সর্বশেষ ২০০৮ সালের নির্বাচন পর্যন্ত কোন দল সরকার গঠন করবে আর কে বিরোধী দলে বসবে তা নিয়ে পাড়া-মহল্লা, গ্রামগঞ্জে সরব আলোচনায় মেতে উঠতেন সব বয়সের ভোটাররা। এর পরের জাতীয় নির্বাচনগুলোতে সেই আলোচনা তর্কবিতর্কের উত্তাপ আর তেমন করে দেখা যায়নি।
বিএনপি ও তার মিত্রদের বর্জন ও ভোট ঠেকানোর কর্মসূচির মধ্যে অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচন হবে কি না সেই আলোচনাই বেশি ছিল। অন্যদিকে সব দলের অংশগ্রহণে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের পরদিন সব আলোচনা থমকে যায়।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও নেই সেই আলোচনা, বিতর্কের উত্তাপ। ভোটগ্রহণ ও ফলাফল প্রকাশের আগেই সরকার গঠন করার আলোচনায় এগিয়ে রয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। বর্তমান সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা) বিরোধী দলের আসনে থাকছে না সেটাও আলোচনায় রয়েছে। ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে অনেকের জয়ের দৌড়ে থাকায় জাপার বিরোধী দলের আসনে বসার সুযোগ আর থাকছে না এমন আলোচনাও রয়েছে।
বিএনপিবিহীন নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে দলীয় নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার সুযোগ রেখেছে আওয়ামী লীগ। প্রচার মাঠে যেটুকু নির্বাচনী উত্তাপ ছিল, তা সম্ভব হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণেই। তারা ভোটের মাঠে জাপাকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে। ফলে সরকারেও যেমন এগিয়ে রয়েছে আওয়ামী লীগ, তেমনি বিরোধী দলেও এগিয়ে রয়েছে দলটি।
বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে আজকের ভোট সম্পর্কে এসব কথাই উঠে এসেছে। তাদের সঙ্গে আলোচনায় আরও উঠে এসেছে, ভোট নিয়ে মানুষের কৌতূহল তেমন একটা নেই। কারণ, আওয়ামী লীগ আবারও সরকার গঠন করবে। যেটুকু কৌতূহল তা বিরোধী দল কে হচ্ছে তা নিয়ে।
জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সরকারে থাকা অনেকটাই নিশ্চিত। তাই কৌতূহল সব বিরোধী দলকে ঘিরে। কে হচ্ছে বিরোধী দল সেটাই এবারের নির্বাচনের সবার আগ্রহ। সরকারি দল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে জানার চেষ্টা করা হলেও আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে পরিষ্কার কিছু জানা যায়নি।’
আওয়ামী লীগের নিম্ন, মধ্যম ও উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় আসার সুযোগ বেশি। তারা বলেন, মাঠে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও প্রার্থী না থাকায় সুযোগ সৃষ্টি করেছে। বিরোধী দলে কে আসছে, এই প্রশ্নে প্রায় সবাই মুখ খুলতে রাজি নন। ভোট শেষে তা বোঝা যাবে বলে মুখ বন্ধ করে রাখেন নেতারা।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শাজাহান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কে হবে বিরোধী দল সেটা ভোটের ফলাফলের আগে কীভাবে বলব।’
আওয়ামী লীগের আরেক সভাপতিমণ্ডলীর সভাপতি মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বলেন, ‘ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থীদের সঙ্গে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।’
তবে ক্ষমতাসীন দলের ছোট-বড় একাধিক নেতার কাছ থেকে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বিরোধী দল যে বা যারাই হবে, সেটা নজির হবে। তারা বলেন, কোনো দল বিরোধী দলের আসনে বসার সম্ভাবনা নেই। ভোটের মাঠে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের যে জোয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তাতে সংসদে বিরোধী দল হিসেবে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করার কথা। তারা বলেন, আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যেভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চলে এসেছেন, তাতে ভোটের মাঠে আলোচনায় নেই জাপা।
আওয়ামী লীগের ছাড় দেওয়া ৩২ আসনে জাপা ও ১৪-দলীয় জোটের শরিকদের প্রার্থীরা আওয়ামী লীগেরই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। এর মধ্যে জাপার ৫ জন প্রার্থী নিরাপদ হলেও বাকি ২১ আসনের মধ্যে ১৮টি আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র এবং তিনটি আসনে জাপার বহিষ্কৃত নেতাদের চ্যালেঞ্জে পড়বেন, যার একটিতে আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীও আছেন। শরিকদের ছাড় দেওয়া ৬টি আসনেই আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীরা হুমকি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের দলীয় এক স্বতন্ত্র প্রার্থী সমর্থন জানানোয় বরিশাল-২ আসনে ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেননের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। বাকি ৫ আসনে নাজুক অবস্থায় আছেন শরিক দলের প্রার্থীরা। তাদের বিজয়ী করতে বিশেষ কিছু করতে হতে পারে।
সমঝোতার ৬টি আসন পেয়েছে শরিক ৩টি দল। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলকে (জাসদ) তিনটি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টিকে দুটি এবং একটি আসন জেপিকে দেওয়া হয়েছে। বাকি ২৬৭টি আসনের মধ্যে দুটি আওয়ামী লীগের প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় ২৬৫ আসনে নৌকার প্রার্থী আছেন। জোটের ছয়টিসহ ২৭১টি আসনে নৌকা প্রতীকে লড়বেন প্রার্থীরা।
নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে আওয়ামী লীগের নেতারা কাজ করছেন বলে জানা গেছে। এ ক্ষেত্রে ভোটের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রেখে টার্নওভার ৪৫-৫০ শতাংশ করতে চায় আওয়ামী লীগ। যাতে করে সুষ্ঠু ভোটে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্বের কাছে ভোটারদের অংশগ্রহণে অংশগ্রহণমূলক ভোট দেখাতে চায় আওয়ামী লীগ। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের নিশ্চিত আসনসহ শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে কাজ করছেন বলে সূত্রে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগের গবেষণা সেলে একাধিক সদস্য বলছেন, ‘বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা কেন্দ্রে না এলে ৬৫-৭৫ আসনে আমাদের দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হবেন। আর বিএনপির কর্মী-সমর্থকরা ভোট দিতে এলে শতাধিক আসনে নৌকাসহ জাতীয় পার্টির কপাল পুড়ে দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হতে পারেন।’
আওয়ামী লীগ নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন, সামাজিক নিরাপত্তার অংশ হিসেবে গ্রামীণ পর্যায়ে সরকার যে সুবিধা দেয় তা বিএনপির অনেকেই গ্রহণ করেন। তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের দলীয় চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যদের প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে সুবিধাভোগীরা ভোটকেন্দ্রে আসতে পারেন। এর মধ্যে প্রতি ১০ জনের সাতজনই নৌকার বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন বলে মনে করেন তারা।
বিএনপিসহ সমমনা দলগুলোর নির্বাচন বর্জনের মুখে নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করতে দলীয় নেতাদের স্বতন্ত্র হতে অনুমতি দেয় আওয়ামী লীগ। এমনি অবস্থায় বর্তমানে ২১৯টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীর মুখোমুখি হতে হচ্ছে নৌকা ও জাপার প্রার্থীদের। এর মধ্যে ১১২টি আসনে দলীয় প্রার্থীরা অনায়াসে বিজয়ী হবেন বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। বাকি ১৫৩টি আসনে নৌকার প্রার্থীকে দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীর মুখোমুখি হতে হবে। এর মধ্যে বিএনপি ও অন্যান্য দল থেকে আসা ৭ স্বতন্ত্র, তৃণমূল বিএনপি, বিএনএম ও কল্যাণ পার্টির ৬ জন প্রার্থীকে বিজয়ী করতে দলীয় নেতাকর্মীদের কাজ করতে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রসহ নানা জায়গা থেকে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। বর্তমান একাদশ সংসদের আওয়ামী লীগের দলীয় ১৭ জন এমপি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে লড়ছেন। এর মধ্যে দুজনের বিপরীতে নৌকার প্রার্থী নেই।
আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে জানা গেছে, দলীয় কয়েকজন হেভিওয়েট নেতা, সরকারের ১৬ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী-উপমন্ত্রী এবং কয়েকজন মন্ত্রীর আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।