স্বতন্ত্রের মিছিলে ছদ্মবেশী নৌকা

জয়-য়-য় বাংলা, জিতবে এবার না নৌকা নয়, জিতবে এবার নৌকা ফেলে দিয়ে ওখানে যুক্ত করা হয়েছে ‘কেটলী আঠারোর মার্কা’। উচ্চৈঃস্বরে বাজছে সে বেসুরো প্রচার গান। উত্তরার নর্থ টাওয়ার, মাস্কট প্লাজা, জমজম টাওয়ার এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী আমিনুল ইসলাম চৌধুরী খসরু ওরফে খসরু চৌধুরীর প্রচারণার সাম্প্রতিক একটি চিত্র। তার কর্মীদের হাতে কেটলী প্রতীক সংবলিত প্ল্যাকার্ড। বিশাল মিছিলের সামনে হেঁটে পথচারীদের আর ফ্ল্যাটের জানালা খুলে উঁকি দেওয়া এলাকাবাসীর প্রতি হাত নাড়াচ্ছিলেন তিনি। কর্মীরা সেøাগান ধরেছেন- ‘খসরু ভাই ভালো লোক, ঢাকা-১৮ তারই হোক’। ‘জয় বাংলার খসরু ভাই, সুখে-দুঃখে তাকেই চাই’। সেøাগানে আর রেকর্ডিং-এ তৈরি হয়েছে এক শব্দের মৌতাত।

এই প্রচার-বহরের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে কুশল সেন্টার। এবার হাজির প্রায় আশপাশের সবগুলো প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়ীরা, রাজলক্ষ্মীর সামনে ছোট্ট সমাবেশ করে কর্মীদের উদ্দীপ্ত করে সকালের প্রচারণা শেষ করলেন খসরু চৌধুরী। বললেন, তিনি নিজে ব্যবসায়ী, তাদের স্বার্থ তাই তিনিই সবচেয়ে ভালো বোঝেন। দীর্ঘদিন ধরে সরাসরি এবং ডিজিটাল প্রচারণা করছেন তিনি। স্বতন্ত্র প্রার্থী হলেও তিনি যে আওয়ামী লীগেরই লোক তা ফলাও করে বলছেন তিনি ভোটারদের। সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে এই আসনে তিনিই জিতবেন এমন দাবি তার, আছে প্রচুর প্রতিশ্রুতিও। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, স্যুয়ারেজের বেহাল দশা ও জলাবদ্ধতা নিরসন, আরও খেলার মাঠ ও ভালো কবরস্থান তৈরি করতে চান তিনি। চান ব্যবসাবান্ধব পরিস্থিতিও তৈরি করতে।

দলীয় সিদ্ধান্তে এই আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দেওয়ায় এখানে খসরু চৌধুরীর হেভিওয়েট প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আসলে শেরিফা কাদের। লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে তিনিও প্রচারণা চালাচ্ছেন জোরেশোরে। শেরিফা কাদের নিজেকে বলছেন জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী, আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী। উত্তরার বঙ্গবন্ধু মুক্তমঞ্চে দেওয়া তার বক্তৃতা হয়েছে ভাইরাল। যেখানে তিনি বলেছেন, ‘তিনি কুম্ভ রাশি, এই রাশির ধরন হলো এরা ঢেলে দেয়, আমি আমার সমস্তটুকু ঢেলে দিতে চাই ঢাকা আঠারোর উন্নয়নে’।

শেরিফা কাদের ডিজিটাল প্রচারণার পাশাপাশি যাচ্ছেন মানুষের ঘরে ঘরে। এই আসনে সাহারা খাতুনের মৃত্যুর পর সর্বশেষ সংসদ সদস্য (এমপি) নির্বাচিত হওয়া হাবীব হাসান দলের সিদ্ধান্তে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নির্বাচন করছেন না। ঢাকার আসনগুলোর মধ্যে, রাজধানীতে এই আসনেই জাতীয় পার্টিকে ছাড় দিয়েছে আওয়ামী লীগ। তাই নৌকা প্রতীক নেই তবুও সরব আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা।

তুরাগ আর বালু নদীর পাড়ের সংসদীয় আসন ঢাকা-১৮। রাজধানীর প্রবেশপথ উত্তরা দক্ষিণখান তুরাগ উত্তরখান বিমানবন্দরসহ ৯টি এলাকার ১৪টি ওয়ার্ড নিয়ে এই সংসদীয় আসন। ৫ লাখ ৯০ হাজার ভোটারের এই আসনটিতে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে আলাদা উত্তেজনার বড় কারণ নৌকা প্রতীকে সরাসরি কারও নির্বাচন না করা। সবাই এখানে ছদ্মবেশী নৌকা। এই আসন যেন হয়ে উঠেছে সারা দেশের নির্বাচনী প্রচারণারই প্রতিচ্ছবি।

