রংপুরের পীরগঞ্জে নির্বাচনী জনসভায় প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় পীরগঞ্জের মানুষের কাছে ভোট চান। তিনি বলেন, ‘একখ্যান ভোট মুই পামু না, হামাক একখ্যান ভোট দেন।’
সরকার উন্নয়নের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমাদের সরকারের সময়ে দেশে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে এবং উন্নয়ন কর্মকান্ড চলমান রয়েছে। রংপুর অঞ্চল একসময় অবহেলিত ছিল। সবসময় মঙ্গা লেগে থাকত। আমরা উন্নয়নের জন্যই রংপুরকে বিভাগ করেছি। এখন রংপুর অনেক উন্নত।’
মেয়েদের শিক্ষাসহায়তা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করেছি। বিনামূল্যে বই দিচ্ছি। উপবৃত্তির টাকা দিচ্ছি। এতে শিক্ষার্থীর পরিবারও উপকৃত হচ্ছে।’
শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা প্রত্যেক উপজেলায় ফায়ার সার্ভিস স্টেশন করে দিয়েছি। আগে আগুন নেভানোর ব্যবস্থা ছিল না। এখন সে সমস্যা নেই। অনেক কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে।’ পীরগঞ্জবাসীকে প্রশ্ন করে তিনি বলেন, ‘১৫ বছর আগে পীরগঞ্জে যে অবস্থা ছিল তার কি পরিবর্তন হয়েছে?’ তখন সমাবেশস্থল থেকে হ্যাঁ-সূচক জবাব আসে। ভূমি ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমরা ভূমি ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটাইজ করেছি, যাতে জমি নিয়ে কোনো জটিলতার সৃষ্টি না হয়। এর সুবিধা এখন পাচ্ছে দেশের মানুষ।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘রংপুর বিভাগকে অনেকাংশেই ভূমিহীনমুক্ত করা হয়েছে। আমরা সারা দেশকেই ভূমিহীনমুক্ত করার জন্য কাজ করছি। টিসিবির মাধ্যমে পারিবারিক কার্ড করে দিয়েছি, যাতে মানুষ কষ্ট না পায়, যেন স্বল্পমূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারে। দেশের কোনো জায়গা যেন খালি পড়ে না থাকে সে ব্যবস্থা মানুষকেই করতে হবে। আপনারা ফলের গাছ লাগান, ভেষজ গাছ লাগান, বনজ গাছ লাগান, যেসব থেকে আপনারা আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।’
তিনি বলেন, ‘আমরা ওয়াদা করেছিলাম ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দেব। আমরা যে কথা দিয়েছি, সে কথা রেখেছি। এখন ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ।’ বিএনপির আন্দোলন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তারা মানুষ মারার ফাঁদ তৈরি করেছে। তারা ট্রেনে-বাসে আগুন দিচ্ছে। অগ্নিসন্ত্রাস করে তারা আনন্দ পাচ্ছে। তাই সবাইকে সজাগ থাকতে হবে। যারা অগ্নিসন্ত্রাস করবে তাদের ধরে পুলিশে দিতে হবে। জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘২০৪১ সালের মধ্যে আমরা স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ে তুলব। এজন্য সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আর এ উন্নয়ন ধরে রাখতে নৌকা মার্কায় ভোট দিতে হবে।’ সভায় প্রধানমন্ত্রী আগামী সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৬ পীরগঞ্জ আসনের আওয়ামী লীগ প্রার্থী স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীকে মেয়ে পরিচয় দিয়ে তাকে নৌকা মার্কায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে পীরগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে উপজেলা আওয়ামী লীগের আয়োজনে জনসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। পীরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি নুরুল আমিন রাজার সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক এএসএম তাজিমুল ইসলাম শামীমের সঞ্চালনায় সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে নৌকার প্রার্থী ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী। আরও বক্তব্য রাখেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাদ্দাম হোসাইন, জেলা যুবলীগের সভাপতি লক্ষিন চন্দ্র, সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান সিদ্দিকী রনি প্রমুখ।
জনসভায় যোগ দিতে পীরগঞ্জের পার্শ্ববর্তী নবাবগঞ্জ, পলাশবাড়ী, সাদুল্লাপুর, ঘোড়াঘাটসহ কয়েকটি উপজেলা ছাড়াও পীরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকরা মিছিল নিয়ে আসেন। পীরগঞ্জে জনসভা শেষে স্থানীয় অডিটরিয়ামে দলীয় নেতাকর্মী ও জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করে সড়কপথে সৈয়দপুরের উদ্দেশে রওনা দেন তিনি।
পাঁচ বছর পর শ্বশুরবাড়ি গেলেন পুত্রবধূ : পাঁচ বছর পর গতকাল শ্বশুরবাড়ি গেলেন পীরগঞ্জের পুত্রবধূ বঙ্গবন্ধুকন্যা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণার অংশ হিসেবে শ্বশুরবাড়ি পীরগঞ্জের জয়-সদনে গিয়েছিলেন তিনি। তারাগঞ্জ জনসভা ও মিঠাপুকুরের জায়গীরে পথসভা শেষে নিজ বাড়িতে যান তিনি। শ্বশুর-শাশুড়ি ও প্রয়াত স্বামী এমএ ওয়াজেদ মিয়ার কবর জিয়ারত করে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটান পুত্রবধূ। এরপর জোহরের নামাজ সেরে ও দুপুরের খাবার খেয়ে পীরগঞ্জ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠের জনসভায় অংশ নেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শ্বশুরবাড়িতে পছন্দের খাবার খেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পৌর মেয়র এএসএম তাজিমুল ইসলাম শামীম।
ভাশুরপুত্র শামীম বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর শ্বশুরবাড়িতে আসাটা ছিল আমাদের জন্য আনন্দের ব্যাপার। পরিবারের মানুষ পরিবারে এসেছিলেন, এটা আনন্দের ও গর্বের বিষয়। ঈদের আনন্দের মতো মনে হচ্ছিল। তিনি বাড়িতে বিশ্রাম নিয়েছেন। সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করেছেন। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আনন্দে মেতেছিলেন তিনি।’
শ্বশুরবাড়িতে আগমন কেন্দ্র করে রাস্তাঘাট মেরামত করা হয়েছে। কাঁচা রাস্তা কার্পেটিং করা হয়েছে। রাস্তার ডিভাইডারে সাদা চিহ্ন দিয়েছে উপজেলা এলজিইডি অফিস। বাড়িতে ধোয়ামোছা করে নতুন রূপে বধূবরণ করেছে জয়-সদন। এর আগে ২০১৮ সালের ২৩ ডিসেম্বর শ্বশুরবাড়িতে এসেছিলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে পীরগঞ্জের ফতেহপুরে নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছিল।
তারাগঞ্জে পথসভা : তারাগঞ্জ পথসভায় আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে স্বাধীনতা পেয়েছেন। নৌকায় ভোট দিয়ে উত্তরবঙ্গ মঙ্গার পীড়ন থেকে মুক্তি পেয়েছে। এখন উন্নয়নের সুবাতাস বইছে। নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছেন বলে চিকিৎসাসেবা দোরগোড়ায় পৌঁছেছে, মানুষের জীবনমান উন্নত হয়েছে। একমাত্র নৌকা মার্কা ক্ষমতায় থাকলেই এ দেশের উন্নতি হবে। তাই আগামী নির্বাচনে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আমাদের আরেকবার আপনাদের সেবা করার সুযোগ দেবেন।’
রংপুরের পীরগঞ্জে নির্বাচনী জনসভায় যাওয়ার পথে তারাগঞ্জের পথসভায় তিনি ১৭ মিনিটের ভাষণে এসব কথা বলেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা থেকে বিমানে সৈয়দপুর বিমানবন্দরে আসেন। সেখান থেকে বেলা ১১টা ৫০ মিনিটে তারাগঞ্জ সরকারি কলেজ মাঠে রংপুর-২ আসনের আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী আবুল কালাম মো. আহসানুল হক চৌধুরীর নির্বাচনী পথসভার মঞ্চে ওঠেন। দুপুর ১২টা ১২ মিনিটে তিনি বক্তব্য শুরু করে ১২টা ২৯ মিনিট পর্যন্ত ভাষণ দেন।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, পীরগঞ্জ আসার পথে মিঠাপুকুর উপজেলায় রংপুর-৫ আসনের নৌকার প্রার্থী রাশেক রহমানের একটি নির্বাচনী পথসভায়ও বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী।