ভোটের ডামাডোলে বইয়ের মানে ছাড়

প্রতিবছর বই উৎসবের মাধ্যমে বছরের প্রথম দিন প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে তুলে দেওয়া হয় নতুন পাঠ্যবই। আগামী ৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কারণে বছরের প্রথম দিন বই উৎসব নিয়ে কিছুটা সন্দেহ তৈরি হলেও তা কেটে গেছে। জানুয়ারির প্রথম দিনই বই পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

তবে নির্বাচনী বছর ও নতুন শিক্ষাক্রমের ডামাডোলে নতুন বইয়ের মান নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নিম্নমানের কাগজে ছাপা এসব বই শিক্ষার্থীদের সারা বছর পড়াটা কষ্টকর হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) সূত্র জানায়, ইতিমধ্যে প্রাথমিকের প্রায় শতভাগ বই ছাপা হয়েছে। মাধ্যমিকেরও ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির বই ছাপা শেষের পথে। তবে অষ্টম ও নবম শ্রেণির বই নিয়ে সমস্যা রয়েছে। এই দুই শ্রেণির অর্ধেক বই এখনো ছাপা সম্ভব হয়নি। এরপরও আগামী ১ জানুয়ারি প্রাথমিকের বই উৎসব রাজধানীর ন্যাশনাল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে। অন্যদিকে মাধ্যমিকের বই উৎসব ঢাকার বাইরে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার একটি স্কুলে করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বছর শেষ হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এ সময়ের মধ্যে কোনোভাবেই অষ্টম ও নবম শ্রেণির শতভাগ বইয়ের কাজ শেষ করা সম্ভব নয়। এবার অষ্টম শ্রেণিতে মোট বইয়ের সংখ্যা ৫ কোটি ৩৪ লাখ ৮৪ হাজার ২৭১টি এবং নবম শ্রেণিতে ৫ কোটি ৬ লাখ ৮৪ হাজার ৫৭৩টি।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. ফরহাদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত প্রায় শতভাগ বইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। তবে অষ্টম ও নবম শ্রেণির বইয়ের পা-ুলিপি দিতে দেরি হওয়ায় তা কিছুটা পিছিয়ে আছে। আমাদের প্রেসগুলোর সক্ষমতা অনেক। আর এখন যেহেতু শুধু অষ্টম ও নবম শ্রেণির বইয়ের কাজ হবে, তাই দ্রুতগতিতে কাজ এগিয়ে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি এটা নিশ্চিত করতে পারি, প্রত্যেক উপজেলায় বই পৌঁছাবে। তবে বছরের প্রথম দিন কোনো কোনো জায়গায় অষ্টম শ্রেণির দু-একটা বই বাকি থাকতে পারে।’

চলতি শিক্ষাবর্ষে প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হয়েছে। আগামী বছর দ্বিতীয়, তৃতীয়, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হবে। নতুন শিক্ষাক্রম নিয়ে নানা আলোচনা-সমালোচনার মুখে আগামী বছরের পা-ুলিপি চূড়ান্ত করতে অনেকটাই বেগ পেতে হয় এনসিটিবিকে। অষ্টম ও নবম শ্রেণির তিনটি করে ছয়টি বইয়ের পান্ডুলিপি চূড়ান্ত করতেই গলদঘর্ম হতে হয়। এগুলো হলো ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান, বিজ্ঞান অনুশীলন বই এবং বিজ্ঞান অনুসন্ধানী পাঠ। একাধিকবার চলে এসব বইয়ের পান্ডুলিপির যাচাই-বাছাই। বছর শেষ হওয়ার মাত্র ১৫ দিন আগে সর্বশেষ এই দুই শ্রেণির তিনটি বইয়ের পা-ুলিপি চূড়ান্ত করে প্রেসে পাঠানো হয়।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, একদিকে পা-ুলিপি চূড়ান্ত করতে দেরি, অন্যদিকে আগামী ৭ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন, এ সময় যাতে কোনোভাবেই ছাপার কাজ ব্যাহত না হয় সেদিকে লক্ষ রাখতে হচ্ছে এনসিটিবিকে। ফলে নির্বাচনী বছরে নতুন শিক্ষাক্রমের ডামাডোলে পাঠ্যবইয়ের মানে অলিখিতভাবে অনেকটাই ছাড় দেওয়া হয়েছে। এতে নিম্নমানের কাগজে ছাপা হচ্ছে পাঠ্যবই।

সূত্র জানায়, পাঠ্যবইয়ের কাজের ক্ষেত্রে এনসিটিবি গুটিকয়েক প্রেস মালিকের কাছে অনেকটাই জিম্মি হয়ে পড়েছে। কারণ কিছু প্রেস মালিক সিন্ডিকেট করে প্রাক্কলিত দরপত্রের চেয়ে অনেক কম দামে টেন্ডার জমা দেয় এবং তারাই কাজ পায়। ফলে ৮০ জিএসএমের কাগজে বই ছাপার কথা থাকলেও বেশিরভাগই মূলত নিউজপ্রিন্টে ছাপছেন। তবে এনসিটিবি বা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন দল প্রেসে গেলে ভালো কাগজে ছাপছেন। তারা চলে এলে আবার নিউজপ্রিন্টে ছাপছেন। আর বড় প্রেসগুলোকে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপতে দেখে ছোট প্রেসগুলোও দেদার নিউজপ্রিন্টে কম ব্রাইটনেসের কাগজে বই ছাপছেন। এমনকি রিসাইক্লিং কালি ব্যবহার করায় ছাপাও ঝাপসা হচ্ছে, যা শিক্ষার্থীদের চোখের জন্যও ক্ষতিকর বলে মনে করছেন অভিভাবকরা। এমনকি এতই পচা কাগজে বই ছাপা হচ্ছে যে, সম্প্রতি এনসিটিবি বেশকিছু বই ফেরত পাঠিয়ে তা পুনরায় ছাপতেও বাধ্য করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এনসিটিবি কর্তৃক নিয়োগকৃত ইন্সপেকশন এজেন্টদের সঙ্গে যোগসাজশে প্রেস মালিকরা নিম্নমানের বই মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিচ্ছেন। প্রতিবছর সাংবাদিকরা প্রেসে পরিদর্শনে যেতে পারলেও এ বছর তাতেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া আছে। ফলে যেনতেন কাগজে বই ছাপার সুযোগ আগের চেয়ে বেড়েছে। উপরন্তু প্রেস মালিকদের কেউ কেউ বলে বেড়াচ্ছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ আছে। ফলে তারা যে কাগজেই বই ছাপেন না কেন, কোনো সমস্যা হবে না।

বাংলাদেশ মুদ্রণশিল্প সমিতির সাবেক সভাপতি তোফায়েল খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার ভালো কাগজে বই ছাপতে বাজারদর অনুযায়ী টাকা দিয়েছে। কিন্তু একটি সিন্ডিকেট সব কাজ হাতিয়ে নিতে কম দামে দরপত্র দিয়েছে। তারা এখন অতিরিক্ত লাভ করতে অনেককে ম্যানেজ করে নিম্নমানের কাগজে বই ছাপছেন। আমার মনে হয়, এ বছরের বই হবে এ যাবৎকালের সবচেয়ে নিম্নমানের। যে বই ছয় মাসও পড়তে পারবে না শিক্ষার্থীরা।’

২০২৪ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক, ইবতেদায়ি ও মাধ্যমিক স্তরের ৩ কোটি ৮১ লাখ ২৭ হাজার ৬৩০ শিক্ষার্থীর মধ্যে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ছাপা হচ্ছে ৩০ কোটি ৭০ লাখ ৮৩ হাজার ৫১৭ কপি। এজন্য সরকারের প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। প্রাথমিক স্তরে ৯ কোটি ৩৮ লাখ এবং মাধ্যমিক স্তরের বইয়ের সংখ্যা ১৮ কোটি ৬১ লাখ ১ হাজার ২০৬টি। এ ছাড়া ইবতেদায়ির জন্য ২ কোটি ৭১ লাখ ৭৩ হাজার ১৩৫টি বই ছাপা হচ্ছে। নতুন শিক্ষাক্রম অনুসারে মাধ্যমিকে একজন শিক্ষার্থী ১০টি করে বই পাবে। এর ফলে গতবারের চেয়ে এবার দুই কোটির বেশি বই কম ছাপানো হচ্ছে।