শেষ ঘণ্টার ভোটে ৪০ শতাংশ

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দেশ-বিদেশে অঙ্গীকার করেছিলেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হবে। অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে কি না, এই নিয়ে নানা মহলে দ্বিমত থাকলেও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট সম্পন্ন করতে তিনি যে সফল হয়েছেন, তা নিয়ে দ্বিমত নেই কারোরই। বিএনপি ও তার মিত্ররা নির্বাচনে না আসায় ভোটার উপস্থিতি নিয়েও মানুষের মধ্যে এক ধরনের ধারণা হয়েছিল। বেলা ৩টার পর এক ঘণ্টায় ১৩ শতাংশ ভোট বেড়ে যাওয়া তাই আওয়ামী লীগ সরকারকে স্বস্তি দিয়েছে। তবে নির্বাচনী বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি সন্দেহের ঊর্ধ্বে রাখছেন না।

নির্বাচনী প্রক্রিয়া শুরুর আগে এবং পরে আওয়ামী ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতির বিষয়টি নিয়ে কথা শোনা গেছে। বলা হয়েছিল, তাদের লক্ষ্য ৫০ শতাংশের আশপাশে ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করা। সেজন্য দলীয় নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার জন্যও উৎসাহিত করা হয়।

বিকেল সাড়ে ৩টায় এক সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব জাহাংগীর আলম জানিয়েছিলেন, ৩টা পর্যন্ত সারা দেশে ভোট পড়েছে ২৭ শতাংশ। এটাকে স্বাভাবিক ধরে নিয়েছে দেশের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। ২৭ শতাংশের এ অঙ্কে তেমন সমালোচনাও হচ্ছিল না। ভোট শেষে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল (সিইসি) সংবাদ সম্মেলনে এসে যখন জানালেন, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৪০ শতাংশের মতো ভোট পড়েছে; তাতেই শুরু হয়ে যায় সমালোচনা। সাত ঘণ্টায় ২৭ আর এক ঘণ্টায় ১৩ শতাংশ ভোট সম্ভব কি না, সেই প্রশ্ন উঠে। অবশ্য সাংবাদিকদের প্রশ্নে সিইসি বলেছেন, প্রকৃত হিসাব এখন বলা যাবে না। সব ভোট গণনার পর এ হিসাব বাড়তেও পারে, কমতেও পারে।

এ প্রসঙ্গে সাবেক নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ এম সাখাওয়াত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, এক ঘণ্টায় ১৩ শতাংশ ভোট বেড়ে যাওয়ার তথ্য সন্দেহজনক। তিনি বলেন, ‘সাত ঘণ্টায় ২৭ আর এক ঘণ্টায় ১৩ শতাংশের তথ্য দিয়ে অবিশ্বাস্য করে তুলেছে ভোটের হারের বিষয়টি।’ তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকার যে কেন্দ্রে ভোট দিয়েছি সেখানে ৮ শতাংশ ভোট পড়েছে বিকেল সাড়ে ৩টার পর পর্যন্ত। আমি সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে বলে নির্বাচন কমিশনকে ধন্যবাদও দিলাম।’

গতকাল রবিবার অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে প্রচার চলাকালে যে ধরনের সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে তাতে মনে হয়েছিল নির্বাচনের দিন সহিংসতা আরও বেশি হবে। কিন্তু মুন্সীগঞ্জে একজনকে কুপিয়ে হত্যাসহ দুজন নিহত ও কয়েকটি জেলায় বিচ্ছিন্ন কিছু ছোটখাটো সংঘর্ষ হওয়া ছাড়া কিছু ঘটেনি।

তবে ভোট শুরুর পর থেকে ভোটকেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি ঘটেনি এ আলোচনাই ঘুরপাক খেয়েছে সারা দেশে। গণমাধ্যমও এ বিষয়টি ছাড়া আর কোনো ‘নেতিবাচক’ সংবাদ পরিবেশনের তেমন উপকরণ ভোটের মাঠে খুঁজে পায়নি।

ভোটার উপস্থিতি নিয়ে আগ্রহের কারণ ছিল আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী। আওয়ামী লীগও নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে উৎসাহ দিয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও উৎসবমুখর করা।

রাজধানীর বিভিন্ন কেন্দ্র ঘুরে ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে ভোটার উপস্থিতি না ঘটার ব্যাপারটি ইতিবাচক হিসেবেই নিতে দেখা গেছে সাধারণ মানুষকে।

তেজগাঁও সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ভোট দিতে আসা রমিজউদ্দিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভোটার উপস্থিতি বেশি হবে কেন? বড় একটি রাজনৈতিক দল বিএনপি ভোট বর্জন করেছে। দলটি ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে না যেতে আহ্বান জানিয়েছে। ভোটের এক দিন আগে ট্রেনে ভয়াবহ নাশকতার ঘটনা ঘটেছে। বেশ কয়েকটি জেলায় ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়া হয়েছে। ফলে ভোটার কম আসাই স্বাভাবিক।’ আজিমপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজ কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ফখরুল ইসলাম। কম ভোটার উপস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘ভোটার না আসার একশ কারণ আছে। এবার প্রথম ভোটার না হলে আমিও ভোট দিতে আসতাম না।’

রমিজ ও ফখরুলের মতো ভোটার উপস্থিতি কম ঘটবে এটা স্বাভাবিক ধরে নিয়েছে দেশের সাধারণ মানুষও। কিন্তু ভোটগ্রহণ শেষে সিইসির ভাষ্য সমালোচনার নতুন খোরাক জুগিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৭ শতাংশ হলে এক ঘণ্টায় এতটা কী করে হতে পারে সেটা নিয়ে সবার ভেতরে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভোট কাস্টিং কম হতেই পারে। কারণ প্রতিকূল পরিবেশের মধ্য দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।’

ঢাকা-৯ আসনের নন্দীপাড়ার নভেলটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেন্দ্রের ভোটার সংখ্যা ৩ হাজার ৩। ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম জানান, বিকেল সাড়ে ৩টা পর্যন্ত ১৩৩টি ভোট পড়েছে।

মাদারটেক আবদুল আজিজ স্কুল অ্যান্ড কলেজে চারটি ভোটকেন্দ্র। এর মধ্যে ৮৭ নম্বর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার আমিনুল ইসলাম জানান, এ কেন্দ্রে ৩ হাজার ৫১৬ জন ভোটার। দুপুর ২টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৫১২টি। ৮৬ নম্বর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার তারেক ইয়াসিন জানান, মোট ভোটার ৩ হাজার ৯ জন। ২টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৪৮০টি। ৮৪ নম্বর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার ইসহাক মোল্লা জানান, তার কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ৯৮১। ২টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ২৪৯টি। ৮৫ নম্বর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা মিরন কুমার সাহা জানান, ৩ হাজার ৩৭২ ভোটের মধ্যে ২টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ হয়েছে ২৮৮টি।

মাদারটেকের বাগানবাড়ী আদর্শ বিদ্যালয়ে দুটি ভোটকেন্দ্র। এর মধ্যে ৯১ নম্বর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার ফয়েজ মাহমুদ জানান, ২ হাজার ২২০ জন ভোটার রয়েছে। ২টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৫০০টি। ৯২ নম্বর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার আবু রাসেল জানান, তার কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা ২ হাজার ৫৯৬। ২টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৩৬১টি।

এর আগে কয়েকটি কেন্দ্রে ভোট কাস্টিংয়ের তথ্য হচ্ছে, ঢাকা-৯ আসনের খিলগাঁও মডেল হাই স্কুলে তিনটি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ১ নম্বর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার মো. সোলায়মান জানান, ১১টা পর্যন্ত ৯০টির মতো ভোট পড়েছে। ২ নম্বর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার জাহিদ হাসান জানান, ১১টা পর্যন্ত ২ হাজার ৪১৪ ভোটের মধ্যে ১০০-এর কাছাকাছি ভোট পড়েছে। ৩ নম্বর কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার সামিউল ইসলাম জানান, তার কেন্দ্রে ২ হাজার ৭৫৬ জন ভোটারের মধ্যে বেলা ১১টা পর্যন্ত ৬০টির মতো ভোট পড়েছে।

এসসি ন্যাশনাল মডেল হাই স্কুল কেন্দ্রে ২ হাজার ১৯১ জন ভোটার। প্রিসাইডিং অফিসার নাদিম হাসান জানান, ১১টা পর্যন্ত ৮৭টি ভোট পড়েছে। পাশেই মদিনাবাগ কিন্ডারগার্টেন কেন্দ্রে ২ হাজার ৬৯৩ ভোটারের মধ্যে ১১টা পর্যন্ত ১৮৬টি ভোট পড়েছে বলে জানান প্রিসাইডিং অফিসার শরিফ আহমেদ।

নির্বাচন কমিশনের সচিব মো. জাহাংগীর আলম গতকাল বিকেল ৩টার দিকে সংবাদ সম্মেলনে জানান, সকাল ৮টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ঢাকা সারা দেশের বিভাগভিত্তিক ভোটের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ২৫ শতাংশ, চট্টগ্রামে ২৭ শতাংশ, সিলেটে ২২ শতাংশ, বরিশালে ৩১ শতাংশ, খুলনায় ৩২ শতাংশ, রাজশাহী ২৬ শতাংশ, ময়মনসিংহে ২৯ শতাংশ ভোট পড়েছে।

ঢাকার বাইরে থেকে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবরেও এ হারে ভোট পড়ার চিত্র পাওয়া গেছে।

আমাদের আঞ্চলিক প্রতিনিধি জানিয়েছেন, কুমিল্লা-১০ (নাঙ্গলকোট, লালমাই ও সদর দক্ষিণ উপজেলা) আসনের নাঙ্গলকোট পৌর সদরের বাতুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল ৯টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ছয়টি বুথে ১১টি ভোট পড়ে। অর্থাৎ সকাল ৮টায় ভোট শুরুর পর দেড় ঘণ্টায় এ কয়টি ভোট পড়েছে। একই সময় মৌকরা ইউনিয়নের ময়ূরা উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে ভোট পড়েছে তিনটি। উপজেলার বক্সগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোট পড়েছে ৩১৪ ভোট। ওই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং কর্মকর্তা সজল বড়ুয়া জানান, এ কেন্দ্রে ৩ হাজার ৯০৫ জন ভোটার আট বুথে ভোট দিয়েছেন।

গাজীপুর প্রতিনিধি জানিয়েছেন, গাজীপুর-২ আসনে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভোটারদের উপস্থিতি ছিল কম। গাজীপুর মহানগরীর চান্দনা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে পুরুষ কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার সোলাইমান মিয়া জানান, তার কেন্দ্রে ভোটার রয়েছে ৩ হাজার ৮০ জন। কিন্তু বেলা সাড়ে ১১টা পর্যন্ত ভোট দিয়েছেন ১১৩ জন।

একই স্থানের মহিলা কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার এরশাদ আলী জানান, তার কেন্দ্রে ২ হাজার ৮৯০ ভোটারের মধ্যে একই সময় পর্যন্ত ৮৫টি ভোট পড়েছে।