মঙ্গলবার, ২১ মে ২০২৪, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

স্মরণ

দেবপ্রসাদের ফিল্ড ক্যামেরা

আপডেট : ১৫ মে ২০২৪, ০৫:৪৬ পিএম

একদা কক্সবাজার শহরে দেবপ্রসাদ নামে একজন সুন্দর মানুষ বসবাস করতেন। তার পুরো নাম দেবপ্রসাদ ভট্টাচার্য্য। তিনি ছবি তুলতেন, ছবি আঁকতেন, গান গাইতেন; গল্প লিখতেন। বাবার ফিল্ড ক্যামেরা দিয়ে তার আলোকচিত্রী জীবনের শুরু। বাবা চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য ছিলেন শিক্ষক; শখের বশে করতেন ফটোগ্রাফি। রেঙ্গুনের বিখ্যাত ফটোগ্রাফার আহুজার কাছ থেকে তিনি একটি ফিল্ড ক্যামেরা কিনেছিলেন। দশ বছর বয়সেই বাবার ক্যামেরা নিয়ে মেতে উঠেন দেবপ্রসাদ। বাসায় তখন ডার্করুম ছিল। দেবপ্রসাদ ছবি তুলে ডার্করুমে ঢুকে নিজে নিজেই ফিল্ম ডেভেলপ ও ছবি পরিস্ফুটনের চেষ্টা করতেন। এতে অনেক কেমিক্যাল আর ছবির প্লেট নষ্ট হতো। কিন্তু বাবা তাকে কিছু বলতেন না। এই না বলার মধ্যে একটা প্রশ্রয় ছিল। প্রাইমারি পাসের পর দেবপ্রসাদ চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটি স্কুলে পড়তে যান। চট্টগ্রামে তখন ‘ফাইন আর্ট গ্যালারি’ বলে স্টুডিও ছিল। ওই স্টুডিওতে খ্যাতিমান আর্টিস্ট সমরেশ বাবুর সঙ্গে তার পরিচয় হয়। সমরেশ বাবুর কাছ থেকেই ফটোগ্রাফির তালিম নেন দেবপ্রসাদ।

দেবপ্রসাদ সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ফটোগ্রাফিবিষয়ক পত্রিকা ‘পোট্রের্ট’ এর মাধ্যমে। ১৯৯০ সালের ১ আগস্ট ওই পত্রিকার প্রথম বর্ষের তৃতীয় সংখ্যায় ‘দেবপ্রসাদ ভট্টাচার্য্যের মুখোমুখি’ শিরোনামে একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। দেবপ্রসাদ সম্বন্ধে আরো বিস্তারিত জানতে পোট্রের্টের সম্পাদক রূপম চৌধুরীকে ফোন করি।

তিনি জানালেন, ‘অনেক বছর আগে সাক্ষাৎকারটা নিয়েছিলাম। এখন তিনি কী অবস্থায় আছেন জানি না।’ চট্টগ্রামের আলোকচিত্রী কমল দাশ জানালেন, ‘টইটম্বুরের সম্পাদক নাওশেবা সবিহ্ কবিতা এ বিষয়ে তথ্য দিতে পারবেন। তাদের পরিবারের সঙ্গে দেবপ্রসাদের ঘনিষ্ট যোগাযোগ ছিল।’ কবিতা আপার কাছে জানলাম, তার বাবা চিত্রশিল্পী সবিহ্—উল আলম, চাচা সাব্বির—উল আলম ও ফুপু দৌলতুল আলমের শিক্ষক ছিলেন দেবপ্রসাদ। পারিবারিক অ্যালবাম থেকে কিছু পুরনো ছবিও পাঠালেন। দৌলতুল আলম ‘স্মৃতির বালুকাবেলায়’ শিরোনামে আত্মজীবনীমূলক একটি বই লিখেছেন। সেখানেও দেবপ্রসাদকে নিয়ে একটি অধ্যায়ে তার দীর্ঘ স্মৃতিচারণা আছে।

দেবপ্রসাদের ছবির প্রধান বিষয় নারী। নারীকে তিনি বিভিন্ন বাস্তবতার নিরিখে দেখার চেষ্টা করতেন। তার সেই সব ছবি ভান্ডার এখন কোথায়, কেউ বলতে পারে না। তবে কাগজে ছাপা হওয়ার কারণে কিছু ছবি এখনো দেখা যায়। ১৯৩৩ সালে ১৩ বছর বয়সে তিনি তার রূপবতী ও গুণবতী মায়ের কিছু ছবি তুলেছিলেন। তার একটা ছবি ছাপা হয়েছিল পোট্রের্ট পত্রিকায়। প্যারেড ময়দানে জহরলাল নেহেরুর পায়ের কাছে বসেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। সেই ছবি তুলেছিলেন দেবপ্রসাদ। পরে সেই ছবি উপহার দিয়েছিলেন জহরলাল নেহেরুকে। তার তোলা কক্সবাজারের কিছু ছবি তৎকালীন ইংরেজি দৈনিক মর্নিং নিউজে ছাপা হয়। সেই ছবি মন্ত্রী পরিষদ বিভাগে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরে ছবি ছাপানোর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। চলচ্চিত্রের স্টিল ছবিও তুলেছেন দেবপ্রসাদ। ১৯৫৯ সালের ২৮ আগস্ট মুক্তি পাওয়া মহীউদ্দিন পরিচালিত ‘মাটির পাহার’ ছায়াছবির স্টিল ফটোগ্রাফি করেন তিনি। এরপর ডাক পেলেও ওদিকটায় মনোযোগ দিতে পারেন নি।

ছবি তোলার পাশাপাশি লেখালেখি করতেন দেবপ্রসাদ। চোখের সামনে যে ঘটনা ঘটতো তা অবলম্বনে গল্প লিখতেন তিনি। তার সেইসব গল্প ছাপা হতো ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায়। এই পত্রিকার আনন্দমেলার বিভাগীয় পরিচালক বিমল ঘোষের অনুপ্রেরণায় তিনি নিয়মিত লিখতেন। পরবর্তী সময়ে তার গল্প নিয়মিত ছাপা হতো মাসিক টইটম্বুরে। টইটম্বুরের সেই গল্প দিয়েই ১৯৯৭ সালে ‘হৈ হুল্লোড়’ নামে তার একটি বই প্রকাশিত হয়। বইটি তিনি তার মা ইন্দুমতি দেবীকে উৎসর্গ করেন। উৎসর্গেপত্রে দেবপ্রসাদ লিখেছেন ‘আমার মা ইন্দুমতি দেবী, যার অদৃশ্য অনুপ্রেরণা আজো চোখের আড়াল থেকে শিল্প, সাহিত্য বা সঙ্গীতের বৈচিত্র উদ্ভাবনে আমাকে তন্ময়তায় বিভোর করে রাখে, তারই স্মরণে।’

 

দেবপ্রসাদের বাবা চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য্য ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মানুষ। হুগলি জেলার চুঁচুড়ায় ছিল তার গ্রামের বাড়ি। সেখান থেকে উইভিং [তাঁত] শিক্ষকের চাকরি নিয়ে তিনি কক্সবাজারে আসেন। তাঁত সমবায়ের মাধ্যমে তিনি কক্সবাজারে তাঁতশিল্পের উন্নতি সাধন করেন। একসময় কক্সবাজারের প্রকৃতি তার ভালো লেগে যায়। তিনি সাগর সৈকতে ‘বেলাকুটির’ নামে একটি বাড়ি তৈরি করেন। এই বেলাকুটিরেই ১৯২০ সালে দেবপ্রসাদের জন্ম। আগে থেকেই তাদের বাড়িতে গানের চর্চা ছিল। তানপুরা হাতে বোনদের নিয়ে সঙ্গীত বিদ্যালয়ে যেতেন দেবপ্রসাদ। পরবর্তী সময়ে তার ভাইবোনরা সবাই বিখ্যাত হন। অবিভক্ত ভারতের প্রথিতযশা চিত্রশিল্পী চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য্য তার বড় ভাই। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের যশস্বী কণ্ঠশিল্পী কুমকুম ভট্টাচার্য্য তার ছোট বোন। তার আরেক বোন গৌরী চট্টপাধ্যায়। দেবপ্রসাদের বাবা একসময় কো—অপারেটিভ রেজিস্টার হয়ে মেদিনীপুরে বদলি হয়ে যান। পরবর্তী সময়ে পরিবারের অন্য সদস্যরাও চলে যান ভারতে। কিন্তু মায়ায় পড়ে কক্সবাজারে থেকে যান দেবপ্রসাদ। যৌবনে কাকে যেনো ভালোবেসেছিলেন। সে সম্পর্ক পরিনয়ের দিকে যায়নি। ফলে সারা জীবন একাকি থেকে ছিলেন দেবপ্রসাদ।

কক্সবাজারের মানুষের কাছে দেবপ্রসাদ পরিচিত ছিলেন ‘দেবস্যার’ বা ‘দেববাবু’ হিসেবে। তিনি ছিলেন গণিতের শিক্ষক। কক্সবাজার গার্লস হাই স্কুলে পড়িয়েছেন ৩৫ বছর। গণিত শেখানোর পাশাপশি তিনি ছাত্রীদের রবীন্দ্র সঙ্গীত ও উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শেখাতেন। দেবপ্রসাদ কখনো শিক্ষক হতে চাননি। চেয়েছিলেন শিল্পী হতে। কিন্তু কক্সবাজারের সুধী সমাজের অনুরোধেই তাকে শিক্ষকতায় যোগ দিতে হয়। তার পড়াশোনা ছিল পদার্থ বিজ্ঞানে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এ বিষয়ে এমএসসি করেছিলেন তিনি। দেবপ্রসাদ ছিলেন সাধক শ্রেণির মানুষ। নিজেকে গুটিয়ে রাখতেন। কিন্তু সব সময় মুখে হাসি লেগে থাকতো। সবাইকে আপনি করে বলতেন। তার ভাষা ছিল মধুর।

মুক্তিযুদ্ধের সময় জীবন রক্ষায় তাকে সাগড় পাড়ি দিয়ে বার্মা চলে যেতে হয়। ফিরে এসে দেখেন বাড়ির সবকিছু ওলটপালট। ছবি, ড্রয়িং, স্কেচ ও পান্ডুলিপি কিছুই নেই। অ¹মেধা ক্যাং এর প্রধান পুরোহিত ভাংতে ছিলেন দেবপ্রসাদের ঘনিষ্ট বন্ধু। ভাংতে তাকে নিয়ে আসেন অ¹মেধা কেয়াংয়ে। থাকার ব্যবস্থা করেন কেয়াংয়ের পাশে কাঠের তৈরি একটি পুরনো বাড়িতে। এই মন্দিরের বাচ্চাদের পড়িয়ে সময় কাটতো। কক্সবাজারে ফিল্ড ক্যামেরার নেগেটিভ, কেমিক্যাল ও ছবি প্রিন্ট করার কাগজ পাওয়া যেত না বলে শেষের দিকে ছবি তুলতেন না। কেয়াংয়ের বাড়িতে তার থাকতে কষ্ট হতো। পুরনো পাটাতনের ফাঁক গলে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র প্রায় নিচে পড়ে যেতো। টিনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে হু হু করে আসতো ঠান্ডা বাতাস, সেই সঙ্গে মশার পাল। বৃষ্টিতে বেয়ে পানি পড়তো। সবকিছু মেনে নিয়ে এ বাড়িটিতে থেকে গেলেন শুধুমাত্র বন্ধু ভাংতের স্মৃতিকে জড়িয়ে ধরে। আর নিজের বাড়ি ‘বেলাকুটির’ দান করে দিলেন অনুকুল ঠাকুরের আশ্রমের নামে। ২০০০ সালের ১৫ মে দেহত্যাগ করেন দেবপ্রসাদ ভট্টাচার্য।

দেবপ্রসাদ ভট্টাচার্য্য [১৯২০-১৫ মে ২০০০]

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত