যাচাই করার ক্ষমতা এবং বাছাই করার স্বাধীনতা ছাড়া গণতন্ত্র চর্চা হয় না। অনেক সময় সঠিক ধারণা না থাকার ফলে যাচাই সঠিক হয় না, ফলে বাছাই করাটাও যথার্থ হয় না। এটা ব্যক্তিপর্যায়ে যতখানি ক্ষতির কারণ হয় রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনে তার চেয়ে বহুগুণ ক্ষতি এবং বিপর্যয় ডেকে আনে। কিন্তু তা সত্ত্বেও যাচাই-বাছাই করার মাধ্যমেই সঠিক পথে চলাটাই এখন পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি। গণতন্ত্রের দুটো দিক আছে। একটি তার দর্শনগত দিক, অন্যটি প্রায়োগিক দিক। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, পরমতসহিষ্ণুতা, মত যাচাই করে একমত হতে না পারলে সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে গ্রহণ করা এবং সংখ্যালঘুর মতকেও সম্মান দেওয়া এসব গণতন্ত্রের দর্শনগত দিকের মধ্যে পড়ে। প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রে সংখ্যাগুরুর মতো গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু সংখ্যালঘুর মতোও উপেক্ষণীয় নয়। কারণ সংখ্যাগুরুও ভুল করে এবং সংখ্যালঘুরাও সত্যকে তুলে ধরতে পারে। এ কারণেই যাচাই-বাছাই প্রয়োজনীয় শর্ত। যাচাই-বাছাই করার পদ্ধতিকে নির্বাচন বলা হয়। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে মতের যাচাই এবং ব্যক্তির বাছাই করা যায়। কিন্তু যদি অংশগ্রহণমূলক না হয় আর যাচাই-বাছাইয়ের সুযোগ না থাকে, তাহলে নির্বাচন তার গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়ে ফেলে। বাংলাদেশের ১১টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ৪টি নির্বাচনে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ১৯৮৬, ১৯৮৮, ১৯৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারি এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনগুলোর চিত্রটা দেখে নেওয়া যাক।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানে সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিজেকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ঘোষণা করেন। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি এরশাদ জাতীয় পার্টি গঠন করেন। এরপর তিনি আইনি বৈধতার প্রয়োজনে তৃতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের তোড়জোড় শুরু করেন। ১৯৮৬ সালের ৭ মে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়। এ সময় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৫-দলীয় জোট ও বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭-দলীয় জোট এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ছিল। ১৫ ও ৭-দলীয় জোট ১৭ মার্চের যৌথসভায় নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেয়।
কিন্তু নির্বাচন তো করতেই হবে। তাই ১৯৮৬ সালের ২১ মার্চ জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এরশাদ বলেন, বিরোধী দলগুলো এক রাতের মধ্যে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা না দিলে নির্বাচনবিরোধী সব তৎপরতা ও কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে। এরপর আকস্মিকভাবে আওয়ামী লীগ ও ১৫-দলীয় জোটের কয়েকটি দল নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। বাসদসহ কয়েকটি দল নির্বাচনে যেতে অস্বীকৃতি জানায়, ফলে ১৫-দলীয় জোট ভেঙে যায়।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৭-দলীয় জোট এবং বামপন্থিদের ৫-দলীয় জোট শেষ পর্যন্ত নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৫২৭ জন। প্রশ্নবিদ্ধ এ নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ১৫৩টি আসনে জয়ী দেখানো হয়। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জিতেছিলেন ৩২টি আসনে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ভোট প্রদানের হার ছিল ৬০ দশমিক ৩১ শতাংশ। আগের যেকোনো নির্বাচনের তুলনায় তৃতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল ছিল আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট সব মহলের ধারণা, ভোটার উপস্থিতি ছিল বড়জোর ২০ শতাংশ। নির্বাচনে নজিরবিহীন কারচুপি, অনিয়ম ও সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছিল। এমনকি সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তারা নির্বাচনে বিজয়ী করতে ভূমিকা পালন করেন বলে অভিযোগ উঠেছিল।
১৯৮৬ সালের ৩১ আগস্ট এরশাদ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন এবং সেপ্টেম্বরে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হন। এরপর ১১ নভেম্বর সংসদে সংবিধানের সপ্তম সংশোধনী বিল পাস হয়। এর মাধ্যমে এরশাদের ক্ষমতা দখলকে বৈধতা দেওয়া হয়। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদে ক্ষমতা দখলের আইনি বৈধতা দিলেও এরশাদের রাজনৈতিক বৈধতা অর্জিত হয়নি। বিরোধী দলগুলো সেই সরকারকে বৈধ সরকার হিসেবে মেনে নেয়নি। ফলে আন্দোলন চলতেই থাকে এবং ১৯৮৭ সালের শেষ দিকে আন্দোলন তীব্র হয়। এমন পরিস্থিতিতে এরশাদ ২৭ নভেম্বর জরুরি অবস্থা জারি করেন এবং ৭ ডিসেম্বর সংসদ ভেঙে দেন।
দেশে নির্বাচনের পরিবেশ না থাকার পরও ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ আবার সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দেওয়া হয়। বিরোধী দলগুলো এ নির্বাচন বর্জনের জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানায়। ২ ও ৩ মার্চ হরতাল আহ্বান করা হয়। ৮ দল, ৭ দল, ৫ দলসহ বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করায় নির্বাচনে জনগণের কোনো আগ্রহ ছিল না। জাতীয় পার্টি ও এরশাদের ‘অনুগত’ ছোটখাটো কিছু দল সেই নির্বাচনে অংশ নেয়। এতে প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ১২০ জন। প্রশ্নবিদ্ধ ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি অর্থাৎ ২৫১টি আসনে জয়ী দেখানো হয়। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা পান ২৫টি আসন। সরকারি হিসাবে ভোটার উপস্থিতি দেখানো হয় ৫৪.৯৩ শতাংশ। এই ‘একতরফা’ নির্বাচনে সংখ্যার বিচারে অনেক দলের অংশগ্রহণ দেখানো হলেও প্রধান বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার আহ্বান জানানোর কারণে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু এই নির্বাচন এরশাদকে আইনি বৈধতা দিলেও রাজনৈতিক বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতা দিতে পারেনি। এরশাদ আমলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো নিয়ে বাংলাদেশ পলিটিকস : প্রবলেম অ্যান্ড ইস্যুজ বইয়ে রওনক জাহান লিখেছেন, ‘এরশাদ আমলে ১৯৮৪ সালে স্থানীয় সরকার নির্বাচন, ১৯৮৫ সালের গণভোট, ১৯৮৬ সালে রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচন এবং ১৯৮৮ সালে আরেকটি সংসদ নির্বাচনসহ অনেকগুলো নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু এ নির্বাচনগুলো সরকারের জন্য বৈধতার চেতনা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।’ ১৯৮৮ সালের একতরফা নির্বাচনে বিপুল বিজয় লাভ করার পরও বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন তীব্র রূপ লাভ করে, যার পরিণতিতে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন।
১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ও সুষ্ঠু নির্বাচনের একটি ভিত্তি তৈরি করার সুযোগ এসেছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীনদের ভূমিকা এবং বিরোধী দলগুলোর সরকারের প্রতি আস্থা না থাকায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়নি। ১৯৯৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সংসদে বিরোধী দল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানায়। ১ ডিসেম্বর এক জনসভায় শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন নির্বাচন দিতে সরকারকে বাধ্য করব।’
