প্রভাব পড়বে না যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে : সচিব

শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কারাদন্ডের রায়কে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন। গতকাল বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজ দপ্তরে সাংবাদিকদের প্রশ্নে জবাবে এ কথা বলেন তিনি।

পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘একজনের কারণে রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্কে প্রভাব না পড়াটাই স্বাভাবিক। এটি আমাদের একটি আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে হয়েছে, ওনারও (ড. ইউনূস) আপিল করার সুযোগ আছে। এটি একটি চলমান আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। সুতরাং এটা নিয়ে আমি আর মন্তব্য করতে চাই না।’  এদিকে শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় ড. ইউনূসের সাজার রায়ের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন রাজনীতিবিদ, দেশি ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন পেশাজীবীরা। গতকাল রায়ের পর ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতের এজলাসে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় জাতিসংঘের বিশেষ রেপোটিয়ার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারকর্মী আইরিন খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখানে কাদের বিচার করলেন? এই বিচারের মানে কী? আজ বছরের প্রথম দিন (গতকাল ছিল ইংরেজি নববর্ষের প্রথম দিন)। কিন্তু এই দিনে এই খবর (সাজা) শুনে আমাদের সারা শরীর শিউরে উঠছে। ন্যায়বিচারের নামে এভাবে যদি বিচার করা হয় তাহলে সেটা একটা সাংঘাতিক ব্যাপার। ন্যায়বিচারের নামে একটা হাস্যকর ব্যাপার দেখলাম।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে কত রকমের অন্যায় হচ্ছে। আপনারাও জানেন। মানুষকে গুলি করেও মারা হয়েছে। সেসবের কোনো বিচার নেই। কিন্তু ওনারা এখানে কী মামলা নিয়ে এসেছেন। ডিফেন্সপক্ষকে (আসামিপক্ষ) তো আইনটাকে বিশ্লেষণের সুযোগ দেওয়া হয়নি।’

আইরিন খান আরও বলেন, ‘তিনি (ড. ইউনূস) একজন নোবেল বিজয়ী। এই মানুষটি আমাদের সবাইকে গর্বিত করেছেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে এ ধরনের একটা রায় হলো।’ তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিকভাবে একজন কি আছেন, যিনি এই বিচারের পক্ষে বলেছেন। সবাই বলছেন এটা অন্যায়। এখন গায়ের জোরে অন্যায়কে ন্যায় বানিয়ে, একজন নোবেল বিজয়ীর সঙ্গে এ ধরনের আচরণ হাস্যকর।’

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল রায়ের প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিকদের বলেন, রায়ের বিষয়টি পূর্ণাঙ্গভাবে ব্যাখ্যা করার কোনো সুযোগ নেই এখানে। আপনারা একটা বিষয় লক্ষ করবেন, ‘এই বিচার চলাকালীন সময়ে এবং বিচারের আগে ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কী পরিমাণ অপপ্রচার, জিঘাংসামূলক ও অবমাননাকর বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। এটার সঙ্গে যদি আরও কয়েকটা বিষয় মিলিয়ে দেখেন যে, এ রকম অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে বিচার, ঘন ঘন শুনানি, গভীর রাত পর্যন্ত কোর্ট এ রকম কি বাংলাদেশের কোনো শ্রম আদালতে হয়েছে?’ তিনি বলেন, বাংলাদেশে গার্মেন্টগুলোতে কত অগ্নিকা- ঘটে, অজস্র লোকের মৃত্যু হয়, শ্রম অধিকারের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে শ্রমিক নেতারা গুম হয়ে যান। তাদের বিরুদ্ধে মামলা, নির্যাতন হয়, তারা চাকরি হারান। কিন্তু কারও বিরুদ্ধে কি শত শত মামলা হয়েছে? এ বিষয়গুলো থেকে বোঝে নেওয়া যায় যে, এটা একটা ষড়যন্ত্রের অংশ।’

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় মানবাধিকারকর্মী ফরিদা আক্তার সাংবাদিকদের বলেন, এখানে ন্যায়বিচার হয়নি। যেখানে তারা (আসামিপক্ষ) বারবার বলেছেন যে, তারা অন্যায় করেননি। আর যে দোষগুলো, সেগুলো অনেক প্রতিষ্ঠান করেছে এবং নিয়মের মধ্যে করে। সে কারণে মনে হয়েছে, এটা (এই মামলা) বিশেষভাবে দেখা হয়েছে এবং ড. ইউনূসের থাকার কারণে। তিনি যদি এখানে না থাকতেন তাহলে এভাবে দেখা হতো না। এখানে প্রফেসর একটা টার্গেট।’

গণভবনের রায়ে ইউনূসের সাজার ঘটনায় জাতি লজ্জিত : শ্রম আইনের মামলায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে সাজার প্রতিক্রিয়ায় বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, ‘ড. ইউনূসকে ফরমায়েশি রায়ে ৬ মাসের কারাদন্ড দিয়েছে শেখ হাসিনার আদালত। এই গণভবনের রায়ে পুরো জাতি লজ্জিত। ফরমায়েশি রায়ের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ এবং ক্ষোভ জানাচ্ছি।’ গতকাল বিকেলে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।

রিজভী বলেন, ‘প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে এই রায় যে দেওয়া হয়েছে তার প্রমাণ শেখ হাসিনা অব্যাহতভাবে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে নিয়ে বিষোদগার এবং তাকে হুমকি দেওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে।’

তিনি আরও বলেন, ‘দেশে লাখ লাখ কোটি টাকা পাচারের হোতা, লুটেরা, ব্যাংক ডাকাত, ঋণখেলাপিদের কিছুই হয় না। সম্পূর্ণ সাজানো-গোছানো রায়ে সাজা দেওয়া হয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো জাতির গর্বকে।’

বিশ্ব গণমাধ্যমের খবর : শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কারাদণ্ডের রায়ের সংবাদ বিশ্ব গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছে। এসব গণমাধ্যমের তালিকায় রয়েছে, আলজাজিরা, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, গালফ নিউজ, ফ্রান্স২৪, দ্য গার্ডিয়ান, ব্লুমবার্গ, এএফপি, টাইমস অব ইন্ডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠান।