রাশপ্রিন্টের মতোন সঞ্জীব চৌধুরী

এলোমেলো কথা ও কবিতার মতো জীবন ছিল তার। দুরন্ত, উড়ন্ত, বাউন্ডুলে। অসম্ভব মেধাবী, সৃষ্টিশীল একজন মানুষ। কেউ কেউ বলেন, অতিরিক্ত কোনোকিছুই বেশিদিন থাকে না। তিনিও থাকেননি। হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার মাকালকান্দি গ্রামে ১৯৬৪ সালের ২৫ ডিসেম্বর জন্ম তার। মাত্র ৪২ বছর বয়সে ২০০৭ সালের ১৯ নভেম্বর মারা যান। পড়াশোনার শুরু হবিগঞ্জে। এরপর ক্লাস নাইনে চলে আসেন ঢাকায়। ভর্তি হন নবকুমার ইনস্টিটিউটে। ১৯৭৮ সালে পাশ করেন এসএসসি। ঢাকা বোর্ডে মেধা তালিকায় ১২তম হন। তারপর ঢাকা কলেজ। শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শুরুতে গণিত বিভাগ নিলেও পড়াশোনা করেন সাংবাদিকতায়।

তখন তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক। সকাল-দুপুর-বিকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘুরতেন দলবদ্ধ হয়ে। গোধুলিবেলায় টিএসসিতে মেতে উঠতেন প্রাণময় আড্ডায়। কখনো বেঞ্চে অথবা কখনো একটি চায়ের প্লেট ঠকঠকিয়ে গান গাইতেন। এলোমেলো, ঝাঁকরা চুলের শীর্ণকায় সেই তরুণের কণ্ঠে তখন ঝাঁঝালো শব্দের অন্যরকম গান। সময়টাই ছিল বিদ্রোহ-বিপ্লব-সংগ্রামের। আবৃত্তিকার শিমুল মুস্তাফার উদ্যোগে নব্বইয়ের উত্তাল সময়ে প্রকাশিত হল একটি অন্যরকম বই। নাম—  রাশপ্রিন্ট। লেখক সঞ্জীব চৌধুরী। কী ছিল তাতে? তেমন কিছু না। কিছু কবিতা, এলোমেলো কথামালা।

এরপর প্রকাশিত হলো, দৈনিক আজকের কাগজ। পত্রিকার খোলনলচে বদলে আধুনিক রীতিতে শুরু হলো কাগজের পথচলা। যার মূল ক্রিয়েটিভ কারিগর ছিলেন সঞ্জীব চৌধুরী। তখন পত্রিকা অফিসে সারাদিন কানের কাছে একটি রেডিও ধরে রাখতেন। সেখান থেকে নিতেন সংবাদ তথ্য। পত্রিকায় নিয়মিত ছাপা হত ‘হাওয়া থেকে পাওয়া’ সিঙ্গেল কলামের চমকে ওঠা সংবাদ। এরপর দৈনিক ভোরের কাগজ। সেখানে শুরু করলেন পৃষ্ঠা-৩ এ তিন কলাম ফিচার। দেশব্যাপী অবাক সাড়া পেলেন। প্রতিদিন হলুদ খামে আসতে লাগল শত শত লেখা। তিনি খাম খোলেন, পড়েন আর অধিকাংশই ফেলে দেন। এমনি করে একদিন...।

১৯৯৩ সালের মার্চ মাস। ভোরের কাগজ অফিস তখন নয়া পল্টনের ‘জুয়েল হাউস’। সঞ্জীবদা বসতেন তিন তলায়। ফিচার বিভাগে। পাশের রুমে সম্পাদকীয় বিভাগ। সেখানে বসতেন ফরিদ কবির, আব্দুল কাইয়ুম মুকুল, আনিসুল হক আর সাজ্জাদ শরীফ। তার লাগোয়া সম্পাদক মতিউর রহমানের রুম। সঞ্জীব চৌধুরী তখন তিন কলাম দেখেন। প্রায় ৩/৪০০ চিঠি টেবিলের ওপর। থরেথরে সাজানো। একদিন বললেন-  চিঠিগুলো খোল! যে লেখা ভালো লাগে না, সোজা ফেলে দিবি। ওই যে, ঝুড়ি! এইভাবে ১০টা লেখা আমাকে দিবি। বিনিময়ে কিছুই পাবি না। কিন্তু আমি তরে নিয়মিত দুপুরে ভাত খাওয়ামু। হেসে বললেন- কী, চলবো?
— অনেক।
— তাইলে কাজ শুরু কর?
এইভাবে ৭-১০ দিন কাজ করার পর, একদিন সম্পাদক মতিউর রহমান আমার দিকে তাকালেন। সঞ্জীব চৌধুরীর উদ্দেশে বললেন-  এই ছেলে কে, সঞ্জীব? 
— ওর নাম তাপস। তিন কলামে ২টা ফিচার ছাপা হইছে। ভালো লেখে। হাতের লেখাও স্পষ্ট, সুন্দর।
মতিউর রহমান তাকালেন আমার দিকে। সঞ্জীব চৌধুরীকে বললেন- ওকে আমার রুমে নিয়ে আসো?
সঞ্জীব দা বললেন- আচ্ছা। তিনি গেলেন না মতিউর রহমনের রুমে। আমাকে বললেন- তুই যা। কোনো তর্ক করবি না। যা বলে, শুধু শুনবি। কোনো কাজ দিলে বলবি, পারমু। এরপর আমি দেখবো। যা, ওই দরজা দিয়ে ঢুকেই ডানের রুম।

