অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৈষম্যহীন দেশ গঠনে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ

আপডেট : ১৯ জুলাই ২০২৬, ০৭:১৯ এএম

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, ‘বিগত ১৫০ দিনে সরকার কেবল সমস্যার সমাধানই করেনি, বরং একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশের মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। ভবিষ্যতের দিনগুলোতেও এই অবারিত উদ্যম, দেশপ্রেম এবং দায়বদ্ধতা নিয়ে কাজ করতে চায়।’ তিনি বলেন, ‘একটি ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যাত্রা শুরু করে মাত্র ৫ মাসে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করা কেবল তখনই সম্ভব, যখন সরকারের পেছনে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ও আস্থা থাকে।’

গতকাল শনিবার রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাস পূর্তি উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন প্রথম ১৫০ দিনের কার্যক্রম, বিভিন্ন উদ্যোগ ও অর্জনের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, পাঁচ মাসের সাফল্যকে সরকার পাঁচটি প্রধান ক্ষেত্রে ভাগ করেছে। এগুলো হলো জনগণের আস্থা, ভালোবাসা ও সমর্থন অর্জন; নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বার্থরক্ষা; স্বল্প সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সফলতা; জনগণের স্বাধীনতা ও দেশের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার; এবং প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্ব।

জনগণের আস্থা অর্জনে জবাবদিহি ও আইনের শাসন: মাহদী আমিন বলেন, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, মানবাধিকার এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কাজ করছে। শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার দ্রুত বিচার, আলোচিত কয়েকটি মামলার তদন্ত ও গ্রেপ্তার কার্যক্রমে অগ্রগতি, সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধন, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় যৌথ বাহিনীর অভিযান সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।

তিনি আরও বলেন, পরিবেশ সুরক্ষায় পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। ঢাকাকে দূষণমুক্ত করতে প্রাথমিকভাবে ২৫০টি সর্বাধুনিক পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, চট্টগ্রাম বন্দরে স্বয়ংক্রিয় কার্গো রিলিজ ব্যবস্থা চালু, মূল্যস্ফীতি কমিয়ে আনা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক অগ্রগতির কথা তুলে ধরেন তিনি।

রাষ্ট্রীয় অপচয় কমাতে মন্ত্রীদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট সুবিধা গ্রহণ না করার সিদ্ধান্তকেও সরকারের উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেন মাহদী আমিন।

ইশতেহার বাস্তবায়নে কৃষক, নারী, শিক্ষার্থী ও প্রবাসীদের অগ্রাধিকার : নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের বিষয়ে মাহদী আমিন বলেন, সরকার কৃষক, নারী, ক্রীড়াবিদ ও প্রবাসীদের জন্য পৃথক কার্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছে, যা ভবিষ্যতে একটি সমন্বিত ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’-এ রূপ দেওয়া হবে।

তিনি জানান, ১২ লাখ ক্ষুদ্র কৃষকের কৃষিঋণ মওকুফ, নিম্ন আয়ের ৫৫ লাখ পরিবারের জন্য ১৫ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণ, নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সহজ শর্তে ঋণ, ফ্রিল্যান্সারদের রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র, পথশিশু পুনর্বাসন প্রকল্প এবং শিক্ষকদের সম্মানী বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া অনার্স পর্যন্ত ছাত্রীদের বিনামূল্যে শিক্ষার ঘোষণা, স্মার্ট ক্লাসরুম, ফ্রি ওয়াই-ফাই, মিড-ডে মিল, নতুন পাঠ্যক্রম, স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ, বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষাঋণ, স্টার্টআপ তহবিল, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধীদের জন্য মেট্রোরেল ভাড়ায় ছাড় এবং জেলা পর্যায়ে কর্মসংস্থান এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য খাতে সরকারি হাসপাতালে বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, উপজেলা হাসপাতাল উন্নয়ন, ইউনিয়নভিত্তিক স্বাস্থ্য ইউনিট, দুই হাজার মিনি কোল্ডস্টোরেজ নির্মাণ এবং সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণ কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন তিনি।

স্বল্প সময়ে সংকট মোকাবিলায় নানা উদ্যোগ : সরকারের স্বল্প সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বিষয়ে মাহদী আমিন বলেন, বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও সরকার জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রেখেছে এবং নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাজার তদারকি জোরদার করেছে।

রমজান ও দুই ঈদে বাজার স্থিতিশীল রাখা, ভারতীয় গরুর অবৈধ প্রবেশ বন্ধ, শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ নিশ্চিত, নতুন অর্থবছরের বাজেট প্রণয়ন, ব্যাংক খাতের জন্য পুনঃমূলধনী তহবিল গঠন, জুয়া প্রতিরোধ আইন পাস, পাচার হওয়া সম্পদ জব্দ ও ফেরত আনার উদ্যোগ এবং রপ্তানি বৃদ্ধিকে সরকারের উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন তিনি।

এ ছাড়া শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প এবং বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিতে কূটনীতি : মাহদী আমিন বলেন, বর্তমান সরকার ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির ভিত্তিতে সমতা ও জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে কূটনীতি পরিচালনা করছে। মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা ও আইনের শাসন নিশ্চিতের পাশাপাশি বৈদেশিক বিনিয়োগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

মালয়েশিয়া ও চীন সফরে বিভিন্ন সমঝোতা স্মারক সই, বিনিয়োগ প্রস্তাব, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, ভারতের ভিসা সেবা পুনরায় চালু, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন তিনি।

এ ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তা জোরদারে আধুনিক রাডার ও সীমান্ত নজরদারি সরঞ্জাম স্থাপন, জাপানের নারিতা রুটে বিমানের সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু, ব্যবসা নিবন্ধনের সময়সীমা ১৪ দিনে নামিয়ে আনা এবং ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির অংশ হিসেবে পাসপোর্টে ‘একসেপ্ট ইসরায়েল’ পুনর্বহালের বিষয়ও উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে প্রথমবারের মতো ‘ককাস অব আমেরিকা ইন দ্য ন্যাশনাল পার্লামেন্ট অব বাংলাদেশ’ (ককাস অব আমেরিকা) গঠনের বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মানবিক ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠনের প্রয়াস : মাহদী আমিন বলেন, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রধানমন্ত্রী জনকল্যাণ, অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র এবং সেবামুখী নেতৃত্বের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। প্রচলিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির বাইরে জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ, দেশপ্রেম, দূরদর্শী পরিকল্পনা, সামাজিক কল্যাণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার যে বার্তা তিনি তুলে ধরছেন, তা মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রত্যাশা ও আস্থার সঞ্চার করেছে।

তিনি আরও বলেন, একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উন্নয়নমুখী বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগগুলো নতুন চিন্তার দ্বার উন্মোচন করছে। বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে সরাসরি নির্দেশনা, কৃষকদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে সম্পৃক্ততা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে মতবিনিময়, ভিআইপি সংস্কৃতি কমানো, সরকারি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, শিশুদের জন্য সংসদ অধিবেশন দেখার সুযোগ, শিক্ষার্থীদের ক্রীড়া ও উদ্ভাবনী কর্মসূচি এবং প্রাণীকল্যাণে নেওয়া উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।

১৫০ দিনে বৈষম্যহীন বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন : সংবাদ সম্মেলনের শেষাংশে মাহদী আমিন বলেন, ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যাত্রা শুরু করে মাত্র পাঁচ মাসে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করা তখনই সম্ভব, যখন সরকারের পেছনে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ও আস্থা থাকে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবসময় বিশ্বাস করেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের আকাক্সক্ষা ও প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে হবে। বিগত ১৫০ দিনে সরকার কেবল সমস্যার সমাধানই করেনি, বরং একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশের মজবুত ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। ভবিষ্যতের দিনগুলোতেও একই উদ্যম, দেশপ্রেম ও দায়বদ্ধতা নিয়ে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকার কাজ করে যাবে বলেও জানান তিনি।

শুধ মানুষ নয়, প্রাণিকুল রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এই মুখপাত্র বলেন, ‘প্রাণিরক্ষায় গুরুত্ব দিয়ে অবহেলিত প্রাণীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে তার পৃষ্ঠপোষকতায় ‘বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ (বাওয়া) ফ্রি অ্যানিমেল ক্লিনিক ও ২৪ ঘণ্টা জরুরি ফ্রি অ্যাম্বুলেন্স সেবা চালু করা হয়েছে।

মাহদী আমিন বলেন, ‘জাঁকজমক জীবন পরিহার করে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্র পরিচালনায় যে অভিনব, জনকল্যাণমুখী ও সংবেদনশীল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা আজ দেশের মানুষের মধ্যে গভীর আস্থা তৈরি করেছে। তার প্রতিটি পদক্ষেপ, তা দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো হোক বা প্রটোকলহীন সাধারণ জীবনযাপন আজ প্রমাণ করছে তিনি এদেশে প্রতিটি শ্রেণি-পেশা, ধর্ম-বর্ণ জাতিগোষ্ঠী সবার প্রতিনিধি, তিনি জনতার প্রধানমন্ত্রী। মানবিকতা ও ন্যায়পরায়ণতার এই ধারা অব্যাহত রেখে একটি বৈষম্যহীন, আধুনিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার অগ্রযাত্রায় প্রধানমন্ত্রীর এই অনন্য রাষ্ট্রনায়কোচিত নেতৃত্ব এ দেশের ইতিহাসে দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র আবু আবদুল্লাহ মোহাম্মদ সালেহ শিবলী এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনা সঞ্চালনা করেন উপ-প্রেস সচিব জাহিদুল ইসলাম রনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্পিচ রাইটার এসএএম মাহফুজুর রহমান, উপ-প্রেস সচিব মো. সুজাউদ্দৌলা, শাহাদত স্বাধীন এবং সহকারী প্রেস সচিব শাহরিয়ার পামিরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত