প্রাইভেটাইজেশনের পথে হাঁটছে চট্টগ্রাম বন্দর। ইতিমধ্যে সৌদি আরবের রেড-সি গেটওয়েকে ২২ বছরের চুক্তিতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব অর্থায়নে টার্মিনালটি নির্মাণ করেছিল। এ ছাড়া আগামীর বন্দরখ্যাত বে-টার্মিনালটি পুরোপুরি প্রাইভেট বিনিয়োগের দিকে এগোচ্ছে। বে-টার্মিনালে তিনটি টার্মিনালের একটি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং অন্য দুটি টার্মিনাল সিঙ্গাপুরের পিএসএ ইন্টারন্যাশনাল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপিওয়ার্ল্ডকে বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। আগামী জুনে চুক্তি সম্পন্ন হবে।
তবে শেষ মুহূর্তে এসে চট্টগ্রাম বন্দরের আওতায় যে মাল্টিপারপাস টার্মিনালটি নির্মাণ হওয়ার কথা রয়েছে, সেটিও আবুধাবির একটি কোম্পানি নির্মাণের কথা চলছে। অন্যদিকে বে-টার্মিনালে আরও একটি নতুন টার্মিনাল করা হবে, যা অয়েল অ্যান্ড গ্যাস টার্মিনাল হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এই টার্মিনালেও দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে বিনিয়োগ করবে।
শুধু বে-টার্মিনাল ও পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনালই নয়, পতেঙ্গার লালদিয়ার চরে বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ শিপিং কোম্পানি ডেনমার্কের এপি-মুলার মায়ের্সকের বিনিয়োগেরও প্রস্তাব পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, লালদিয়ায়ও বিদেশি কোম্পানির বিনিয়োগে টার্মিনাল হচ্ছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আওতায় সবচেয়ে কার্যকর টার্মিনাল বলে খ্যাত নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) এবং চিটাগাং কনটেইনারর টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশি কোম্পানির কাছে পরিচালনার বিষয়ে কার্যক্রম চলছে। ফলে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের আওতায় থাকছে শুধু জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি)। চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রতিবছর গড়ে তিন মিলিয়নের বেশি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়ে থাকে। এখন যদি প্রায় শতভাগ বিদেশি কোম্পানির কাছে টার্মিনাল চলে যায়, তাহলে চট্টগ্রাম বন্দরের হাতে কী থাকছে?
এই প্রশ্নের জবাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম সোহায়েল সম্প্রতি সংবাদকর্মীদের সঙ্গে আলোচনায় বলেন, ‘নিরাপত্তা ও চ্যানেল (জাহাজ চলাচলের পথ) বন্দরের আওতায় থাকবে। জাহাজের বার্থিংয়ের নিয়ন্ত্রণও আমাদের হাতে থাকবে। তাই কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগামীতে বন্দর নির্মাণ ও পরিচালনায় দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা) বিনিয়োগ আসছে। এর মধ্যে শুধু বে-টার্মিনালেই বিনিয়োগ হবে আট বিলিয়ন ডলার। বাকি বিনিয়োগ আসছে মায়ের্সক ও সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ের মাধ্যমে। ইতিমধ্যে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার জন্য রেড সি গেটওয়ের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে এবং আগামী দুই মাসের মধ্যে টার্মিনালটি চালু করবে।’
তবে চট্টগ্রাম বন্দরের সব টার্মিনাল এভাবে প্রাইভেটেজাইশনের দিকে চলে যাওয়াটা ভালো চোখে দেখছেন না অর্থনীতিবিদ ড. মঈনুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বরাদ্দ দেওয়া ভালো, এতে আমাদের দক্ষতা বাড়বে। কিন্তু কিছু নিজেদের আওতায় রাখা যেত। আগে বে-টার্মিনালের একটি মাল্টিপারপাস টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ নির্মাণ করার কথা ছিল, এখন সেটিও আবুধাবি করবে বলে শুনছি। তবে এ বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। দেখা যাক কি হয়।’
এদিকে চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি ও সিসিটি কনটেইনার টার্মিনাল দীর্ঘদিন ধরে হ্যান্ডলিং করে আসছে সাইফ পাওয়ার টেক। প্রাইভেটাইজেশনের বিষয়ে সাইফ পাওয়ার টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন বলেন, ‘দেশে অবশ্যই বিদেশি কোম্পানির আসা প্রয়োজন আছে। তবে এসব বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে দেশীয় কোম্পানিগুলোকেও কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। অন্যথায় দেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্বের প্রায় সব দেশেই বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে দেশীয় কোম্পানি যৌথভাবে কাজ করে। এতে প্রযুক্তি স্থানান্তর হয় এবং দেশীয় কোম্পানিগুলো দক্ষ হয়ে ওঠে। আমাদের বন্দর সেক্টরেও এমন হওয়া প্রয়োজন।’
চট্টগ্রাম বন্দর এত দিন টুলস পোর্ট (ভূমি, টার্মিনাল ও ইক্যুইপমেন্ট ছিল বন্দর কর্তৃপক্ষের, পরিচালনা করেছে প্রাইভেট কোম্পানি) হিসেবে কাজ করেছে। এখন ল্যান্ড লর্ড পদ্ধতিতে (কর্তৃপক্ষ শুধু ভূমি দেবে বন্দর নির্মাণ, ইক্যুইপমেন্ট কেনা ও পরিচালনা করবে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান, কর্তৃপক্ষকে শুধু বার্ষিক রাজস্ব দেবে) প্রবেশ করছে চট্টগ্রাম বন্দর।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সাবেক সদস্য (প্রশাসন ও পরিকল্পনা) জাফর আলম বলেন, ‘বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগ ছাড়া গতি নেই। ব্যবসা অবশ্যই প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান করবে। বিশ্বজুড়ে তা চলে আসছে। এখন প্রশ্ন হলো বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা দেশীয় প্রতিষ্ঠান কত শতাংশ রাখব? অথবা আদৌ রাখব কি না? যেহেতু কনটেইনার পরিচালনায় আমাদের একটি জনশক্তি তৈরি হয়েছে, তাই আগামীর দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে দেশীয় কোম্পানিগুলোকে রাখা যায়।’
এদিকে কার্গো ও কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের পাশাপাশি বে-টার্মিনালে নতুন একটি অয়েল ও গ্যাস টার্মিনাল হতে যাচ্ছে। এই টার্মিনাল নির্মাণের জন্য চট্টগ্রাম বন্দরকে প্রস্তাবনা দিয়েছে ইস্ট কোস্ট গ্রুপের ইসি হোল্ডিংস লিমিটেড। এখানেও দেশীয় অর্থায়নের পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ থাকছে। চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনালে অয়েল ও গ্যাস সেক্টরে ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে ইস্ট কোস্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী বলেন, ‘আমরা দেশের তেল ও গ্যাস সেক্টরে বিনিয়োগের জন্য প্রস্তাবনা দিয়েছি। এভাবে প্রায় সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হবে। এখন তো চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ছে, আমরা দেশীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে সেখানে বিনিয়োগ করতে চাই।’
বন্দর-সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ‘আজকে ভারত কিন্তু বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌথভাবে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে। এতে ভারতে কোল মাইনিং, শিপিংসহ বিভিন্ন সেক্টরে দক্ষ জনশক্তি গড়ে উঠেছে। এমনকি বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের দরপত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দেশি প্রতিষ্ঠানকে রাখার একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়।’
সার্ভিস পোর্ট, টুলস পোর্ট ও ল্যান্ড লর্ড পোর্ট
যে বন্দরের সব খরচ ও আয় সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়, সেসব বন্দরকে সার্ভিস পোর্ট বলা হয়ে থাকে। বর্তমানে মোংলা বন্দর ও পায়রা বন্দর সার্ভিস পোর্ট। চট্টগ্রাম বন্দরও একসময় সার্ভিস পোর্ট ছিল। ১৮৮৭ সালের ২৫ এপ্রিল চট্টগ্রাম বন্দর প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৯১ সালে জেটিতে ক্রেন যুক্ত করা, ২০০৭ সালে নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও ইক্যুইপমেন্ট সংযুক্তির মাধ্যমে টুলস পোর্টে প্রবেশ করেছিল চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। আর তখন থেকেই স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে এগিয়ে চলে চট্টগ্রাম বন্দর। বন্দরের সব উন্নয়ন কার্যক্রমও নিজস্ব অর্থায়নে হয়ে আসছে। সর্বশেষ পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের জন্য অধিগ্রহণকৃত ভূমির মূল্য পরিশোধ, বে-টার্মিনালের ভূমির অধিগ্রহণকৃত মূল্য চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব খাত থেকেই খরচ করা হয়েছে। টুলস পোর্ট হিসেবে নিজেদের অবস্থান মজবুতকরণের পর বিশে^র আধুনিক বন্দরগুলোর মতো ল্যান্ডলর্ড পদ্ধতিতে প্রবেশ করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। প্রাইভেট বিনিয়োগকারীরা বন্দর নির্মাণ ও পরিচালনা করবে। বন্দর কর্তৃপক্ষকে চুক্তি অনুযায়ী রাজস্ব দেবে। এই প্রাইভেট বিনিয়োগ সরাসরি সরকারিভাবেও হতে পারে অথবা সরকারের পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমেও হতে পারে। চট্টগ্রাম বন্দর এখন এই ল্যান্ডলর্ড পদ্ধতিতে প্রবেশ করছে।
উল্লেখ্য, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি রপ্তানি-বাণিজ্য সম্পাদিত হয়ে থাকে। ইতিমধ্যে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। এখন শুরু হবে বে-টার্মিনালের নির্মাণ কার্যক্রম। নগরীর পতেঙ্গা-হালিশহর সমুদ্র উপকূলের বিস্তীর্ণ জায়গায় গড়ে তোলা হচ্ছে বে-টার্মিনাল। এটি নির্মিত হলে জোয়ার-ভাটা প্রভাবিত ছাড়াই জাহাজ ভিড়তে পারবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে জাহাজ ভিড়তে হলে জোয়ারের ওপর নির্ভর করতে হয়।