মতিউর রহমান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন, মুখের দিকে। এরপর কিছু কথা বললেন। শেষে বললেন   নিয়মিত প্রতি সপ্তাহে ফয়েজ আহমদের উপসম্পাদকীয় অনুলিখন করতে হবে। লেখা শেষ হলে ফরিদ কবীরের হাতে দিবা। তোমারে একটা নিউজপ্রিন্টের প্যাডে ১০০ টাকার বিল করে দেবে। তুমি অ্যাকাউন্টসের হাফিজের কাছ থেকে টাকাটা নিয়া নিবা। এইভাবে প্রতি সপ্তাহে পাইবা ৪০০। এখন যাও। চলে যাবার জন্য পা বাড়াতেই তিনি পিছন থেকে ডাকলেন। বললেন- এই নাও ৫০ টাকা। তোমার আসা-যাওয়ার রিকশা ভাড়া আর দুপুরের খাবার খেয়ে নিও। তখন ফয়েজ আহমদ থাকতেন মগবাজারে। 

মতিউর রহমানের রুম থেকে বের হতেই, হাত ধরে টেনে বারান্দায় নিয়ে এলেন সঞ্জীবদা। বললেন- কী কইলো রে? বলছে, নিয়মিত ফয়েজ আহমদের কলাম অনুলিখন করতে। আরও বলছে, এইটা যদি করতে পারি, তাইলে ভোরের কাগজে আমার চাকরি হবে।

সঞ্জীব দা অট্টহাসি দিলেন। হালকা নাচন ভঙ্গিতে বললেন- এইবার আমার কোনো সমস্যা নাই। তুই শুধু লিখবি, আমি শুধু খামু!
— দাদা, কিছুই বুঝলাম না। কী খাবেন আপনি?
— অহন বুঝবি না। আয় খাম খোল। এইভাবে ২/৩ মাস পার হবার পর, আবার একদিন মতিউর রহমান ডাকলেন। বললেন- মাসে তুমি ভোরের কাগজ থেকে কতো পাও? 
— ১২০০-১৫০০
— (মাথা ঝাকিয়ে) আচ্ছা। তিনি অফিস সহকারীকে ডাকলেন। বললেন- ফরীদ কবিরকে ডাক?
ফরীদ ভাই আসার পর মতি ভাই বললেন- ফরীদ, তোমার তো চিঠিপত্র এবং মুক্তচিন্তা পাতায় একজন হেল্পার লাগে। নাকি? 
ফরিদ ভাই বললেন- তাহলে তো খুবই ভালো হয়।

মতি ভাই আমার দিকে তাকালেন। কিন্তু ফরীদ ভাইয়ের উদ্দেশে বললেন- তাপসরে নিলে কেমন হয়? 

ফরীদ ভাই মুচকি হেসে বললেন- এটা তো খুবই ভালো। উপসম্পাদকীয়তে হেল্প করল, আবার চিঠিপত্র দেখল। চূড়ান্তভাবে অবশ্য আমি দেখে দেব। মতিউর রহমান ঘাড় নাচিয়ে বললেন- তাপস, আগামীকাল সকাল থেকে তুমি ফরীদের রুমে মুকুল আর ফরীদের মাঝে বসবা। যাও। রুম থেকে বের হতেই সঞ্জীব দা হেসে বললেন- আমি সব শুনছি। তর সাথে কাইলকা কথা হইবো। 

পরদিন দেখা হলো, কোনো কথা হলো না সঞ্জীবদার সঙ্গে। প্রায় এক মাস পর। দুপুর বেলা। তিনি আমাদের রুমে এলেন। মুকুল ভাইয়ের উদ্দেশে বললেন- মুকুল ভাই, তাপস রে শাহবাগে লইয়া গেলাম। একটু কাজ আছে! তারপর... 

এইভাবেই চলছিল, মাসের পর মাস। এরপর ভোরের কাগজ অফিস চলে আসে বাংলামটর। তখনও ইস্টার্ন প্লাজা হয়নি। তার পাশে দাদা বাসা নিয়েছেন। সেই দুপুর বেলা। নিয়ে গেলেন বাসায়। দেখলাম, সাড়ে তিন তলায় তিনি থাকেন। এক চিলতে রুম। রান্নাঘর, টয়লেট নিচ তলায়। ছোট্ট রুমের চারদিক বন্ধ। ফ্লোরে শুধু জাজিম বিছানো। দাদাকে বললাম- এটা আপনি কেমন বাসা নিয়েছেন? দাদা হাসলেন। বললেন- বাসায় তো রাতে শুধু একটু ঘুমাই। সারাদিন তো বাইরেই। বড় বাসা নিয়া কী করুম?

এইসময় দাদার ভালোবাসার মানুষ এলেন। মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে হাসল। কারণ আমি তাকে চিনতাম। ভোরের কাগজে নিয়মিত চমৎকার লেখে। দাদা বললেন- তাড়াতাড়ি, ভাত চুলায় দাও? আামাকে ইঙ্গিত করে বললেন- এই ভাতুরের আবার খিদা লাগবো? ও হেসে রান্নাঘরে চলে গেল। এইভাবে ১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

২০০৭ সালের ২০ নভেম্বর সকাল। তখন আমি জনকণ্ঠে। দাদা, ‘দলছুট’ ব্যান্ডের জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পী। তার গাওয়া অনেক গান মানুষের মুখে মুখে। উপদেষ্টা সম্পাদক তোয়াব খান ডাকলেন। বললেন- কিছু জানো? অবাক হয়ে বললাম, কী হইছে? ভোরের কাগজে তোমাদের সহকর্মী সঞ্জীব চৌধুরী গত রাতে মারা গেছে। তার ওপরে ব্যাক পেজ ফিচার হবে। তুমি এখন টিএসসি যাও। সেখানে ওর লাশ আসবে। এরপর ফিরে এসে আমার হাতে লেখাটা দিবে। বিকালে আমি না আসা পর্যন্ত অফিসে থেক। এমন কথা শোনার পর, মুহূর্তে অতীতের পৃষ্ঠা উল্টালাম। নিস্তেজ হয়ে এল শরীর। চোখ ভিজে এল। তবু টিএসসির উদ্দেশে রিকশা নিলাম।

পৌঁছে দেখলাম, শত শত ছেলে-মেয়ে বিষন্ন মুখে অপেক্ষা করছে সঞ্জীবদার শীতল মুখ দেখবে বলে। মেইন গেটে ছেলে-মেয়ের ভিড়। সেখানে কঠিন নিরাপত্তা। সবাই সাবেক ভোরের কাগজের। গেট তদারকি করছে- অমিত হাবীব, শ্যামল দত্ত, সুকান্ত গুপ্ত অলক আর সানাউল্লাহ লাভলু। তাদের বলে, মিলনায়তনের ভিতরে ঢুকলাম। দেখলাম, কেঁদে কেঁদে অভিনেতা শঙ্কর সাঁওজাল দাদাকে নিয়ে বলছেন অবিরত। একসময় অ্যাম্বুলেন্সে দাদা এলেন। ভেতরে সবাই শ্রদ্ধা জানালেন। যখন চলে যাওয়ার সময় হলো, তখন একজন সাবেক সহকর্মী বললেন- দাদার মুখটা একবার দেখলি না! বললাম- না, ভালো লাগার হিমশীতল কোনো মুখ আমি দেখি না। সহ্য করতে পারব না। স্মৃতিগুলো, হাউমাউ করে কেঁদে ওঠবে। তাই...।  সেদিনও দাদাকে দেখিনি। দেখবও না কোনোদিন। দাদা চলে গেছেন অনেক বছর। হয়তো আরও যাবে। এক দিন পর হলেও শুভ জন্মদিন- সুপ্রিয়, শ্রদ্ধাভাজন পেশাগুরু আমার। আপনার কাছে শেখা ফিচার শব্দবিন্যাস, ফিরিয়ে দিলাম আপনাকেই।