দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রতীক বরাদ্দ হয়েছে ১৮ ডিসেম্বর। ইতিমধ্যে প্রতীকসংবলিত পোস্টারে ছেয়ে গেছে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ। পোস্টার-ব্যানারের বেশিরভাগই নিষিদ্ধ পলিথিনে মোড়া। পাড়া-মহল্লা, চায়ের দোকান, অফিস-আদালত সব জায়গাতেই প্লাস্টিকে মোড়া পোস্টার। পরিবেশবাদীরা বলছেন, প্লাস্টিকের কারণে পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যারা উন্নত দেশ গড়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, তারাই এ কাজ করছেন। বিষয়টি হতাশাজনক।
তবে নির্বাচন কমিশন বেশ তৎপর! প্রচার-প্রচারণার মধ্যভাগে তারা নড়েচড়ে বসেছে। নির্বাচনে প্লাস্টিক-পলিথিন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে ইসি।
গত সোমবার ইসির উপসচিব মো. আতিয়ার রহমানের ইস্যু করা নির্দেশনায় বলা হয়েছে, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিবেশবান্ধব ও বর্জ্যবর্জিত (গ্রিন) রাখার লক্ষ্যে প্রার্থীরা নির্বাচনী কার্যক্রমে বর্জ্য উৎপাদন কমানো বা নিরুৎসাহিত করা, প্রচারপত্রে প্লাস্টিকজাত দ্রব্য বা পলিথিনের আবরণের ব্যবহার কিংবা প্লাস্টিকের ব্যানারের (পিভিসি ব্যানার) ব্যবহার বন্ধ করার ব্যবস্থা নেবেন।’
দেশে প্লাস্টিকের উৎপাদন ও ব্যবহারের ধরন নিয়ে গবেষণা করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ক বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় তিন হাজার কারখানায় প্লাস্টিক ও পলিথিন তৈরি হয়। এসব কারখানায় দিনে ১ কোটি ৪০ লাখ পলিথিনের ব্যাগ উৎপাদিত হয়। নির্বাচন বা উৎসব এলে উৎপাদন কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
গবেষণা সংস্থা ক্যাপসের নির্বাহী পরিচালক কামরুজ্জামান মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতি বছরই আমরা পলিথিন উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করি। তাতে দেখা যায়, প্রতি পোস্টারে ১০-১৯ গ্রাম পলিথিনের লেমিনেশন থাকে। পলিথিনের স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে প্রার্থীরা ভালোভাবেই ওয়াকিবহাল। তাদের কাছ থেকে এটা আমাদের আশা ছিল না। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছে আমাদের অনুরোধ থাকবে, এমন নির্দেশনা দেওয়া হোক, যাতে নির্বাচনের পর প্রার্থীরা নিজেরাই টানানো পোস্টার সরানোর ব্যবস্থা করেন। না সরালে তাদের বিরুদ্ধে আর্থিক জরিমানাসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’
বাপার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও ওয়াটার্স কিপার বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরিফ জামিল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটা পলিথিন পচতে সময় লাগে ৩০০-৪০০ বছর। যারা নির্বাচনী প্রচারে প্লাস্টিকের ব্যবহার করেন, তারা যে জনস্বার্থে কাজ করছেন না তার প্রমাণ পোস্টারে পলিথিনের ব্যবহার। তাদের কাছে জনস্বার্থ মুখ্য বিষয় নয়।’
তিনি বলেন, ‘শুধু নির্দেশনা দিলেই হবে না। নির্দেশনা মাঠে কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে, সেটাও দেখার বিষয়। এখন পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রশাসন বা দপ্তরকে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি।’
পরিবেশ সংরক্ষণ আন্দোলনকারীরা বলছেন, ‘আগে থেকেই প্রার্থীদের সতর্ক করা উচিত ছিল নির্বাচন কমিশনের। বেশিরভাগ প্রার্থী ইতিমধ্যে পোস্টার-ব্যানার ছাপিয়ে ফেলেছেন। পরিবেশ অধিদপ্তর পলিথিনের ব্যাগ নিষিদ্ধ করেছে। অধিদপ্তরের চোখের সামনেই নির্বাচনী প্রচারে প্লাস্টিক-পলিথিন ব্যবহৃত হচ্ছে। এমন ব্যবহার দেখে প্রশ্ন জাগাই স্বাভাবিক নির্বাচনী বিধিমালায় পলিথিন জাতীয় দ্রব্যের ব্যবহারে অনুমতি আছে কি না?
পলিথিনে মোড়া পোস্টারের বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (মনিটরিং অ্যান্ড এনফোর্সমেন্ট) মোহাম্মাদ মাসুদ হাসান পাটোয়ারী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণায় পলিথিন বা প্লাস্টিক ব্যবহার করা যবে না। তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাইনি।’
অভিযোগ না পেলে কি পরিবেশ অধিপ্তরের মনিটরিং থাকে না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি ছুটিতে ছিলাম, আগামী কাল (বুধবার) ডিজি মহোদয়ের সঙ্গে আলোচনা করব।’
২০০২ সালে সরকার পলিথিন শপিং ব্যাগের উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রি, বিক্রির জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। পরিবেশ অধিদপ্তর পলিথিনের ব্যবহার বিষয়ে ২০১২ সালের ৩০ এপ্রিল গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে উল্লেখ করা হয়, পলিথিনের ব্যাগ বিভিন্নরূপে ব্যবহৃত হচ্ছে। এটা সরকারি আদেশের লঙ্ঘন এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। ২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি পরিবেশ রক্ষায় নির্বাচনে পলিথিনে মোড়ানো পোস্টার তৈরি ও ব্যবহার বন্ধের নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট।
পলিথিন বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও নির্বাচন উপলক্ষে ফকিরাপুলের প্রেসপাড়ায় বেড়ে গেছে পলিথিনের ব্যবহার। ব্যবসায়ী শাহিন আলম বলেন, ‘বৃষ্টি ও কুয়াশা থেকে পোস্টার বাঁচাতে অনেকেই লেমিনেটিং করা পোস্টারের অর্ডার দিচ্ছেন। কেউ কেউ আলাদা করে পলিথিন নিয়ে যাচ্ছেন।’
ঢাকা-৭ আসন ঘুরে দেখা গেছে লক্ষ্মীবাজার, বাহাদুর শাহ পার্ক, শাঁখারীবাজার, চকবাজার, বাংলাবাজার পর্যন্ত পুরো সড়কে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে প্লাস্টিকে মোড়ানো পোস্টার। কিছু পোস্টার মিশেছে গৃহস্থালি বর্জ্যরে সঙ্গে। এসব পোস্টারের বেশিরভাগই নৌকার প্রার্থী মোহাম্মাদ সোলায়মান সেলিমের।
একই অবস্থা ঢাকা-৬ আসনে। এই আসনের ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, সূত্রাপুর, বংশাল ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তার দুই ধারে রশিতে টানানো পলিথিনে মোড়ানো পোস্টার। শুধু তা-ই নয়, সড়কের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে টানানো হয়েছে প্লাস্টিকে তৈরি ব্যানার। ৮০ ভাগ পোস্টার-ব্যানারই নৌকার প্রার্থী সাঈদ খোকনের।
পলিথিনে মোড়ানো পোস্টার থেকে বাদ যায়নি ঢাকা-১০ আসনও। এই আসনের বিভিন্ন স্থান ঘুরে দেখা গেছে, আওয়ামী লীগের প্রার্থী চিত্রনায়ক ফেরদৌসের বেশিরভাগ পোস্টার পলিথিনে মোড়ানো।
এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন কী ব্যবস্থা নিচ্ছে জানতে চাইলে ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে এ বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছি। পলিথিনে মোড়ানো পোস্টার সরাতে হবে। নতুন করে এ ধরনের কোনো পোস্টার-ব্যানার টানানো যাবে না। যারা নির্দেশ অমান্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’