প্রধানমন্ত্রীর সভায় মারামারি একজনের মৃত্যু

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার-প্রচারণা ঘিরে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকা। ভোটগ্রহণের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, প্রচার-প্রচারণায় বাধা, হামলা, হুমকি, কর্মীদের মারধর, নির্বাচনী কার্যালয়ে আগুন, ভাঙচুরসহ সহিংসতার ঘটনা ততই বাড়ছে। এরই ধারাবাহিকতায় এবার বরিশালে আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জনসভার মাঠে দলের দুই নেতার সমর্থকদের মধ্যে মারামারিতে প্রাণ গেছে একজনের। এ সময় আহত হন আরও অন্তত ১৫ জন। গতকাল শুক্রবার দুপুরে নগরীর বঙ্গবন্ধু উদ্যানে শাম্মী আহমেদ ও পঙ্কজ নাথের অনুসারীদের মধ্যে এই সহিংসতার ঘটনা ঘটে।

এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ে আরও সাতটি সংসদীয় আসনে সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ৩৭ জন।  বরিশালে নিহত সিরাজ সিকদার (৫৮) জেলার হিজলা উপজেলার কুড়ালিয়া গ্রামের কোব্বাত সিকদারের ছেলে। দ্বৈত নাগরিকত্বের কারণে বরিশাল-৪ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পাওয়া দলটির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদের প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যায়। অন্যদিকে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন সংসদ সদস্য পঙ্কজ নাথ। গতকাল দুপুর আড়াইটার দিকে বঙ্গবন্ধু উদ্যানের জনসভাস্থলে প্রবেশের সময় পঙ্কজ ও শাম্মী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। পঙ্কজ ও শাম্মী উভয়ের অনুসারীরাই নিহত সিরাজকে নিজেদের কর্মী বলে দাবি করেছেন।

সংঘর্ষে আহত সোহাগ বলেন, ‘মেহেন্দীগঞ্জে আমরা এমপি পঙ্কজ নাথের রাজনীতি করি। মাঠে প্রবেশ করতেই ডা. শাম্মী আহমেদের কর্মীরা আমাদের মিছিলের ওপর হামলা চালিয়ে আমাকেসহ ১৫-১৬ জনকে আহত করেন।’

মেহেন্দিগঞ্জের বদরপুরের মোটরবাইক সমিতির সভাপতি আলী হোসেন বলেন, ‘আমরা পঙ্কজ নাথের ঈগল প্রতীকের মিছিল নিয়ে ব্রিজ পার হয়ে মাঠের মধ্যে ঢুকেছি, তখন কাছাকাছি ছিল শাম্মী আহমেদের লোকজন। তারা প্রথমে আমাদের বোতল নিক্ষেপ করে এবং পরে ফেস্টুনের সঙ্গে থাকা লাঠি দিয়ে এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।’

তবে শাম্মী আহমেদের অনুসারীরা বলছেন, পঙ্কজ নাথের লোকজনের হামলায় আঘাত পেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন সিরাজ সিকদার।

শাম্মীর অনুসারী হিজলা উপজেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, ‘সিরাজ সিকদার জনসভায় আমাদের সঙ্গেই আসেন। তিনি গুয়াবাড়িয়া ৬ নম্বর ওয়ার্ড কৃষক লীগের সভাপতি। পঙ্কজ নাথের লোকজন জনসভাস্থলে আসার পর হাতাহাতি-মারামারির ঘটনা ঘটে। আমরা যেটুকু জানতে পেরেছি, তার (সিরাজ) গায়ে আঘাত লাগে এবং তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে হাসপাতালে আনার পর তার মৃত্যু হয়।’

কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আরিচুল হক বলেন, ‘মৃত সিরাজকে যিনি হাসপাতালে নিয়ে এসেছেন তিনি জানিয়েছেন যে সিরাজ জনসভার মাঠে অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, সিরাজ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. কবির উদ্দিন জানান, ‘একজনকে নিয়ে এসেছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করছি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে। তবু সন্দেহের কারণে আমরা মরদেহ মর্গে পাঠিয়েছি। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে।’

এ বিষয়ে পঙ্কজ নাথ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিহত সিরাজ মেহেন্দিগঞ্জ থেকে আমাদের লঞ্চ রাজহংস-১০-এ করে বরিশালে এসেছেন। তিনি আমার কর্মী।’

অন্যদিকে শাম্মী আহম্মেদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের কোনো লোক পঙ্কজ নাথের সঙ্গে নেই। আওয়ামী লীগের সবাই ঐক্যবদ্ধ। আমাদের ওপর হামলা হয়েছে। এতেই সিরাজ নিহত হয়েছেন।’

গত ১৮ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দ শেষে আনুষ্ঠানিক প্রচার-প্রচারণা শুরুর পর এ নিয়ে নির্বাচনী সংঘাতে চারজনের প্রাণ গেল। এর আগে হামলা-মারধরে পিরোজপুর, ময়মনসিংহ ও মাদারীপুরে প্রাণ গেছে তিনজনের। সব মিলিয়ে ভোট উৎসব ছাপিয়ে সংঘাত-সংঘর্ষের বিষয়টি এখন আলোচনায়।

পাবনা-১ আসনের সাঁথিয়ায় ট্রাক মার্কা প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী অধ্যাপক আবু সাইয়িদের প্রচারমিছিলে আবারও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্ট বেড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আবদুর রশিদ দুলালসহ অন্তত ১০ জন আহত হয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় সাঁথিয়া পৌর শহরে এ ঘটনা ঘটে।

গোপালগঞ্জ-১ আসনের মুকসুদপুরে নৌকা ও ঈগল প্রতীকের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে নারীসহ ২০ জন আহত হয়েছেন। এ সময় ৩ দোকান এবং ৮টি বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট হয়। গতকাল সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ঘণ্টাব্যাপী উপজেলার মোচনা ইউনিয়নের শুয়াশুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।

গাজীপুর-২ আসনে ট্রাক প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা বীর মুক্তিযোদ্ধা কাজী আলিম উদ্দিন বুদ্দিনের পক্ষে হ্যান্ডবিল বিতরণের সময় মো. বোরহান উদ্দিনকে নৌকার কয়েকজন কর্মী মারধর করেন। তাকে টঙ্গী আহসান উল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। গতকাল দুপুরে টঙ্গী পশ্চিম থানাধীন হাজি মাজার বস্তিসংলগ্ন হাজি সৈয়দ শাহ মসজিদসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

বগুড়া-৩ (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া) আসনে আলমিরা প্রতীকের প্রার্থী ক্যাপ্টেন জাকারিয়া হোসেনের পোস্টার আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গতকাল দুপুরে নির্বাচনী ক্যাম্পের সামনে টাঙানো আলমিরা প্রতীকের পোস্টারে আগুন ধরিয়ে দেয় দুর্বৃত্তরা।

স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করায় ইউপি চেয়ারম্যানকে দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন কুমিল্লা-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর লোকজন। গতকাল সন্ধ্যায় নৌকা প্রার্থীর পথসভায় উপস্থিত সাংবাদিক ও এলাকাবাসীর কাছে এই অভিযোগ করেন দাউদকান্দি উপজেলার বারপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মাজারুল ইসলাম মানিক।

নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনে নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহকালে এটিএন বাংলার সাংবাদিকদের বহনকারী মাইক্রোবাস ও ক্যামেরা এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী মিনহাজ আহমেদ জাবেদের প্রচার গাড়িতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। গতকাল সন্ধ্যা ৭টার দিকে উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়নের গাবুয়া বাজারে এ ঘটনা ঘটে। এতে এটিএন বাংলার ঢাকা অফিসের প্রতিবেদক নাজিবুর রহমান, ক্যামেরাপারসন এহসানুল গনি স্বজন ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকসহ অন্তত ৫ জন আহত হন।

ফরিদপুর-৩ সদর আসনে নৌকার প্রার্থী শামীম হকের দুটি নির্বাচনী ক্যাম্পে আগুন দেওয়া হয়েছে। সদর উপজেলার মাচ্চর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে এবং পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডে নৌকার ওই দুটি ক্যাম্পে আগুন দেওয়া হয়। গত বৃহস্পতিবার রাতের যেকোনো সময় আগুন দেওয়া হয়। আগুনে ক্যাম্পের চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র পুড়ে যায়।

সংশ্লিষ্ট জেলা-উপজেলার প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্যে প্রতিবেদনটি তৈরি