মালয়েশিয়া ও চীনকে কেন বেছে নিলেন প্রধানমন্ত্রী

দুই দেশ সফরে আজ ঢাকা ছাড়ছেন

আপডেট : ২১ জুন ২০২৬, ০২:১৫ এএম

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীনে রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য আজ রবিবার বিকেলে ঢাকা ত্যাগ করবেন। সরকারপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটাই তার প্রথম বিদেশ সফর। এ কারণে দেশের ভেতরে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সফরটি নিয়ে বেশ আগ্রহ আছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিবেশী ভারত, আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান, ভুটান, মালদ্বীপ, শ্রীলংকা এবং পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে চীন ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ তারেক রহমানকে সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। প্রথম সফরে মালয়েশিয়া ও চীন যাবেন, এ বিষয়টি নিশ্চিত হয়ে যাওয়ার পর পর্যবেক্ষকদের আগ্রহের ফোকাসে কিছুটা পরিবর্তন আসে। অনেকে খোঁজ নিতে শুরু করেন তিনি কেন শুরুতে মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নিলেন? কেন তিনি পাশের প্রভাবশালী দেশ ভারত গেলেন না?

আগ্রহের আরেকটি দিক হলো চীনের শীর্ষনেতাদের সঙ্গে তার আলোচনায় কী কী বিষয় আসতে পারে। আঞ্চলিক ও বৈশি^ক তাৎপর্য আছে, এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে বাংলাদেশ এবারকার চীন সফরে কোনো আনুষ্ঠানিক অঙ্গীকার করবে কি না, সেসব বিষয়ে দেশের কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও বিদেশের কূটনীতিকরা খোঁজখবর নিতে শুরু করেছেন। এ ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সামরিক ক্ষেত্রে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও ভারত বেশ সক্রিয়।

ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও সুইডেনের রাষ্ট্রদূতরা এবং যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার গতকাল শনিবার আলাদাভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসব সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে বেরিয়ে যাওয়ার সময় ‘কী আলাপ হয়েছে’ সাংবাদিকরা জানতে চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রাইস্টেনসন বিশ্বকাপ ফুটবলের প্রসঙ্গ টেনে কূটনৈতিক পন্থায় জবাব দেন। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রাখলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ঝুঁকি নাও থাকতে পারে, এমন ইঙ্গিত দিয়ে তিনি বলেন, ‘একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কারণে আমি এখানে এসেছি। গত রাতে বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র দারুণ এক জয় পেয়েছে এবং (আমরা) পরবর্তী পর্বে চলে গেছি। সুতরাং, আমি এখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও বাংলাদেশের জনগণকে উৎসাহিত করতে এসেছি, যাতে সামনের দিনে বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করেন। কেননা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর বাজি ধরার ক্ষেত্রে তোমরা  মোটেই ভুল করতে পারো না।’

প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ জাপানের কূটনীতিকরা আলাদাভাবে বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ করে প্রধানমন্ত্রীর সফরের বিষয়ে খোঁজ নিয়েছেন। তবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ‘কী আলাপ হয়েছে’ প্রশ্ন করা হলে জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচি স্পষ্টতই সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, ‘নিয়মিত দ্বিপক্ষীয় বিষয়ে কথা হয়েছে।’

গণঅভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ায় তারেক রহমান প্রথম কোন দেশে যাবেন, সে বিষয়ে আগ্রহ দেখা দেয়। 

প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফরে চীন যাওয়া নিয়ে দেশ-বিদেশে আগ্রহ থাকার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তার পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা হুমাইউন কবির সাংবাদিকদের বলেন, ‘বাংলাদেশের স্বার্থে আমাদের যখন যেখানে যাওয়া প্রয়োজন, সেখানেই যাব। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্রে যাব, প্রয়োজনে চীনেও যাব। ভারতের সঙ্গে পরিবেশ অনুকূল হলে ভারতও যাব।’

বর্তমান সরকারকে জনগণের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত হিসেবে উল্লেখ করে উপদেষ্টা বলেন, ‘আমরা কোথায় যাব, সেটা অন্য কেউ নির্ধারণ করবে না। আমাদের কাউকে খুশি করার জন্য নাচতে হবে না।’

বাংলাদেশ বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ সব ক্ষেত্রে ভারসাম্য রেখে এগোচ্ছে, এমনটি উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে জনগণের বিশাল ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসায় সরকার শক্ত অবস্থান থেকে কথা বলতে পারে, দরকষাকষি করতে পারে। উপদেষ্টা বলেন, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সরকার বাংলাদেশের জন্য প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করতে চায়। এ ক্ষেত্রে সরকার সব অংশীজনের সঙ্গে অর্থবহভাবে যুক্ত হবে।  

কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে আজ ঢাকা ত্যাগ : মালয়েশিয়া ও চীনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের বিষয়টি পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম গতকাল শনিবার এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জানান। মালয়েশিয়ার পথে প্রধানমন্ত্রী আজ রবিবার বিকেলে ঢাকা ত্যাগ করবেন। দুই দেশ সফরেই তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান সফরসঙ্গী হচ্ছেন।

আগামীকাল সোমবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে তারেক রহমানের আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এ বৈঠকে বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া আবার চালু করা, দক্ষ কর্মী নেওয়া, বাণিজ্য, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, জ¦ালানি সহযোগিতা, সেমি-কন্ডাক্টর শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, আসিয়ানে বাংলাদেশের যোগদান এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সহায়তাসহ বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসবে।

বৈঠকের পর দুই দেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সহযোগিতার বিষয়ে একটিসহ একাধিক সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। দুই প্রধানমন্ত্রী একটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখবেন।

চীন যাত্রা : আগামীকাল সোমবার বিকেলে কুয়ালালামপুর ত্যাগ করে সন্ধ্যায় তারেক রহমান চীনের বন্দরনগর দালিয়ান পৌঁছাবেন। সেখানে আগামী মঙ্গলবার বিশ্বঅর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউএফ) প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করবেন। ডব্লিউএফ-এর বার্ষিক সভা সামার দাভোসে অংশগ্রহণকারী কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষনেতাদের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ডব্লিউএফ আয়োজিত জলবায়ু বিষয়ক একটি অধিবেশনে তারেক রহমান প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেবেন। আগামী বুধবার সকালে প্রধানমন্ত্রী সামার দাভোসের বার্ষিক সভার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। তিনি সেদিন দুপুরে ট্রেনে দালিয়ান থেকে বেইজিং যাবেন।

বেইজিংয়ে কর্মসূচি : চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক কমিটির প্রধান ও  দেশটির এক্সিম ব্যাংকের প্রধান আগামী বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) আয়োজিত একটি বিনিয়োগ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেবেন এবং চীনের প্রভাবশালী উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানাবেন।

চীনে শীর্ষ বৈঠক ও স্মারক সই : তারেক রহমান আগামী বৃহস্পতিবার বিকেলে  বেইজিংয়ে গ্রেট হলে দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় এবং ভবিষ্যতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে তারা বিস্তারিত আলোচনা করবেন। বৈঠকের পর উভয়পক্ষের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার বিষয়ে ১৫ থেকে ১৭টি স্মারক ও চুক্তি স্বাক্ষর হতে পারে। এ তালিকায় ১৩টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি, একটি কর্মপরিকল্পনা ও একটি প্রটোকল রয়েছে। তারেক রহমান চীনের প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত একটি রাষ্ট্রীয় ভোজসভায় অংশ নেবেন।

আগামী ২৬ জুন শুক্রবার চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্ট্যান্ডিং কমিটির চেয়ারম্যানের সঙ্গে তারেক রহমান সাক্ষাৎ করবেন। এরপর তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। তাদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও বৈশি^ক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।

তিস্তাসহ সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা : বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও যমুনা-ব্রহ্মপুত্রের উজানে ইয়ার্লুং সাংপো নদীতে বৃহদাকার বাঁধ নির্মাণে চীনের পরিকল্পনার বিষয়গুলো বাংলাদেশ তুলবে কি-না, দেশ রূপান্তরের এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেন, সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনার বৃহত্তর কাঠামো নিয়ে আলোচনার সময় তিস্তাসহ অন্যান্য নদীর প্রসঙ্গগুলো আসবে।

সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চীনে প্রধানমন্ত্রীর সফরের মূল বিষয় হচ্ছে বিনিয়োগ আকর্ষণ। এর বাইরে বাংলাদেশে বড় কয়েকটি অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য চীনের কাছে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার অর্থ সহায়তা চাওয়া হতে পারে।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, মালয়েশিয়া ও চীন উভয় দেশের সঙ্গে আলোচনায় আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব (আরসিইপি) ব্যবস্থায় বাংলাদেশের যোগ দেওয়ার  ক্ষেত্রে সমর্থন চাওয়া হবে।

চীন প্রস্তাব দিলে দেশটির বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (জিডিআই-গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ) ও বৈশি^ক নিরাপত্তা উদ্যোগসহ (জিএসআই-গ্লোবাল সিকিউরিটি ইনিশিয়েটিভ) বিভিন্ন কর্মসূচির বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান কী হতে পারে, এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্র সচিব বলেন, এ বিষয়গুলো বিবেচনাধীন আছে। আলোচনা করে এসব বিষয়ে যথাসময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

সফরসঙ্গী : মালয়েশিয়ায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীসহ মোট ২৭ জন থাকবেন।

চীনগামী প্রতিনিধিদলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ মোট ২৮ জন থাকবেন।

এ বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমাইউন কবির বলেন, প্রধানমন্ত্রী যাকে যেখানে সফরে প্রয়োজন, তাকে সে সফরে যুক্ত করার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। 

প্রধানমন্ত্রী আগামী শুক্রবার বিকেলে বেইজিং থেকে ঢাকা রওনা হবেন।   

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত