নিপাহর মারাত্মক ঝুঁকিতে দেশ

দেশে ২০০১ সালে প্রথমবারের মতো শুধু মেহেরপুর জেলায় নিপাহ ভাইরাস শনাক্ত হয়। সে বছর আক্রান্ত ১৩ রোগীর মধ্যে ৯ জনই মারা যায়। এর পরের বছর দেশের কোথাও রোগটির সংক্রমণ ধরা পড়েনি। কিন্তু তারপর থেকেই ধীরে ধীরে রোগটি ছড়িয়ে পড়তে থাকে দেশের নতুন নতুন জেলায়।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) তথ্য অনুযায়ী, গত ২৩ বছরে দেশের ৩৪ জেলায় রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে একের অধিকবার সংক্রমণ দেখা গেছে ২০ জেলায়। বিশেষ করে রাজশাহী ও ফরিদপুর অঞ্চলকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এ বছর যে ১৪ জন রোগী মারা গেছে, তাদের মধ্যে ১০ জনই রাজশাহী অঞ্চলের। বাকি ৪ জন ফরিদপুর অঞ্চলের।

এ বছরের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আইইডিসিআরের বিজ্ঞানীরা বলেন, দেশের সাত জেলায় ১৪ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। প্রথমবারের মতো নরসিংদী জেলায় সংক্রমণ ঘটেছে। এটি নতুন করে শঙ্কার কারণ। এতদিন শুধু উত্তরাঞ্চলে ঘটছে ধারণা করা হলেও এখন তা মধ্য অঞ্চলে পাওয়া গেছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এ রোগের মৃত্যুহার অনেক বেশি। দেশে ২০০১ সালে প্রথম নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটে। এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ৩৩৯ ও মারা গেছে ২৪০ জন। অর্থাৎ মৃত্যুহার ৭১ শতাংশ। সুতরাং কোনোভাবেই এ রোগের প্রধান ও একমাত্র উৎস খেজুরের কাঁচা রস খাওয়া যাবে না। তবে রস জ্বাল দিয়ে খেলে বা গুড় খেলে কোনো ক্ষতি নেই।

এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের জুনোটিক ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রামের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. শ. ম. গোলাম কায়ছার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিপাহ একটি ভাইরাসজনিত মারাত্মক প্রাণঘাতী রোগ। সাধারণত শীতকালে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। কাঁচা খেজুরের রসে বাদুড়ের বিষ্ঠা বা লালা মিশ্রিত হয় এবং ওই বিষ্ঠা বা লালাতে নিপাহ ভাইরাসের জীবাণু থাকে। ফলে খেজুরের কাঁচা রস পান করলে মানুষ নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হতে পারে। তাই কোনোভাবেই খেজুরের কাঁচা রস খাওয়া যাবে না।

একের অধিকবার সংক্রমণ ২০ জেলায় : আইইডিসিআরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সংক্রমিত ৩৪ জেলার মধ্যে একের অধিকবার সংক্রমণ দেখা গেছে ২০ জেলায়। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ বছর সংক্রমণ দেখা গেছে ফরিদপুর জেলায়। এরপর নওগাঁয় নয় বছর, সাত বছর করে গোপালগঞ্জ ও নাটোরে, ছয় বছর রাজশাহীতে, পাঁচ বছর রংপুর, চার বছর করে দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, মানিকগঞ্জ ও নীলফামারী, তিন বছর কুড়িগ্রাম, মাদারীপুর, মাগুরা ও পাবনা এবং দুই বছর করে সংক্রমণ দেখা গেছে বগুড়া, ঝিনাইদহ, জয়পুরহাট, লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁও জেলায়।

১২ জেলায় একবার করে সংক্রমণ ঘটেছে। এসব জেলার মধ্যে উল্লেখযোগ্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, কুমিল্লা, ঢাকা, গাইবান্ধা, খুলনা, শরীয়তপুর, টাঙ্গাইল।

সর্বোচ্চ সংক্রমণ ফরিদপুরে : গত ২৩ বছরে দেশের যে ৩৪ জেলায় নিপাহ ভাইরাস দেখা গেছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশিবার রোগটি দেখা গেছে এ জেলায়। রোগীও সর্বোচ্চ ৭১ জন, যা মোট রোগীর ২১ শতাংশ। এরপর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রোগী পাওয়া গেছে রাজবাড়ীতে, ৩১ জন। এ ছাড়া নওগাঁয় ২৭, লালমনিরহাটে ২৪, মানিকগঞ্জে ১৭, রংপুরে ১৬, মেহেরপুরে ১৩, কুষ্টিয়া, রাজশাহী, টাঙ্গাইল ও ঠাকুরগাঁওয়ে ১২ জন করে ও জয়পুরহাটে ১০ জন রোগী পাওয়া গেছে। নয়জন রোগী পাওয়া গেছে দিনাজপুর, আটজন করে গোপালগঞ্জ ও নাটোরে, ছয়জন করে মাদারীপুর, মাগুরা ও নীলফামারী, পাবনায় চারজন, তিনজন করে বগুড়া ও কুড়িগ্রামে, দুজন করে শরীয়তপুর ও ময়মনসিংহে। আর একজন করে রোগী পাওয়া গেছে ৯ জেলায়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, কুমিল্লা, ঢাকা, গাইবান্ধা, ঝালকাঠি, খুলনা, নড়াইল।

বেশি রোগী ও মৃত্যু ২০০৪ সালে : দেশে গত ২৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে ২০০৪ সালে ৬৭ জন। সর্বোচ্চ মৃত্যুও ছিল সে বছর ৫০ জনের। সে হিসেবে সে বছর মৃত্যুহার ছিল ৭৫ শতাংশ। এরপর ২০১১ সালে রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৩, মারা গেছে ৩৭ জন। ২০১৪ সালে রোগী ছিল ৩৭ ও মৃত্যু ১৬ জনের।

এরপর ২০১৩ সালে রোগী ৩১, মারা গেছে ২৫ জন। ২০১০ সালে রোগী ১৮, মৃত্যু ১৬ জন। ২০০৭ সালে রোগী ১৮ জন, মৃত্যু ৯। ২০১২ সালে রোগী ১৭ জন, মৃত্যু ১২। ২০১৫ সালে রোগী ১৫ জন, মৃত্যু ১১। ২০০১ সালে রোগী ১৩ জন, মৃত্যু ৯। ২০০৩ সালে রোগী ১২, মারা গেছে ৮ জন। ২০০৮ সালে রোগী ছিল ১১, মারা গেছে ৭ জন।

গত ২৩ বছরের মধ্যে তিন বছর, অর্থাৎ ২০০২, ২০০৬ ও ২০১৬ সাল নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে মুক্ত ছিল দেশ।

প্রধান লক্ষণ ও সতর্কতা : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জরুরি স্বাস্থ্য বার্তায় বলা হয়, জ্বরসহ মাথাব্যথা, খিঁচুনি, প্রলাপ বকা, অজ্ঞান হওয়া ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট হওয়া নিপাহ রোগের প্রধান লক্ষণ।

স্বাস্থ্য বার্তায় নিপাহ রোগ প্রতিরোধে খেজুরের কাঁচা রস ও কোনো ধরনের আংশিক খাওয়া ফল না খাওয়া এবং ফলমূল পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেখানে বলা হয়, নিপাহ রোগের লক্ষণ দেখা দিলে রোগীকে অতি দ্রুত নিকটস্থ সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে এবং আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে আসার পর সাবান ও পানি দিয়ে দুই হাত ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে।

ডিসেম্বর থেকে মে পযন্ত ঝুঁকিপূর্ণ : আইইডিসিআরের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. শারমিন সুলতানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, নওগাঁ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও রাজশাহীসহ চার-পাঁচ জেলায় নিপাহ ভাইরাস খুব বেশি হয়। তবে যেহেতু খেজুরের কাঁচা রস সব জেলায় পাওয়া যায়, সে হিসেবে পুরো দেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের জুনোটিক ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রামের ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. নুজহাত নাদিয়া বলেন, বাংলাদেশের রাজশাহী ও ফরিদপুর অঞ্চলে বেশি নিপাহ ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। রাজশাহীতে মৃত্যু বেশি। জানুয়ারির সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সেখানে মারা গেছে ১০ জন। এবারও এক জেলায় প্রথমবারের মতো একজন রোগী পাওয়া গেছে।

এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, ‘ডিসেম্বর থেকে মে পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময় রস থাকে ও মানুষ খেতে চায়। কোনোভাবেই খেজুরের কাঁচা রস খাওয়া যাবে না। একটা ঝুঁকিপূর্ণ জিনিস খাব কেন।’ তিনি বলেন, ‘রাজশাহীতে সচেতনতা তৈরি করতে গিয়েছিলাম। সব উপজেলা থেকে প্রশাসন থেকে শুরু করে গাছি পর্যন্ত সবাইকে এনেছিলাম।’

চিকিৎসা খুবই স্পর্শকাতর : এ ব্যাপারে ডা. শ. ম. গোলাম কায়ছার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গতবার ১৪ জনের মধ্যে ১০ জনই মারা গেছে। এবার কেবল মৌসুম শুরু। সেজন্য আমরা আগে থেকেই যেসব জেলায় নিপাহ ভাইরাসের উপদ্রব আছে, সেখানে অ্যাডভোকেসি করছি। সাধারণত ৩৪ জেলা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। তবে গড়ে রোগী আসে ২৯-৩০ জেলা থেকে রোগী আসে।’

এ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক বলেন, কারও মধ্যে নিপাহ ভাইরাসের উপসর্গ দেখা গেলে তিনি দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যাবে ও পিসিআর টেস্টের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে নিপাহ ভাইরাস পজিটিভ বা নেগেটিভ। পজিটিভ হলে রোগীদের বেশিরভাগই ঢাকায় আনা হয়। এ রোগের চিকিৎসায় বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়। রোগীর চিকিৎসায় চিকিৎসক ও নার্সসহ যারাই রোগীর কাছে যাবে, তাদের পিপিই পরতে হয়। চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড ওয়ার্ড লাগে।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের রোগীর অনেক দিন আইসিইউতে থাকতে হয়। অন্য রোগীদের থেকে পৃথক থাকতে হয়। ডেডিকেটেড আইসিইউ লাগে। তা না হলে চিকিৎসা করা যায় না। সাধারণ হাসপাতালগুলো এ রোগীগুলোকে রাখতে চায় না। কারণ ওখান থেকে আরেকজনের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তিনি বলেন, গত বছর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে কিছু রোগী এসেছিল ও রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দুয়েকজন রোগী ছিল।