নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী গোলাম দস্তগীর গাজীর বিরুদ্ধে ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও মারধর এবং নির্বাচনী আচরণবিধি ভঙ্গের অভিযোগ তুলেছেন ওই আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. শাহজাহান ভূঁইয়া। গতকাল বুধবার প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) কাছে এ সংক্রান্ত অভিযোগপত্র জমা দিয়েছেন তিনি।
রূপগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজাহান ভূঁইয়া অভিযোগপত্রের সঙ্গে ‘প্রচারে বাধাদানকারীদের’ একটি তালিকাও পাঠিয়েছেন।
অভিযোগপত্রে শাহজাহান ভূঁইয়া বলেন, ‘আমি মো. শাহজাহান ভূঁইয়া নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) নির্বাচনী আসনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কেটলি প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিয়েছি। নির্বাচন কমিশনের দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী গত ১৮ ডিসেম্বর থেকে জনসাধারণের মধ্যে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আমিও প্রচারণায় অংশগ্রহণ করি। এ আসনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত নৌকা প্রতীকে অংশগ্রহণ করছেন গোলাম দস্তগীর গাজী। তিনি গত প্রায় এক যুগ ধরে রূপগঞ্জে সংগঠিত সন্ত্রাসীদের দিয়ে ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার প্রায় দুই শতাধিক পোষ্য সন্ত্রাসীর নামে জমি দখল, গুম, খুন, ধর্ষণসহ গুরুতর সব অপরাধের দায়ে থানায় অসংখ্য মামলা রয়েছে। নির্বাচন-পূর্ব সময়ে এসব সন্ত্রাসী কিছুটা লোকচক্ষুর আড়ালে ছিল। কিন্তু নির্বাচন উপলক্ষে গোলাম দস্তগীর গাজীর সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) এমদাদুল হক ওরফে দাদা এমদাদ এসব সন্ত্রাসীকে প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছেন। তার সরাসরি ছত্রছায়ায় তারা আমার নির্বাচনী কাজে অংশ নেওয়া কর্মী ও শুভাকাক্সক্ষীদের হুমকি, ভয়ভীতি ও মারধর করছে। এমনকি রূপগঞ্জের বীর মুক্তিযোদ্ধারা গত ২৫ ডিসেম্বর আমার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিলে ওইসব সন্ত্রাসীর হাতে তারা মারধরের শিকার হয়। এ ঘটনায় স্থানীয় থানায় তারা মামলা করে এবং ওইদিন একটি সংবাদ সম্মেলনও করেন। ২৬ ডিসেম্বর ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একটি সংবাদ সম্মেলন করেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধারা। অভিযুক্ত সন্ত্রাসী শমসের বাহিনীর প্রধান ডাকু শমসের এখনো পর্যন্ত গ্রেপ্তার হননি, গাজীর বাড়িতেই তিনি অবস্থান করছেন, পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করছে না। কোনো এক অজানা রহস্যের কারণে গাজীর অবৈধ তদবিরের বিনিময়ে বারবার গ্রেপ্তার হলেও আবার বেরিয়ে এসে আগের চেয়ে আরও নিষ্ঠুর সন্ত্রাসী আচরণ করে মানুষের সঙ্গে এ ডাকু শমসের।’
সিইসিকে দেওয়া অভিযোগপত্রে কেটলি প্রতীকের এই প্রার্থী বলেন, ‘মুড়াপাড়া ইউনিয়নের কুখ্যাত সন্ত্রাসী শেখ ফরিদ ভুয়া মাসুম ওরফে টাকি মাসুম গত ২৫ ডিসেম্বর প্রকাশ্যে জনসম্মুখে নৌকা প্রতীকে ভোট না দিলে বাড়ির পানি বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বন্ধের হুমকি দেয়, তার বিরুদ্ধে স্থানীয় থানায় মাদক, অস্ত্র, লুটপাট ও চাঁদাবাজির বেশ কিছু মামলা রয়েছে। রূপগঞ্জে ভোটারদের মারধর, ঘরবাড়ি লুটপাট, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, হুমকি ও ভয়ভীতির ঘটনা এখন ওপেন সিক্রেট বিষয়। রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভোটাররা আমার নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিলেও প্রশাসনিক সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না। উল্টো কেউ এসবের প্রতিবাদ করতে গেলে সন্ত্রাসীদের রোষানলে পড়তে হচ্ছে। রূপগঞ্জের চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্র এলাকার হাসমত দয়ালের ছেলে শমসের আলী খান ওরফে ডাকু শমসের সন্ত্রাসী কর্মকা-ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এই শমসেরের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদকের কারবারসহ একাধিক মামলা রয়েছে। নির্বাচনের আগেই রূপগঞ্জ থানায় হওয়া ১৩টি মামলার আসামি এই ডাকু শমসের। সে আমার নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেওয়া ভোটারদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। গোলাম দস্তগীর গাজীর পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিতে সাধারণ মানুষদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বাধ্য করছে। প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্র হাতে নিয়ে ভোটারদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে।’
শাহজাহান ভূঁইয়া তার অভিযোগপত্রে বলেন, ‘মুড়াপাড়া ইউনিয়নের মাছিমপুর এলাকায় সোনারগাঁ উপজেলার আফসার উদ্দিনের ছেলে তাওলাদ একজন শীর্ষ সন্ত্রাসী, সোনারগাঁ এলাকায় জোড়া খুনের মামলার আসামি ছিল এই তাওলাদ। মুড়াপাড়া এলাকার মাছিমপুর গ্রামে বিবাহের কারণে এই এলাকায় সে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য প্রতিষ্ঠা করেছে। মন্ত্রী গাজীর এপিএস আন্ডারওয়ার্ল্ডের ডন এমদাদের লোক হিসেবে সে কাউকে তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্য দিবালোকে অস্ত্রের মহড়া দিয়েছে, যা ইতিমধ্যেই সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। তার নামে সোনারগাঁ থানায় এবং রূপগঞ্জ থানায় একাধিক খুন, ধর্ষণ, মাদকের কারবারসহ মামলা রয়েছে।’
সিইসিকে দেওয়া ওই অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ‘একই এলাকার জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে যার দাদা শান্তি কমিটির সদস্য ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময়, শেখ ফরিদ ভূঁইয়া মাসুম ওরফে টাকি মাসুম নানা সন্ত্রাসী কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত। চাঁদাবাজি ও হত্যার হুমকির দায়ে রূপগঞ্জ থানায় তার নামে রয়েছে চারটি মামলা। কালাদী গ্রামের সুরুজ মিঞা মুন্সির ছেলে মোহাম্মদ আলী হোসেন ওরফে আলী বান্দা মন্ত্রীর এপিএস এমদাদের ছত্রছায়ায় একইভাবে ভোটারদের এবং আমার পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণকারী নেতাকর্মীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে।’
শাহজাহান ভূঁইয়া তার অভিযোগপত্রে বলেন, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে মুড়াপাড়া ইউনিয়নের আরেক সন্ত্রাসী জগতের ডন তোফায়েল আহমেদ আলমাস প্রকাশ্য দিবালোকে সাধারণ মানুষদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে সন্ত্রাসী কায়দায় নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছে, কেউ ভোট না দিলে গুম-খুনের হুমকি দিচ্ছে। এই কুখ্যাত ও শীর্ষ সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে রূপগঞ্জ থানায় একাধিক হত্যা, চাঁদাবাজির মামলা রয়েছে। কিছুদিন আগেও এক ছাত্রলীগ নেতাকে কুপিয়ে হত্যা এবং এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় তাকে প্রধান আসামি করে থানায় মামলা হয়েছিল। রূপগঞ্জ থানায় তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু হত্যা মামলা রয়েছে।’
এতে আরও বলা হয়, ‘মাছিমপুরের আরেক অন্ধকার জগতের ডন, মাদক কারবারি, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজি ও হত্যার হুমকিদাতা মোহাম্মদ মামুন মিয়া। তার বিরুদ্ধেও রূপগঞ্জ থানায় রয়েছে বেশ কিছু মামলা। তিনি তার নিজ এলাকার কোনো ভোটার যাতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ না নিতে পারে, তাদের প্রতিনিয়ত হুমকি দিচ্ছে। সে রূপগঞ্জ থানায় এফআইআর নম্বর ২১ জুলাই, ২০২১ ইং তারিখে করা অস্ত্র আইনে এজাহারভুক্ত আসামি।’
শাহজাহান ভূঁইয়া তার অভিযোগপত্রে বলেন, ‘মাছিমপুরের মাদক কারবারি, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী, লুটপাট, চাঁদাবাজি, হত্যার হুমকিদাতা এবং ইয়াবা কারবারি আরেক ডনের নাম মো. রনি মিয়া। রূপগঞ্জ থানায় এজাহারভুক্ত আসামি এই রনি। রূপগঞ্জ থানার মিরকুটিরছেও এলাকার ভোটার ও নির্বাচনী কাজে অংশ নেওয়া কর্মীদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে এবং প্রচারণা কাজে বাধা দিচ্ছে এই সন্ত্রাসী মাদক কারবারি রনি। তার বাধা উপেক্ষা করে যদি কেউ কেটলি মার্কায় আমার নির্বাচনী কার্যে অংশ নেয় তাহলে তার বাড়িঘরে হামলা করে পুড়িয়ে ফেলবে বলে সরাসরি হুমকি দিচ্ছে এই রনি।
মাছিমপুর এর আরেক ব্রাসের নাম আব্দুল হামিদ। চলতি বছর জুন মাসের ৪ তারিখে তার কাছ থেকে পুলিশ অবৈধ অস্ত্র ও গুলি এবং চাইনিজ কুড়াল ও লোহার পাইপ জব্দ করে। সেও মাছিমপুর এলাকার সাধারণ ভোটারদের বিভিন্নভাবে হুমকি ধামকি দিচ্ছে। প্রতিনিয়ত এসব সংকট ও সন্ত্রাসীদের শক্তি মোকাবেলা করে আমাকে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিতে হচ্ছে। এমতাবস্থায় আমার এবং আমার ভোটারদের প্রাণনাশের আশঙ্কা রয়েছে। সকল বিষয়গুলো বিবেচনা করে মন্ত্রী গাজীর এপিএস এমদাদুল হক দাদুল ওরফে দাদা এমদাদের নেতৃত্বে থাকা সন্ত্রাসীদের যত দ্রুত সম্ভব আইনের আওতায় এনে ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অবাধ সুষ্ঠু নির্বাচন হিসেবে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হিসেবে সকলের কাছে প্রতিষ্ঠিত করতে একটি লেভেল প্লায়িং পরিবেশ সৃষ্টিকরার জন্য প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে আপনার প্রতি আমি আকুল আবেদন করছি।’