দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়েছে অধিকাংশ ইসলামি দল। নির্বাচন বাতিল ও একতরফা নির্বাচন ঠেকানোর জন্য জোরালো আন্দোলনের কথা বলেছিলেন এসব দলের নেতারা। কিন্তু তাদের কথা বলাতেই সীমাবদ্ধ।
নামকাওয়াস্তের কর্মসূচি ছাড়া কার্যকর আন্দোলন এখনো গড়ে তুলতে পারেননি তারা। অথচ বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে এসব দল ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠবে ধারণা করা হয়েছিল। কারণ স্থানীয় নির্বাচনে কোথাও কোথাও ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের ধরাশায়ী বা প্রায় ধরাশায়ী করেছেন দলগুলোর প্রার্থীরা।
বাংলাদেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল ৪৪টি। এর মধ্যে রয়েছে ১১টি ইসলামপন্থি দল। নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত মিলিয়ে ইসলামি দল রয়েছে প্রায় ৭০টি। নিবন্ধিত ইসলামি দলগুলো হলো বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, জাকের পার্টি, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, ইসলামী আন্দোলন, ইসলামিক ফ্রন্ট, খেলাফত আন্দোলন ও বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি। ইসলামি দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
বাংলাদেশ তরীকত ফেডারেশন, বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট, ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি নির্বাচনী মাঠে রয়েছে। জাকের পার্টি নির্বাচনে থাকার কথা বললেও তারা সরে গেছে। তবে তাদের মনোনীত প্রার্থীদের নাম ভোটার তালিকায় রয়ে গেছে। খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে ওলামা ইসলামী, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন ‘সমমনা ইসলামি দল’ নামের মোর্চা গঠন করে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েও পরে সরে দাঁড়িয়েছে। তাদের শীর্ষ নেতারা আবার হেফাজতে ইসলামের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত। যদিও হেফাজত অরাজনৈতিক সংগঠন।
নিবন্ধিত ১১টি দলের ৭টি ‘একতরফা’ আখ্যা দিয়ে নির্বাচন বর্জন করে জোরালো আন্দোলন গড়ে তোলার কথা বলে যাচ্ছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কিছু কর্মসূচি চালিয়ে গেলেও অন্য দলগুলো বুলিতেই আটকে আছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও ব্যতিক্রম নয়। ইসিতে নিবন্ধন বাতিল হওয়ার পর দলটির নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নেই।
অনিবন্ধিত এ দলটি সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে মাঠে আছে। তাও অনেকটা লোক দেখানো। বিএনপি ও যুগপৎ আন্দোলনে থাকা দলগুলোর কর্মসূচির সঙ্গে সুর মেলানোই তাদের একমাত্র কাজ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে দুয়েকটি জায়গায় ঝটিকা মিছিল করলেও আলোচনায় আসার মতো কর্মসূচিতে যায়নি দলটি।
ভোটের মাঠে এক দশকে ‘ফ্যাক্টর’ বনে যাওয়া চরমোনাই পীরের দল ইসলামী আন্দোলন সর্বশেষ কর্মসূচি দিয়েছে ৩১ ডিসেম্বর। ওই দিন বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটের জমায়েত শেষে রাষ্ট্রপতির কাছে নির্বাচন বাতিল ও সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবিতে স্মারকলিপি দিয়েছে।
স্থানীয় নির্বাচনের তথ্য বলছে, রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা জয়ী হলেও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় অবস্থানে চলে যায় দলটি। তাদের প্রার্থী ৪৯ হাজার ৮৯২, আর আওয়ামী লীগ প্রার্থী পেয়েছেন ২২ হাজার ৩০৬ ভোট। গত বছর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলটির ৯ জন প্রার্থী চেয়ারম্যান হয়েছেন। প্রায় ২০০ নির্বাচিত ইউপি সদস্য ও রাজধানী ঢাকার ডেমরায় হাজি ইব্রাহীমসহ সারা দেশে ৭ জন নির্বাচিত কাউন্সিলর রয়েছেন। ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে দলটির ভোট ছিল ৬ লাখ ৫৮ হাজার ২৫৪ বা মোট ভোটের ১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তারা ১২ লাখ ৫৫ হাজার ৩৭৩ বা ১ দশমিক ৪৭ শতাংশ ভোট পায়।
জামায়াতে ইসলামী বিএনপির ঘোষিত কর্মসূচিকে সমর্থন জানিয়ে দায় সারছে। ১ জানুয়ারি বিএনপির কর্মসূচির সঙ্গে মিল রেখে ২, ৩ ও ৪ জানুয়ারি লিফলেট বিতরণের কর্মসূচি দিয়েছে। এর আগে সারা দেশে পুলিশের হামলা, গ্রেপ্তার, জুলুম-নির্যাতন ও একদলীয় নির্বাচনের প্রতিবাদে ১৮ ডিসেম্বর সকাল-সন্ধ্যা হরতাল কর্মসূচি দিয়েছিল দলটি। মানববন্ধন, বিক্ষোভ সমাবেশ বা পদযাত্রার মতো কর্মসূচি দেওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।
অন্য দলগুলোর মধ্যে খেলাফত মজলিস সর্বশেষ ২৯ ডিসেম্বর শুক্রবার বাদ জুমা বায়তুল মোকাররম উত্তর গেট থেকে মিছিল নিয়ে পল্টন মোড়ে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মাধ্যমে কর্মসূচি শেষ করে। ৮ ডিসেম্বর শুক্রবারও বাদ জুমা রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিল করে সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেছে। এর আগে তাদের বড় কর্মসূচি ছিল ১৪ অক্টোবরের মহাসমাবেশ।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২৮ অক্টোবর নিরপেক্ষ সরকারসহ ৩ দফা দাবিতে থানায় থানায় বিক্ষোভ, ২০ অক্টোবর শুক্রবার বিকেলে বায়তুল মোকাররমের উত্তর পাশের সড়কে যুব সমাবেশ, ৩ নভেম্বর ঢাকায় পদযাত্রা, ১০ নভেম্বর জেলায় জেলায় বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিল এবং ৮ ডিসেম্বর ছাত্র সমাবেশ করে।
জমিয়তে ওলামা ইসলামী ২৩ ডিসেম্বর রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তন সেমিনার, ২৩ জুলাই রাজধানীর গুলিস্তানের কাজি বশির উদ্দিন মিলনায়তনে জাতীয় ওলামা মাশায়েখ সম্মেলনের মতো কর্মসূচি করেছে। বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
মাঠের কর্মসূচিতে সক্রিয় না থাকার কারণ হিসেবে ইসলামি দলগুলোর একাধিক নেতা জানান, নিবন্ধিত অন্তত ৬টি ইসলামি দল কওমি মাদ্রাসাকেন্দ্রিক। অধিকাংশই হেফাজতে ইসলামের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। যেহেতু হেফাজত নানা কারণে ‘চাপে’ রয়েছে, তাই ইসলামি দলগুলোর আন্দোলন জমিয়ে তোলার মতো কর্মকা- নেই।
২০-দলীয় জোটে ছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, খেলাফত মজলিস ছাড়া বাংলাদেশ মুসলিম লীগ (বিএমএল), বাংলাদেশ ইসলামিক পার্টি, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের একাংশ ও ইসলামী ঐক্যজোট। আগে থেকেই তারা সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছে। কৌশলে মাঠে নামার পথ তারা তৈরি করতে পারেনি। ইসলামি দলগুলোর মধ্যে ঐক্য বা যুগপৎ করার সামর্থ্যও বড় একটা কারণ।
জানতে চাইলে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা গাজী আতাউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা মাঠে থেকে কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করছি। ৭ জানুয়ারির নির্বাচনকে ঘিরে আমাদের নতুন কর্মসূচি ৪ জানুয়ারি সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে ঘোষণা করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘অন্য ইসলামি দলগুলোর সীমাবদ্ধতার কারণে হয়তো মাঠের কর্মসূচি সেভাবে জমে উঠছে না। কারও সামর্থ্য নেই, কেউ অন্য কোথাও ব্যস্ত।’
খেলাফত মসলিসের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মুহাম্মদ মুনতাসির আলী বলেন, ‘প্রতিটি দল বা জোট নিজের মতো কর্মসূচি পালন করছে। আমরা কোনো জোটে নেই, তাই আমরা আমাদের মতো কর্মসূচি পালন করছি। ফলে ধারাবাহিকভাবে যে কর্মসূচি পালিত হওয়া দরকার তা হচ্ছে না। আমরা আক্রমণাত্মক বা ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি দেব না। কিন্তু সমালোচনা করে যাব।’
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী বলেন, ‘ডিসেম্বরে আমাদের ৪-৫টি কর্মসূচি ছিল। জোটবদ্ধ না হওয়ায় নিজেদের মতো কর্মসূচি দিচ্ছি। এতে ধারাবাহিকতা হয়তো দৃশ্যমান হয়নি। ৭ জানুয়ারি নির্বাচন হয়ে গেলে পরবর্তী কর্মসূচির বিষয়ে সিদ্ধান্ত আসবে।’