এই আসনের তুরাগ দিয়াবাড়ী এলাকার রাস্তা ছেয়ে গেছে সাদা-কালো লেমিনেট করা পোস্টারে পোস্টারে। লক্ষণীয়, একই দড়িতে ঝুলছে খসরু চৌধুরী, প্রকৌশলী বশির উদ্দিন ও এসএম তোফাজ্জল হোসেনের স্বতন্ত্র প্রতীকসহ পোস্টার। মনে হচ্ছে, আওয়ামী লীগের কর্মীরাই একসঙ্গে লাগিয়েছেন এক দুই তিন করে সব পোস্টার। শেরিফা কাদেরের পোস্টার আছে তুলনামূলক কম, বেশিরভাগই আলাদা স্বতন্ত্র দড়িতে ঝুলছে।

আওয়ামী লীগের সমর্থনে কেটলী মার্কা নিয়ে খসরু চৌধুরী ছাড়াও ঈগল প্রতীক নিয়ে প্রকৌশলী মো. বশির উদ্দিন, ট্রাক প্রতীক নিয়ে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম মোজাম্মেলের ভাই মুক্তিযোদ্ধা এস এম তোফাজ্জল হোসেন নির্বাচন করছেন। প্রত্যেকেই জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন, প্রত্যেকেই বলছেন তারা আসলে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী।

তুরাগের গুলগুলার মোড়ের চায়ের দোকানের সামনে অস্থায়ী ক্যাম্প করেছে স্থানীয় ছাত্রলীগ যুবলীগের কর্মীরা। এখানে পাতা হয়েছে চার চারটি ক্যারমবোর্ড। নির্বাচনী প্রচারণার মাইকও আছে পাশে। সেখানে একটু পরপরই খসরু চৌধুরীর প্রচারণা করছে ছেলেরা। সঙ্গে চলছে ক্যারম খেলা নিয়ে বাজি ধরা ও হাসিঠাট্টা। একটু দাঁড়িয়ে বোঝা গেল বাজির খেলা চলছে পাশের ব্যাডমিন্টন কোর্ট ঘিরেও। তাদের একজন অর্নব ঘোষ (৩৪) বললেন ‘আমরা কয়েকজনের মিছিল করে দিচ্ছি, প্রচারণায় সবাই আমাদের লোকবল ব্যবহার করছে’। সবাই কারা জানতে চাইলে তিনি বলেন, খসরু, তোফাজ্জল, বশিরউদ্দিন তিনজনই মাঠে আছেন, তিনজনেরই লোকজন লাগছে।

চায়ের দোকানে বসে থাকা মুরব্বি শামসুল আরেফিন (৫৬) পান খেতে খেতে বললেন, ‘যে-ই আসে এলাকায় তো কাজ হয় না, ২০ বছর ধরে এই এলাকায় খালি বিল্ডিং হইল, রাস্তাঘাট তো কিছু হয় না, বাইড়া মাস আসামাত্র রাস্তাগুলোতে জমে পানি, বেড়িবাঁধ হওয়ায় সেই পানি আবার সরেও না, রাজনীতির লোকেরা আসে ব্যবসা করতে, তারা এলাকার উন্নয়ন বোঝে না’। আলাপে তিনি আরও বলেন, ‘সব প্রার্থীই টাকা ছিটাচ্ছে, এই এলাকায় প্রচুর ফ্লোটিং ভোটার, তারা যাদের কাছে টাকা পাবে তাদেরই ভোট দেবে।

দিয়াবাড়ী এলাকার কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষক মাজুমা খাতুন (৩২) জানালেন, তার কাছে চারজন প্রার্থী ভোট চেয়েছেন, তবে তিনি কাউকেই যোগ্য মনে করেন না, ভোট নিয়ে তার আগ্রহও কম।

উত্তরা ১১ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা রায়হান আবির (২৪) পড়েন বেড়িবাঁধ সংলগ্ন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজিতে পড়েন। তিনি বলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে একটি দলের কর্মীরা ৭ তারিখ যেন কেন্দ্রে যাই এজন্য যারা ভোটার তাদের উদ্বুদ্ধ করতে এসেছিলেন। তারা নানা উপহারের লোভও দেখিয়েছেন’। তিনি যুক্ত করেন, ‘এই নির্বাচনের ব্যাপারটা তো উৎসব উৎসব লাগছে। খারাপ না, কিছু টাকা পকেটেও এলো।’

নির্বাচনী এই আসনে জাকের পার্টি অংশ নিলেও তাদের প্রার্থীর কোনো প্রচারণা বা পোস্টার চোখে পড়েনি।