১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে বিরোধী দলগুলো একযোগে সংসদ বর্জন করে। ২০ মার্চ মাগুরা-২ আসনের উপনির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি ও সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটে। পরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন শক্তিশালী রূপ নেয় এবং তারা ১৯৯৪ সালের ২৪ জুন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করে। কিন্তু ক্ষমতাসীন বিএনপি এই দাবি বিবেচনায় নেয়নি। ২৪ নভেম্বর সংসদ ভেঙে দিয়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের তারিখ নির্ধারিত হয়। এই নির্বাচন আওয়ামী লীগ, বামপন্থি দলগুলো এবং জামায়াত বর্জন করে। তবে বিএনপিসহ ৪২টি দল নির্বাচনে অংশ নেয়। প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৫০। এ নির্বাচনে বিএনপি ২৮৯টি আসন পায়। এর মধ্যে ৪০ জনের বেশি প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ১০টি আসন পেয়েছিলেন।
নির্বাচন কমিশনের হিসাবে এ নির্বাচনে ভোট প্রদানের হার ছিল ২৬ দশমিক ৫৪ শতাংশ। ‘একতরফা’ এ নির্বাচন করার প্রধান যুক্তি ছিল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ‘রক্ষা’ করা। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে নির্বাচনটি হয়তো সাংবিধানিক ধারাবাহিকতাকে রক্ষা করেছে এবং এর মাধ্যমে বিএনপি সরকার আইনি বৈধতা পেয়েছে। কিন্তু নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ ও প্রার্থীদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা না থাকায় তা গণতন্ত্রকে বিকশিত করেনি, সংঘাতের পথ উন্মুক্ত করেছে।
এরপর বাংলাদেশের ইতিহাসে আর একটি দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী একদলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি ৩০০টি আসনের ১৪৭টিতে একযোগে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, বাকি ১৫৩ আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়েছিলেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০টির মধ্যে ২৩৪টি আসনে বিজয়ী হয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। কিন্তু নির্বাচনে সহিংসতা, ভোটারহীনতা এবং জনমানুষের কাছে অগ্রহণযোগ্যতার কারণে এই নির্বাচন পোকা খাওয়া ফলের মতো নির্বাচন বলে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল। ভবিষ্যতে এ ধরনের নির্বাচন আর না করার অভিপ্রায়ও ব্যক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো এই যে, ২০২৪-এ এসে আবার তারই পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছে বলে অনেকের ধারণা। ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা এবং একতরফা নির্বাচন করা এখন সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশের জনগণের কাছে নির্বাচন একটা উৎসবের মতো ছিল। তর্ক, বিতর্ক, বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রার্থীদের গণসংযোগ, চায়ের দোকানে তুমুল আড্ডা এমনকি মারামারির মতো ঘটনা নির্বাচনের অনুষঙ্গ। কে কী করেছে আর কী করবে এই আলোচনা মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক আলোচনার পরিবেশ তৈরি করে দেয়। কিন্তু একতরফা নির্বাচন অনেকটা প্রাণহীন দেহের মতো। কোন আহ্বানে সাড়া তো দেয় না বরং পচে দুর্গন্ধ ছড়ায়। জবাবদিহিহীন ক্ষমতা যেমন স্বেচ্ছাচারিতার জন্ম দেয়, তেমনি সমাজের গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির অবক্ষয় ঘটায়, যা শেষ বিচারে শুধু রাজনৈতিক পরিবেশ ধ্বংস করে তাই নয়, মানবিক বিপন্নতার জন্ম দেয়। বর্তমান প্রজন্মের কাছে যেমন খারাপ নজির স্থাপন করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও দায়হীন ও রাজনীতিবিমুখ করে তোলে গণতন্ত্রবিহীন একতরফা নির্বাচন। এ অবস্থার অবসান ঘটাতে প্রয়োজন শক্তিশালী রাজনৈতিক আন্দোলন, যা জনগণের সচেতনতা বাড়াবে আর ক্ষমতাসীনদের দুর্বৃত্ত হওয়ার পথ রুদ্ধ করবে।
লেখক : রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক