৭৪টি নীতিকথার ভাষান্তর করেছেন তিনি।
ছোট প্রাণ বড় কথা
ফেবল হলো প্রায় ছোটগল্প। এতে একটি বিশেষ মোরাল বা নীতিকথা বলা হয়। শিশুশিক্ষার কথা বলা হলেও আদিতে সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্রের সমালোচনাই ছিল এর মূল লক্ষ্য। কারও কারও মতে, ক্ষমতা কাঠামো সমালোচনা সহ্য করে না বলেই ঈশপকে শিশু-কথকে পরিণত করা হয়েছে।
ঈশপ সেকালের শাসকদের নিপীড়ন ও প্রতারণার বিষয়টি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। সে কারণে চুরিসহ নানা হাস্যকর অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন বেশ কয়েকবার। প্রাণে বেঁচেছেন নিজের বিচক্ষণতার জোরে। জীবন-দর্শন নিয়ে সাধারণকে বলা তার নীতিকথা সবসময়ই গেছে শাসকের বিরুদ্ধে। কখনো কখনো ভুল বুঝে বিক্ষুব্ধ হয়েছে সাধারণরাও। তবে তার শব্দ চয়ন ও প্রতীক-রূপকের ব্যবহার এতই কৌশলী ছিল যে, সরাসরি অভিযোগ আনার সুযোগ মিলত না।
অ্যানথ্রোপোমরফিজম মানে মানবিক গুণসম্পন্ন পশুপাখি ঈশপ-কথার মূল সুর। এর মধ্য দিয়েই তিনি তার সময়ের নানা অনিয়ম, অনাচারের প্রতিবাদ করেছেন। কুকুর ও তার ছায়া গল্পে দেখা যায়, কুকুরটি এক টুকরা মাংস মুখে নিয়ে পুল পার হচ্ছে। তখন নিচে পানিতে তার ছায়া দেখে ভাবে সেখানেও মুখে মাংস আরেকটি কুকুর আছে, তাকে ভয় দেখিয়ে সেই মাংসের টুকরোটি ছিনিয়ে নিতে যেই সে মুখ খোলে অমনি পানিতে পড়ে যায় তার নিজের মাংস খ-টি। এই গল্পের বার্তা : বেশি লোভে সবই হারাতে হয়। একই কথা গোয়ালিনীর গল্পে। দুধের পাত্র মাথায় নিয়ে পথ চলতে চলতে মেয়েটি ডুবে যায় দিবাস্বপ্নে। ভাবে, এই দুধ বেচে কেনা যাবে শ-তেনেক ডিম, তা থেকে হবে অন্তত আড়াইশ মুরগির ছানা। তা বেচে কেনা যাবে একটি সবুজ গাউন, তা পরে যাব নববর্ষের মেলায়, সেখানে গিয়ে নাচের কথা মনে হতেই মাথা দুলে উঠে তার, আর তখনই পড়ে যায় দুধের পাত্রটি। মিথ্যাবাদী রাখালের গল্পে কিশোর ছেলেটি প্রতিদিনই বাঘ বাঘ করে পাড়া মাথায় তোলে আর সবাই ছুটে এসে দেখে সেখানে বাঘটাগ কিছু নেই। ছেলেটি মজা করে হাসে। একদিন সত্যি সত্যিই বাঘ এলো, ছেলেটিও চেঁচাল কিন্তু কেউ সাড়া দিল না। বারবার মিথ্যা বললে গ্রহণযোগ্যতা নষ্ট হয়। বিপদে কাউকেই পাশে পাওয়া যায় না, এই তার বার্তা। আর ক্ষুধায় কাতর শেয়ালের মগডালে থাকার আঙুর খাওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা বিফলে যাওয়া থেকে আমরা পেয়েছি আঙুর ফল টকের মতো বাগধারা।
বাতাসের আগে ছোটে এমন খরগোশের সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতায় কচ্ছপ। বাঁশি বাজতেই এক ছুটে চোখের আড়ালে খরগোশ আর কচ্ছপ তখন শুরুর রেখা সবে ছেড়েছে। খরগোশ ভাবল, এবার তবে একটু জিরিয়ে নিই। তারপর যখন ঘুম ভেঙেছে দেখে কচ্ছপ জয়ের দ্বারপ্রান্তে। এ গল্পটি নিয়ে স্পেকটেটর পত্রিকায় আলোচনা করেছেন পিটার জোন্স। এতে ধনী ও ক্ষমতাবানের বিপক্ষে তিনি দাঁড় করিয়েছেন দুর্বল ও দরিদ্রকে। বলতে চেয়েছেন : সংকল্পে অটল থাকলে দুর্বলের জয় হবেই।
আর এসব কারণেই অভিজাত-ক্ষমতাবানেরা পছন্দ করেনি ঈশপকে। তাই হয়তো প্রায় সব জীবনীকারের রচনায়ই ঈশপকে দেখা যায় কদাকার রূপে। মিলেছে বিকলাঙ্গ, বাক-প্রতিবন্ধিত্বের অপবাদ। এমনকি রোমের ভিলা আলবানিতে বসানো মার্বেল পাথরের মূর্তিতেও সুরূপে খচিত নন ঈশপ।
ঈশপের মৃত্যু
ঈশপের সময়ে গোটা গ্রিসে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, বিচারহীনতা, অভিজাতদের নিপীড়ন আর মোট জনসংখ্যার বড় অংশেরই নেই কোনো রাজনৈতিক অধিকার। নানামুখী সংশয়-শঙ্কায় টালমাটাল গোটা দেশ। সময়ের চাহিদায়ই তখন ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠে ঈশপের নীতিকথা। নড়েচড়ে বসেন অভিজাত ও শাসকরা। তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকবার আনা হয় চুরি, ধর্ম ও রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ।
তার গল্প জুড়ে আছে শোষণ, পীড়ন, অত্যাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের প্রতিবাদ।
১৬৮৭ সালে প্রকাশিত ‘ঈশপ ফেবলস, উইথ হিজ লাইফ ইন ইংলিশ, ফ্রেঞ্চ অ্যান্ড ল্যাটিন’ গ্রন্থে ঈশপের জীবনের একত্রিশটি অধ্যায়ের ছবি এঁকেছেন বারলো। সেখানে তাকে চারবার চার অপরাধে অভিযুক্ত হতে দেখা যায়।
খ্রিস্টীয় তেরো শতকে লেখা ম্যাক্সিমাস প্লানুডেসের ‘লাইফ অব ঈশপ’ বইয়ের আলোকে বারলো জানাচ্ছেন, ঈশপ তখন বোবা। নীতিকথা বলতে শুরু করেননি। তখনই প্রথম পড়েন জনরোষের মুখে। তার থলেতে ডুমুর রেখে, আনা হয় চুরির অভিযোগ। এ দফায় সেই ডুমুর ফেলে দিয়ে বেঁচে যান সাজা ভোগের হাত থেকে। পরে সহকর্মীদের হাতে সে ফল পৌঁছায় মুনিবের কাছে। আর ভেদবমি করে ধরা পড়ে প্রকৃত দোষী।
দ্বিতীয়বার ঈশপের পথরোধ করেন এক নগরপাল। জানতে চান কোথায় যাচ্ছেন তিনি। ঈশপ জবাব দেন : ‘কোথায় যাচ্ছি জানি না।’ এ উত্তরে বিরক্ত হয়ে তাকে জেলে পাঠানোর আদেশ দেন সেই নগরপাল। যখন তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, ঈশপ তখন তাকে উদ্দেশ করে চেঁচিয়ে বলেন : ‘এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, আমি সত্য কথাই বলেছি। তখন কি আমি জানতাম, আমাকে জেলে পোরা হবে!’ এতে বিস্মিত হয়ে সে দফায় তাকে মুক্তি দেন সেই নগরপাল।
তৃতীয় ঘটনা ব্যাবিলনে। সেখানে হেলিয়াস নামে এক তরুণকে দত্তক নেন ঈশপ। অকৃতজ্ঞ সে ছেলেই করে তার প্রাণনাশের ষড়যন্ত্র। নানান বানোয়াট অভিযোগে একের পর এক নালিশি চিঠি দিতে থাকে বিচারালয়ে। শেষে বিচারে দোষী সাব্যস্ত হন ঈশপ, দেওয়া হয় মৃত্যুদ-। এ সময়ই হঠাৎ করে সৃষ্টি হয় এক জটিল পরিস্থিতির। ঈশপকে জরুরি দরকার হয়ে পড়ে পারস্য রাজ লাইকারজাসের। তিনি মারা গেছেন জেনে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন রাজা। তখন কেউ একজন জানায় তখনো দ- কার্যকর হয়নি। সঙ্গে সঙ্গে ঈশপকে তার সামনে হাজির করার আদেশ দেন লাইকারজেস। ঈশপ আসেন এবং যথারীতি সমস্যার সমাধান বাতলে দেন। তারপর সেখানেই থাকা হেলিয়াসকে উদ্দেশ করে একের পর এক বলে যান নীতিকথা। বলেন : সতর্ক নাগরিক হও। মনে রেখো, লেজ নেড়ে কুকুর হয়তো কিছু খাবার আদায় করতে পারে, কিন্তু ঘেউ ঘেউ করলে মেলে শুধু বেত্রাঘাত। অনুশোচনায় হেলিয়াস খাওয়া বন্ধ করে দেয়। কিছুদিন পর মৃত্যু হয় তার।
কিন্তু চতুর্থ দফায় জীবন দিতে হয় ঈশপকে। প্লানুডেস জানান, বুদ্ধিমত্তার কারণেই বড়মাপের কিছু কাজের দায়িত্ব পেয়েছিলেন ঈশপ। লিডিয়ার ক্রোসাস, ব্যাবিলনের লাইকারজাস ও মিসরের রাজা নেকটানাকের বেশ কিছু সমস্যার সমাধান দিয়েছিলেন তিনি। স্বীকৃতি হিসেবে ক্রোসাসের কাছ থেকে সংবর্ধনা পান বলে জানান বারলো।
সেবার বিশেষ এক কাজের দায়িত্ব নিয়ে ব্যাবিলন থেকে যাচ্ছিলেন গ্রিস।
যাত্রাপথে ডেলফিতে এসে পড়েন প্রতিহিংসার মুখে। তার বিরুদ্ধে আনা হয় লোভও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের অভিযোগ। জবাবে তার ক্ষুরধার নীতিকথাগুলো অপদস্ত করে নগররক্ষকদের। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ঈশপকে হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু করেন তারা। তার ব্যাগে গুঁজে দেওয়া হয় একটি স্বর্ণের কাপ। তারপর তল্লাশির নামে বের করে আনা হয় সেই কাপটি। বলা হয়, সেটি চুরি করা হয়েছে অ্যাপোলোর মন্দির থেকে। এবার শুধু চুরি নয়, সঙ্গে ধর্মদ্রোহিতার অভিযোগ ঈশপের বিরুদ্ধে। নানা যুক্তিতে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা করেন তিনি। কিন্তু এবার, ফেবলের পরাজয় হয়। বিচারক তাকে ডেলফির পাহাড় চূড়া থেকে ফেলে মৃত্যুদ- কার্যকরের আদেশ দেন।
এবার ডেলফির অভিজাত নাগরিকরা ঈশপকে নিয়ে চলল পাহাড়ের শিখরে। দুদিকে দুই চূড়ার মধ্যখানে গভীর গহ্বর। দুই টুকরো লম্বা কাঠ রাখা হলো দুই চূড়া বরাবর। তারপর সেটির ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে বলা হলো ঈশপকে। মাঝামাঝি পৌঁছলে সরিয়ে নেওয়া হয় কাঠের টুকরো দুটি। নিঃশব্দে শৈলগিরিময় সেই খাদে হারিয়ে যান এই গ্রিক মনীষী।
মৃত্যুর আগে ঈশপ নাকি বলেছিলেন : ‘তোমরা আমাকে হত্যা করতে পারো, কিন্তু মনে রেখো; এই অবিচারের মাসুল কড়ায়-গ-ায় দিতে হবে।’ তার মৃত্যুর পর অ্যাপলোর মন্দিরের দৈববাণীতে ডেলফিতে নেমে আসে দুর্ভিক্ষ, হানাহানিতে ক্ষতবিক্ষত হয় বাসিন্দারা।
লেখক : কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও সাংবাদিক