এক পক্ষের লক্ষ্য শুধুই সম্পদ

আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ৩০০ আসনে নিবন্ধিত ২৯ দল ও স্বতন্ত্র মিলে ২ হাজার ৭১২ জন্য মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছিলেন। এর মধ্যে বাছাইয়ে টিকেছে ১ হাজার ৯৮৬ জনের মনোনয়ন। কিন্তু এত মানুষ সংসদ সদস্য হতে চান কেন? সংসদ সদস্যদের বেতন কত? তারা আর কী সুবিধা ভোগ করেন? আসলে সংসদ সদস্য হলে শুধু বেতন-ভাতা নয়, তাদের হাতে থাকে নানা ধরনের ক্ষমতা। অনেকে হয়ে ওঠেন নির্বাচনী এলাকার অঘোষিত সম্রাট। বিশ্লেষকরা একে অসুস্থ প্রতিযোগিতা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

সংবিধানের ৬৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘সংসদের আইন দ্বারা কিংবা অনুরূপভাবে নির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি কর্তৃক আদেশের দ্বারা যেরূপ নির্ধারিত হইবে, সংসদ সদস্যরা সেইরূপ (পারিশ্রমিক) ভাতা ও বিশেষ-অধিকার লাভ করিবেন।’ সেই হিসেবে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ‘মেম্বারস অব পার্লামেন্ট (রেমুনারেশন অ্যান্ড অ্যালাউন্সেস) (অ্যামেন্ডমেন্ট) আইন-২০১৬’ অনুসারে সংসদ সদস্যদের বেতন-ভাতা ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়।

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্য মাসিক বেতন পান ৫৫ হাজার টাকা। এ ছাড়া নির্বাচনী এলাকার ভাতা প্রতি মাসে ১২ হাজার ৫০০ টাকা, সম্মানী ভাতা প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা, শুল্কমুক্তভাবে গাড়ি আমদানির সুবিধা, মাসিক পরিবহন ভাতা ৭০ হাজার টাকা, নির্বাচনী এলাকায় অফিস খরচের জন্য প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকা, প্রতি মাসে লন্ড্রি ভাতা ১ হাজার ৫০০ টাকা, মাসিক ক্রোকারিজ, টয়লেট্রিজ কেনার জন্য ভাতা ৬ হাজার টাকা, দেশের অভ্যন্তরে বার্ষিক ভ্রমণ খরচ ১ লাখ ২০ হাজার টাকা, স্বেচ্ছাধীন তহবিল বার্ষিক ৫ লাখ টাকা, বাসায় টেলিফোন ভাতা বাবদ প্রতি মাসে ৭ হাজার ৮০০ টাকা, সংসদ সদস্যদের জন্য সংসদ ভবন এলাকায় এমপি হোস্টেল আছে।

এ ছাড়া একজন সংসদ সদস্য প্রতি বছর ৪ কোটি টাকা থোক বরাদ্দ পাবেন। থোক বরাদ্দের টাকায় তার নিজের পছন্দমতো উন্নয়ন প্রকল্পে খরচ করতে পারেন। তিনি কোন প্রকল্পে এ টাকা খরচ করবেন, সেটি সম্পূর্ণ তার এখতিয়ার। সরকারি খরচে বিদেশ ভ্রমণ, চিকিৎসাসহ আরও অনেক সুবিধা ভোগ করেন।

বিভিন্ন সময় নানা প্রকল্পে প্লট-ফ্ল্যাট বরাদ্দের ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যরা অগ্রাধিকার পেয়েছেন। আগে সংসদ সদস্যদের জন্য রাজধানীতে প্লট বরাদ্দের রেওয়াজ থাকলেও রাজউকের প্লট খালি না থাকায় গত একাদশ সংসদ থেকে তা বন্ধ রয়েছে। এর বাইরে দখল, দুর্নীতি, ব্যাংকঋণ নিয়ে না দেওয়ার অভিযোগ থাকে সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে। ফলে রাতারাতি বনে যান কোটি কোটি টাকার মালিক। গত সংসদের যেসব সংসদ সদস্য এবারও নির্বাচন করছেন, তাদের হলফনামার তথ্য দেখলেও কিছু বিষয় পরিষ্কার হয়। যদিও হলফনামার তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক থাকে অনেক।

আইন অনুযায়ী নির্ধারিত বেতন-ভাতা পাওয়ার পাশাপাশি একজন সংসদ সদস্য তার নির্বাচনী এলাকায় সবচেয়ে ক্ষমতাশালী হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে কাজের বিনিময়ে খাদ্য, বয়স্ক ভাতা, নানা ধরনের সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনীসহ প্রায় ৪০ ধরনের প্রকল্প আছে। এসব প্রকল্প থেকে কারা সুবিধা পাবেন, সেটি স্থানীয় সংসদ সদস্যের সম্মতির ভিত্তিতে হয়ে থাকে। এ ছাড়া এলাকার শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসহ নানা ধরনের প্রতিষ্ঠানে সংসদ সদস্যদের সম্পৃক্ততা থাকে। স্থানীয় পর্যায়ে নিয়োগসংক্রান্ত ক্ষেত্রে অনেক সংসদ সদস্যদের একচ্ছত্র আধিপত্য থাকে। এ ছাড়া স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশের ওপর সংসদ সদস্যদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থাকে।

গত ২৬ ডিসেম্বর দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া নির্বাচনী হলফনামার তথ্যচিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ১৫ বছরে অনেক মন্ত্রী-এমপির সম্পদ বৃদ্ধির চিত্র আলাদিনের চেরাগ পাওয়ার মতোই। টিআইবি দেখিয়েছে বেশি আয়ের প্রার্থীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বছরে কোটি টাকা আয় করেন এ রকম প্রার্থী ২০০৮ সালে ছিল ৪৩, ২০১৩ সালে ৬২ এবং ২০১৮ সালে ১৪৩ জন। এবার তা বেড়ে হয়েছে ১৬৪ জন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন এমন ১৮ প্রার্থীর ১০০ কোটি টাকার বেশি সম্পদ (অস্থাবর সম্পদ মূল্যের ভিত্তিতে) আছে। তাদের ১০ জন আওয়ামী লীগ মনোনীত, ৮ জন স্বতন্ত্র। এই ১৮ জনের মধ্যে সবার ওপরে আছেন গোলাম দস্তগীর গাজী। তিনি বর্তমান বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী। হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, তার সম্পদের (অস্থাবর সম্পদ মূল্যের ভিত্তিতে) মূল্য ১ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকার বেশি।

৫ বছরে ৫০ শতাংশ আয় বেড়েছে ৬০ জন এমপির। ৫০ শতাংশের বেশি অস্থাবর সম্পতি বেড়েছে ৬৭ জনের। শুধু নিজেদের নয়, তাদের স্ত্রী-সন্তানরাও বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছেন। ৫ বছরে স্ত্রী ও নির্ভরশীলদের আয় বেড়েছে ২৪ জনের। আর অস্থাবর সম্পদ বেড়েছে ৪৪ জনের। যেমন চট্টগ্রাম-১৫ আসনের আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিনের স্ত্রী ও নির্ভরশীলদের আয় বেড়েছে ২ হাজার ৪০৯ শতাংশ। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মন্ত্রীদের আয় বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। তথ্যচিত্রে দেখা গেছে, ৫ বছরে আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সম্পদ বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ৬৩ শতাংশ। আয় বেড়েছে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুন্সির, যা ২ হাজার ১৩১ দশমিক ১২ শতাংশ। দলভিত্তিতে নবম সংসদে আওয়ামী লীগের ২৭ শতাংশের কিছু বেশি কোটিপতি ছিল। এবার তা বেড়ে দাঁড়িয়ে ৮২ শতাংশে। গত তিনটি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একক আধিপত্য ছিল; যা তাদের আয় বাড়াতে সাহায্য করেছে।

টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এত সম্পদের পরও অনেক মন্ত্রী-এমপি-প্রার্থী ঋণগ্রস্ত। দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রার্থীদের ২৭ ভাগেরই ঋণ বা দায় আছে। যার পরিমাণ প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। এ থেকে বোঝা যায় ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে ব্যবসা করে টাকা বানানোর চেষ্টা ছিল সংসদ সদস্যদের। যেমন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী এসএকে একরামুজ্জামানের ৪২১ কোটি টাকার সম্পদ থাকলেও তার ঋণ ও দায় রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকার। চারজন প্রার্থী রয়েছেন যাদের শত শত বিঘা জমি রয়েছে। অথচ বাংলাদেশের ভূমি আইন অনুযায়ী, একজন ব্যক্তির সর্বোচ্চ ৬০ বিঘা কৃষিজমি থাকার বিধান রয়েছে।

টিআইবির দেওয়া হলফনামায় দেখা গেছে, ৫ বছরে এমপিদের আয় বেড়েছে ২ হাজার ২৩৮ শতাংশ, ১৫ বছরে ৭ হাজার ১১৬ শতাংশ। ৫ বছরে নির্ভরশীলদের ক্ষেত্রে ২ হাজার ৪০৯ শতাংশ। ৫ বছরে এমপিদের সম্পদ বৃদ্ধির হার ৫ হাজার ৪৭০ শতাংশ, ১৫ বছের এ হার ২ লাখ ৪৫ হাজার ২১৩ শতাংশ। আর ৫ বছরে নির্ভরশীলদের ক্ষেত্রে ৩৮ হাজার ৪২৩ শতাংশ।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনীতিতে একধরনের অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। অনেকে রাজনীতিতে আসাটাকে বিনিয়োগ হিসেবে দেখছে। ফলে ক্ষমতার প্রতিযোগিতা হচ্ছে কিন্তু আদর্শিক প্রতিযোগিতা হচ্ছে না। কীভাবে সম্পদ, ক্ষমতা বিকাশের সুযোগ পাওয়া যায় সেই চেষ্টা হয়। আদর্শিক প্রতিযোগিতা হয় না। এবারের নির্বাচনে দেখেন দলের প্রার্থী আছে, আবার দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীও আছেন। এখানে প্রতিযোগিতা হবে ক্ষমতার। আদর্শগত প্রতিযোগিতা নয়।