দেশের অর্থসংকটের সময়ে রেকর্ড ঋণ পাওয়ার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বাংলাদেশ। প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতার কারণে অর্থছাড় কম হলেও ঋণদাতা সংস্থাগুলো তাদের ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাড়িয়েছে। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে সবচেয়ে বেশি ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)। প্রতিশ্রুতিতে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও অর্থছাড়ে শীর্ষে রয়েছে জাপান। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন সহযোগী এডিবি। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এ সংস্থাটি ঋণ প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ২০৬ কোটি ডলারের। এ সংস্থাটির পাইপলাইনে রয়েছে ২৬৯ কোটি ২০ লাখ ডলার। তবে এ সময়ে সংস্থাটি অর্থছাড় করেছে ৪৪ কোটি ৪২ লাখ ডলারের। চলতি অর্থবছর ১৯৭ কোটি ডলারের বাজেট সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে এডিবির।
বাংলাদেশ ১৯৭৩ সালে সদস্যলাভের পর থেকে এডিবি থেকে অর্থনীতির অগ্রাধিকারভুক্ত বিভিন্ন খাতে ধারাবাহিকভাবে আর্থিক সহায়তা পেয়ে আসছে। এডিবি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারকে ৩ হাজার ১৪৭ কোটি ৬৪ লাখ ডলারের ঋণ সহায়তা ও ৫৭ কোটি ১২ লাখ ডলারের অনুদান দিয়েছে। বাংলাদেশে উন্নয়ন সহায়তার ক্ষেত্রে এডিবি সাধারণত বিদ্যুৎ, জ্বালানি, পরিবহন, শিক্ষা, স্থানীয় সরকার, কৃষি, পানিসম্পদ ও সুশাসনকে প্রাধান্য দেয়।
ঋণের প্রতিশ্রুতিতে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে জাপান। এ দেশটির কাছ থেকে বাংলাদেশ এক সময় স্বল্প সুদে ঋণ পেয়ে থাকলেও এখন ঋণের সুদের হার বাড়িয়েছে। অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশটির কাছ থেকে ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে ১৫০ কোটি ডলারের। তবে অর্থছাড়ের দিক থেকে দেশটির অবস্থান শীর্ষে। এ সময়ে তারা বিভিন্ন প্রকল্পে অর্থছাড় করেছে ৬১ কোটি ডলারের।
দ্বিপক্ষীয় পর্যায়ে জাপান বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উন্নয়ন সহযোগী দেশ। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত জাপান সরকার বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে বিভিন্ন খাতে উল্লেখযোগ্য সহায়তা প্রদান করেছে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে বাংলাদেশ সরকারের অগ্রাধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে জাপান সরকার অবকাঠামো উন্নয়ন, যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন, পল্লী উন্নয়ন, পরিবেশ উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে প্রকল্প বাস্তবায়নে ঋণ ও অনুদান দেয়। স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ১৮৪ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি প্রদান করা হয়েছে। ২০২২ সাল পর্যন্ত জাপানের কাছ থেকে ১ হাজার ৮৫১ কোটি ডলারের অর্থছাড় পেয়েছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সহযোগী সংস্থা বিশ্বব্যাংক। এ সংস্থাটির কাছ থেকেও উল্লেখযোগ ঋণ প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বিশ্বব্যাংকের কাছ থেকে ৩০ কোটি ডলারের প্রতিশ্রুতি এলেও চলতি অর্থবছরের একই সময়ে প্রতিশ্রুতি এসেছে ১৪১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের। তবে ঋণের অর্থছাড়ের ক্ষেত্রে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে এ সংস্থাটি। আলোচিত সময়ে এ সংস্থাটির কাছ থেকে অর্থছাড়ের পরিমাণ ৩৮ কোটি ৭৯ লাখ ডলারের।
বাংলাাদেশ সাধারণত বিশ্বব্যাংকের ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন (আইডিএ) থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৫৭টি প্রকল্পে ১ হাজার ৬৪৬ কোটি ডলারের বৃহত্তম চলমান আইডিএ প্রোগ্রাম রয়েছে। বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে সহায়তা করার জন্য প্রথম উন্নয়ন অংশীদারদের মধ্যে একটি। স্বাধীনতার পর থেকে ৪ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি অনুদান, সুদমুক্ত এবং রেয়াতি ঋণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
অর্থনীতিতে বাংলাদেশের সংকটকাল চলছে। এ মুহূর্তে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ তলানির দিকে হাঁটছে। দেশের এ ক্রান্তিলগ্নে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা অর্থছাড় কমিয়ে দিলেও এ তিনটি সংস্থা নিয়মিত অর্থছাড় করে যাচ্ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও নিয়মিত অর্থছাড় ও ঋণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
২০২৩ সালের শুরুটা হয়েছিল প্রায় ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলারের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে। এই হিসাব অবশ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের গতানুগতিক হিসাব পদ্ধতি। তখন রিজার্ভ গণনায় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) হিসাব পদ্ধতি ছিল না। গত এক বছরে রিজার্ভ শুধু কমেছে। সর্বশেষ ডিসেম্বর মাসের শেষে আইএমএফের বিপিএম-৬ হিসাব পদ্ধতি অনুসারে, রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৪৪ কোটি ডলার।
বিদেশি ঋণ পরিশোধে ধীরে ধীরে চাপ বাড়ছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে বিদেশি ঋণ পরিশোধ ৫১ শতাংশ বেড়েছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে বিদেশি ঋণের সুদাসল পরিশোধ করতে হয়েছে ১৩৩ কোটি ডলার, যা এর আগের ২০২২-২৩ অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৮৮ কোটি ডলার।
গত জুলাই-নভেম্বরে সব মিলিয়ে ২১১ কোটি ডলারের বিদেশি সাহায্য এসেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৩৩ কোটি ডলার কম।
দুবছর ধরেই বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়েছে। নতুন বছরেও এই চাপ অব্যাহত থাকবে। ইআরডির হিসাবে, চলতি অর্থবছরে প্রথমবারের মতো বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ ৩০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে। গত বছর বিদেশি ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে ২৬৭ কোটি ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৩২ শতাংশ বেশি। মূলত চীন ও রাশিয়ার ঋণের কারণেই বিদেশি ঋণ পরিশোধের পরিমাণ বাড়ছে।