বাঙালির মানসপটে সমুজ্জ্বল নাম সত্যজিৎ রায়। তার ডাকনাম মানিক। বাঙালির হৃদয়ে তিনি মানিকের চেয়ে কম নন। তিনি একাধারে চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক ও শিল্পী। বিশ্বসভায় যাদের উপস্থিতি বাঙালি জাতিকে গর্বিত করে তাদের অন্যতম সত্যজিৎ রায়। আগামীকাল ২ মে তার জন্মশতবর্ষ। সত্যজিতের বর্ণিল জীবন নিয়ে লিখেছেন মুমিতুল মিম্মা
সত্যজিৎ রায়
সত্যজিৎ রায়ের নাম উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে ওঠে অপুর সংসার, আগন্তুক কিংবা প্রফেসর শঙ্কু ও ফেলুদার নাম। বাংলা ভাষাভাষী মানুষদের সহজ অথচ গভীর সব আবেগকে চলচ্চিত্রের ক্যানভাসে অনন্য করে ফুটিয়ে তোলার দক্ষ কারিগর তিনি। তার চোখ দিয়ে চলচ্চিত্রের পর্দায় বাংলাকে চিনেছে বিশ্ব। ষাটের দশকে চলচ্চিত্র নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই সাড়া ফেলে দেন। বাংলা ভাষায় নির্মিত হলেও তার চলচ্চিত্রে প্রাধান্য পেয়েছে মানুষের সার্বজনীন অনুভূতি। সম্পর্ক, সম্পর্কের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগের উত্থান-পতন, ব্যক্তিমানুষের সামগ্রিক যুদ্ধ, দ্বন্দ্ব, আনন্দ ও দুঃখকে একের পর এক তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন চলচ্চিত্রের বৃহৎ ক্যানভাসে। ফলে দেশ-কালের ব্যাপ্তিতে তাকে আর বেঁধে রাখা যায়নি। নিজের অনুভূতিকে চলচ্চিত্রের সুতোয় গেঁথে সত্যজিৎ হয়ে ওঠেন সর্বকালের, সব দেশের।
বেড়ে ওঠা
সত্যজিৎ রায় ১৯২১ সালের ২ মে কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতামহ ছিলেন উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। বাবা সুকুমার রায়, মা সুপ্রভা দেবী। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। সত্যজিতের প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি তার মায়ের হাত ধরে। ১৯২৯ সালে আট বছর বয়সে বালিগঞ্জ সরকারি স্কুলে তার প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনার শুরু। ১৯৩৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে তিনি ভর্তি হন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে। প্রথম দুই বছর বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করে শেষ বছরে এসে বিষয় পাল্টে অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন। ফলে নিজের খেয়ালে পড়াশোনার সময় দীর্ঘতর হয়ে ওঠে তার। ধীরে ধীরে সত্যজিৎ পাশ্চাত্য চলচ্চিত্র ও সংগীত নিয়ে খুবই আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এতে তার মূল পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে। শেষ পর্যন্ত তিনি ১৯৪০ সালে বিএ (অনার্স) পাস করেন।
মায়ের উৎসাহে ১৯৪০ সালে শান্তি নিকেতনের কলাভবনে ভর্তি হন সত্যজিৎ। শান্তি নিকেতনের পড়াশোনার সুবাদে তিনি বিখ্যাত চিত্রশিল্পী নন্দলাল বসু ও বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের কাছে শিক্ষালাভের সুযোগ পান। বিশ্বভারতীতে সত্যজিতের পাঁচ বছর পড়াশোনা করার কথা থাকলেও তার আগেই তিনি শান্তিনিকেতন ছেড়ে কলকাতায় চলে আসেন।
১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে ডি জে কেমার নামক ব্রিটিশ বিজ্ঞাপন সংস্থায় ‘জুনিয়র ভিজুয়ালাইজার’ পদে যোগদান করেন। এখানে তিনি বেতন পেতেন ৮০ টাকা। এখানে এসেই সত্যজিৎ প্রথমবারের মতো তার প্রতিভার আলোকচ্ছটার বিচ্ছুরণ শুরু হয়। প্রথমবারের মতো বিজ্ঞাপনে ভারতীয় ধাঁচের ক্যালিওগ্রাফির ব্যবহার শুরু করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি অক্ষরশৈলীতে (টাইপোগ্রাফি) বিশেষভাবে আগ্রাহী হয়ে ওঠেন। তার নকশা করা দুটি ফন্ট ‘Ray Roman’ ’ এবং ‘‘Ray Bizarre’ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পুরস্কার লাভ করেছিল। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় এই শুরু হলো সত্যজিতের পথচলা।
এ সময়ে সত্যজিৎ নিয়মিত চলচ্চিত্র দেখা শুরু করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি কলকাতায় অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করে নতুন মার্কিন চলচ্চিত্রগুলোর বিষয়ে খবর নিতেন। বিশেষ করে নরম্যান ক্লেয়ার নামের রয়্যাল এয়ারফোর্সের এক কর্মচারী তাকে বিশেষভাবে সাহায্য করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে কলকাতার সিনেমা হলগুলোতে হলিউডে নির্মিত প্রচুর ছবি দেখানো হতো। এই সূত্রে হলিউডের চলচ্চিত্রগুলো কলকাতার চলচ্চিত্র প্রেমিকদের কাছে প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। ১৯৪৭ সালে সত্যজিৎ ও বংশী চন্দ্রগুপ্ত কলকাতা ফিল্ম সোসাইটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই সোসাইটিতে চলচ্চিত্র দেখানো হতো এবং এই বিষয়ে পরে ঘরোয়াভাবে আলোচনার ব্যবস্থা করা হতো।
সিনেমা জগতে
তিনি ব্রিটিশ মালিকানাধীন বিজ্ঞাপন সংস্থা ডিজে কিমারের হয়ে কাজ করেন। তিনি একটি প্রকাশনা সংস্থা সিগনেট প্রেসের জন্য বাণিজ্যিক ইলাস্ট্রেটর হিসেবেও কাজ করেছিলেন। ডব্লিউ অ্যান্ড্রু রবিনসন জানান, সত্যজিৎ তার প্রথম চলচ্চিত্র পথের পাঁচালি তৈরির সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে তিনি নতুন পরিচালক বলে প্রযোজকদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সাহায্য পাচ্ছিলেন না। নতুন পরিচালকদের ক্ষেত্রে প্রযোজক না পাওয়ার ব্যাপারটি চলচ্চিত্রাঙ্গনে খুবই স্বাভাবিক। পিছু না হটে ১৯৫২ সালের শেষের দিকে সত্যজিৎ নিজের টাকা দিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু করেন। এরপরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের রেল বিভাগ বাকি টাকার জোগান দেয়।
১৯৫৫ সালে ভারতের তৃতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে এটি শ্রেষ্ঠ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এবং সেরা বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হিসেবে মনোনীত হয়। পরের বছর এটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রতিযোগিতা করে ‘বেস্ট হিউম্যান ডকুমেন্ট’ এবং বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ওসিআইসি পুরস্কার জিতে নিয়েছে।
সামগ্রিক বিবেচনায়, পথের পাঁচালি, অপরাজিত, অপুর সংসার- এই তিনটি সিনেমা প্রখ্যাত চলচ্চিত্র সমালোচক রজার এবার্টের ২০০১ সালে ‘সেরা একশ চলচ্চিত্র’ তালিকায় স্থান পায়। ২০০৫ সালে টাইম ম্যাগাজিনের সর্বকালের সেরা ১০০ চলচ্চিত্রে স্থান পায় পথের পাঁচালি। বিবিসির ফরেন ল্যাঙ্গুয়েজ ফিল্মের তালিকায় ১৫ নম্বরে অবস্থান পথের পাঁচালির।
ফিলিপাইনের বিখ্যাত র্যামন ম্যাগসেসে অ্যাওয়ার্ড ফাউন্ডেশন ১৯৬৭ সালে ক্রিয়েটিভ কমিউনিকেশন ও আর্টসে সত্যজিৎ রায়কে র্যামন ম্যাগসেসে পুরস্কার প্রদান করে। ১৯৬৯ সালে নির্মিত হয় বাণিজ্যিকভাবে সবচেয়ে সফল চলচ্চিত্র মিউজিক্যাল ফ্যান্টাসি গুপি গাইন বাঘা বাইন। পরবর্তীকালে তিনি এর স্যিকুয়াল ‘হীরক রাজার দেশে’ তৈরি করেন। অনেকেই বলেন প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা জরুরি অবস্থাকে লক্ষ্য করে এই সিনেমা তৈরি করা হয়।
যুগোস্লাভিয়া সরকার সম্মাননা স্বরূপ ১৯৭১ সালে যুগোস্লাভ স্টার উইদ গোল্ডেন রেথ পুরস্কার দেয় তাকে। ১৯৭৩ সালে নবম শিকাগো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সম্মানসূচক পুরস্কার লাভ করেন তিনি। লন্ডনের বিখ্যাত রয়েল আর্ট কলেজ ১৯৭৪ সালে চলচ্চিত্রে ভূমিকা রাখায় সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করে তাকে।
সত্যজিৎ রায় বিশ্ব চলচ্চিত্রাঙ্গনে তার মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য পরিচিত। ১৯৭৮ সালে বার্লিন চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজক কমিটি তাকে সর্বকালের সেরা তিন পরিচালকের একজন হিসেবে স্থান দেয়। একই বছর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডক্টর অব লেটারস প্রদান করে তাকে। ১৯৭৯ সালে ১১তম মস্কো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অশনি সংকেত সিনেমার জন্যে বিশেষ সম্মানসূচক পুরস্কার দেওয়া হয় তাকে। এই উৎসবেই ববিতা সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান।
৩৫তম কান চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠানে ১৯৮২ সালে সত্যজিৎ রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে দেওয়া হয় সম্মানসূচক পুরস্কার। একই বছর তিনি সম্মানসূচক গোল্ডেন লায়ন পান ৩৯তম ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে। ১৯৮৩ সালে ব্রিটিশ চলচ্চিত্র ইনস্টিটিউট তাকে ফেলোশিপ প্রদান করে। ১৯৮৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন সোভিয়েত ল্যান্ড নেহরু অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে তাকে। একই বছর পান চলচ্চিত্রের ভারতীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার। ১৯৮৭ সালে ফরাসি সরকারের বিশেষ সম্মাননা লিজিয়ন পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি।
১৯৯১ সালে ৬৪তম একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স তাকে সম্মানসূচক একাডেমি অ্যাওয়ার্ড প্রদান করে। একই বছরে চতুর্থ টোকিও আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র পুরস্কার অনুষ্ঠানে কৃতিত্বের জন্য বিশেষ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯২ সালে ৩৫তম সান ফ্রান্সিসকো আন্তর্জাতিক উৎসবে তিনি আকিরা কুরোসাওয়া অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।
বিদেশি এত এত সম্মাননা পাওয়া মানুষটিকে দূরে ঠেলে দেয়নি নিজের স্বদেশ। ভারতের চারটি জাতীয় সম্মাননায় বিশেষভাবে সম্মানিত হয়েছেন তিনি। ভারত সরকার কর্র্তৃক ১৯৫৮ সালে পদ্মশ্রী, ১৯৬৫ সালে পদ্মভূষণ, ১৯৭৬ সালে পদ্মবিভূষণ এবং ১৯৮৭ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ভারতরতœ লাভ করেন তিনি। মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে একাডেমি অব মোশন পিকচার আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স তাকে ১৯৯২ সালে চলচ্চিত্রে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য সম্মানসূচক অস্কার প্রদান করে।
বিশেষ সত্যজিৎ
১. সত্যজিৎ রায়কে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করে, চার্লি চ্যাপলিনের পর দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে একমাত্র তিনিই এই সম্মান লাভ করেন। আজীবন কৃতিত্বের জন্য তিনি সম্মানসূচক অস্কারও জিতেছিলেন।
২. তিনি চলচ্চিত্র নির্মাতা আকিরা কুরোসাওয়ার সঙ্গে দেখা করার জন্যে জাপান সফরে যান। চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জন্য এটি একটি দারুণ সম্মেলন ছিল। এই সম্মেলনে বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতারা চলচ্চিত্রের বিষয়ে একে অপরের দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামতগুলো নিজেদের ভেতরে আলোচনা করেছিলেন। কীভাবে চলচ্চিত্র উন্নয়নে ভূমিকা রাখা যায় তা নিয়েও বিশদ আলোচনা করেন তারা।
৩. এককালে তিনি সাহিত্য একাডেমি, রূপা পাবলিকেশন ও অন্যান্য সংস্থার জন্য লোগো ডিজাইন করেছিলেন। তিনি জওহরলাল নেহরুর ডিসকভারি অব ইন্ডিয়ার জন্য মূল প্রচ্ছদের ডিজাইন করেন। পরবর্তীকালে তিনি টাইপোগ্রাফিক শৈলীকে শিল্পের মর্যাদা দিয়েছিলেন।
৪. সত্যজিৎ রায়ের শিস দেওয়ার দুর্দান্ত ক্ষমতা ছিল। তিনি ছিলেন হরবোলা। জন্মগতভাবেই এই প্রতিভা রপ্ত করেন তিনি। কোনো শব্দ শোনার পর তিনি সহজেই তা অনুকরণ করতে পারতেন। তিনি শিস দিয়ে পাখির ডাক, প্রকৃতির অনেকগুলো শব্দ অনুকরণ করতে জানতেন।
৫. সংগীত ছিল সত্যজিৎ রায়ের আবেগের স্থান। বিশেষ করে পশ্চিমা ধ্রুপদী সংগীত। তিনি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কেবল পাশ্চাত্য শাস্ত্রীয় সংগীত শুনতেন। প্রাচ্যের ধ্রুপদী এমনকি রবীন্দ্র সংগীত শুনতেন না। এ থেকে বোঝা যায় প্রাচ্যের ধ্রুপদী ঘরানা সম্বন্ধে খুব ভালো ধারণা ছিল তার।
আকিরা কুরোসাওয়ার চোখে
আকিরা কুরোসাওয়াকে বলা হয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী পরিচালক। সত্যজিৎ রায়ের সমসাময়িক এই চলচ্চিত্রকার তার সম্বন্ধে জানান, ‘মানুষের শান্ত কিন্তু গভীর পর্যবেক্ষণ, বোঝাপড়া ও ভালোবাসা তার চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্য। এই বিষয়গুলো আমাকে মুগ্ধ করেছে। চলচ্চিত্র শিল্পে আমি তাকে ‘জায়ান্ট’ বলে মনে করি।’
সত্যজিৎকে গল্প বলায় ‘মাস্টার’ উল্লেখ করে তিনি বলেন চলচ্চিত্রে তিনি একটি বহমান ঐতিহ্য রেখে গেছেন। চলচ্চিত্রে তিনি তার দৃষ্টিভঙ্গির পর্যবেক্ষণকে বিস্তৃত পরিসরে বলে গেছেন। সত্যজিতের চলচ্চিত্র বুদ্ধি ও আবেগের এক দারুণ সংমিশ্রণ। নির্মাতা হিসেবে তিনি ছিলেন নিয়ন্ত্রিত, সুনির্দিষ্ট, নিখুঁত। দর্শকদের কাছে তার চলচ্চিত্র গভীর ছোঁয়া রেখে যায়। তার চলচ্চিত্রের বিশেষ দিক হলোÑ মেলোড্রামা বা নাটকীয়তার বাড়াবাড়ি ব্যবহার না করে তিনি এক একটি দৃশ্যে মানবীয় সূক্ষ্ম সংবেদনশীলতা চিত্রিত করে গেছেন। একজন পরিচালক হিসেবে তিনি চলচ্চিত্রে একটি সিনেমাটিক শৈলী বিকশিত করে গিয়েছেন, কিন্তু নিজে থেকেছেন অদৃশ্য হয়ে। চলচ্চিত্রশিল্পে তিনি হইচই ফেলে দিয়েছিলেন, কিন্তু নিঃশব্দে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেনÑ ‘সিনেমার সেই টেকনিককেই সেরা বলা যায়Ñযা আলাদা করে চোখে পড়ে না।’
যদিও প্রথম দিকে তিনি নব্য-বাস্তববাদ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তার সিনেমাকে নির্দিষ্ট কোনো ঘরানায় ফেলা যায় না। কিন্তু তিনি একটি মেটা-ঘরানার স্টাইল অনুসরণ করে গিয়েছিলেন। তার সেই কালজয়ী মেটা-ঘরানা, যা দর্শকদের স্পর্শ করে। তার চলচ্চিত্রগুলো ভিন্ন কোনো নতুন পথ তৈরি না করে একটি মেটা-ঘরানার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তার চলচ্চিত্রের ভাষা মিশে গেছে আকিরা কুরোসাওয়া, আলফ্রেড হিচকক, চার্লস চ্যাপলিন, ডেভিড লিন, ফেডেরিকো ফেলিনি, ফ্রিটজ ল্যাং, জন ফোর্ড, ইংমার বার্গম্যান, জন রনোয়ার, লুইস বুনুয়েল, ইয়াসুজিরো ওজু, ঋত্বিক ঘটক ও রবার্ট ব্রেসনের কাজের সঙ্গে। শৈলী এবং বিষয়বস্তুতে এরা খুব আলাদা। তবুও চলচ্চিত্রের সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে এই নির্মাতারা সর্বকালের সেরা হয়ে আছেন।
সত্যজিৎ রায় চলচ্চিত্র নির্মাণের নিজস্ব ধারায় অনেকগুলো দিক নিজের মতো করে নিয়েছিলেন। চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছিলেন। নিজের গল্পের ওপর ভিত্তি করে তার অনেক চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছিল।
তিনি নিজ দায়িত্বে চলচ্চিত্র সেট ও পোশাক ডিজাইন করতেন। চারুলতা (১৯৬৪) থেকে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে ক্যামেরায় হাত দেন তিনি। ১৯৬১ সাল থেকে তার সব চলচ্চিত্রের জন্য সংগীত রচনা করেন। এখানেই শেষ নয়। নতুন সিনেমা মুক্তি পাওয়ার সময় প্রচারের জন্য পোস্টার ডিজাইনও করেন তিনি।
চলচ্চিত্র নির্মাণ ছাড়াও, সত্যজিৎ একজন সুরকার, লেখক ও গ্রাফিকস ডিজাইনার ছিলেন। এমনকি তিনি একটি নতুন টাইপফেস ডিজাইন করেছিলেন। পিতামহ উপেন্দ্রকিশোর রায়ের প্রতিষ্ঠা করা সন্দেশ পত্রিকাটি পুনরুজ্জীবিত হয় তার হাত ধরে। ১৯৬১ সালে তিনি শিশুদের জন্য বাংলা পত্রিকা ‘সন্দেশ’ পুনরুজ্জীবিত করেন এবং নতুনভাবে প্রকাশ শুরু করেন।
[পূর্বে দেশ রূপান্তরে প্রকাশিত]
