উচ্চ মূল্যস্ফীতির জেরে যুক্তরাজ্যের ভোগ ব্যয় কমে যাওয়ায় পোশাক কেনা কমিয়ে দিয়েছেন দেশটির নাগরিকরা। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পোশাক আমদানি কমে গেছে দেশটিতে। এক বছরের ব্যবধানে যুক্তরাজ্যের পোশাক আমদানি কমেছে ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে এ সময় অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে কমলেও বাংলাদেশ থেকে আমদানি সে হারে কমেনি। মূলত কম দামি পোশাক রপ্তানি করে যুক্তরাজ্যের বাজার ধরে রেখেছে বাংলাদেশ।
যুক্তরাজ্য সবচেয়ে বেশি পোশাক আমদানি করে চীন থেকে। কিন্তু কেজির হিসাবে সবচেয়ে বেশি পোশাক কেনে বাংলাদেশ থেকে। তবে বাংলাদেশ থেকে কম দামি পোশাক নেওয়ায় যুক্তরাজ্যের আমদানিতে দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ। তবে দেশটিতে শীর্ষ রপ্তানিকারক চীনের যে হারে পোশাক রপ্তানি কমেছে, সে হারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেনি।
২০২৩ সালের শুরুর দিকে পোশাকের ইতিবাচক প্রবৃদ্ধির আশা করেছিল যুক্তরাজ্য। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সদ্য শেষ হওয়া বছরের জানুয়ারি-অক্টোবর সময়ে মধ্যে যুক্তরাজ্যের বৈশ্বিক পোশাক আমদানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মূল্যের (ডলারে) দিক থেকে ১৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ কম। একই সঙ্গে পরিমাণের দিক থেকে ১২ দশমিক ২ শতাংশ কমেছে।
২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের পোশাক আমদানির চিত্রে দেখা যায়, দেশটিতে এ সময়ে সারা বিশ্ব থেকে পোশাক আমদানি হয়েছে ১২ বিলিয়ন ডলারের। আগের বছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ১৪ দশমিক ৪৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ বছরের ব্যবধানে তারা পোশাক আমদানি কমেছে ১৬ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
আলোচিত সময়ে যুক্তরাজ্য যে পরিমাণের পোশাক আমদানি করেছে, তার ২৮ শতাংশ ছিল বাংলাদেশের। তবে মূল্যের দিক থেকে যুক্তরাজ্যের আমদানি করা পোশাকের ২৩ শতাংশের হিস্যা রয়েছে বাংলাদেশের। আলোচিত সময়ে দেশটি বাংলাদেশের কাছ থেকে পোশাক আমদানি করেছে ৩০১ কোটি ডলারের, আগের বছরে যা ছিল ৩৩০ কোটি ডলারের। দেশটিতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি কমেছে প্রায় ৯ শতাংশ।
যুক্তরাজ্যে সবচেয়ে বেশি পোশাক রপ্তানি করেছে চীন, ৩১৮ কোটি ডলারের, যা আগের বছরের একই সময়ে তা ছিল ৪০২ কোটি ডলারের বেশি। অর্থাৎ ২০২৩ সালের জানুয়ারি-অক্টোবর সময়ে চীনের পোশাক রপ্তানি কমেছে ২১ শতাংশ। কেজির হিসাবে যুক্তরাজ্যে চীন রপ্তানি করেছে ১৫ কোটি ৯২ লাখ কেজি, যেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি ১৭ কোটি ৮০ লাখ কেজির বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশ বেশি পোশাক রপ্তানি করেও, কম দামি পোশাক হওয়ায় রপ্তানি আয়ের দিক থেকে চীনের পরেই অবস্থান করতে হচ্ছে। আর এই কম দামি পোশাকের কারণেই উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে নাকাল যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের পোশাকের বাজার সংকুচিত হয়েছে কম।
যুক্তরাজ্যে কম দামে পোশাক রপ্তানি প্রসঙ্গে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, যখন আমরা যুক্তরাজ্যের পোশাক আমদানির গড় মূল্য ক্যালকুলেট করি, তখন বাংলাদেশ অন্যান্য প্রতিযোগীদের তুলনায় সর্বনিম্ন মূল্য অফার করে। আমাদের গড় মূল্য চীনের তুলনায় ২১ দশমিক ৩৯ শতাংশ কম, তুরস্কের তুলনায় ৩২ শতাংশ এবং এমনকি ভারতের তুলনায় ২৬ দশমিক ৭৫ শতাংশ কম। তিনি বলেন, এটি শুধুমাত্র আমরা যে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে নেই, তার প্রমাণ করে, তা নয়; একইসঙ্গে বাজারের মধ্য-উচ্চমূল্যের বিভাগে আমাদের অনুপস্থিতিকেও নিদারুণভাবে প্রতীয়মান করে। এ মুহূর্তে শিল্পকে আরও এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের উচিত হবে, মধ্য-উচ্চমূল্যের সেগমেন্টটি করায়ত্ত করার কৌশল নির্ধারণ করা।
২০২৩ সালের ডিসেম্বরের শেষের দিকে হলিডে সেলস পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের রিটেইল সেলস-এর (খুচরা বিক্রয়ের) একটি অন্ধকার চিত্র তুলে ধরে। অন্যদিকে আমদানিতে মূল্য এবং পরিমাণের দিক থেকে এই ব্যবধান মূল্য স্তর বাড়ানোর জন্য চাপ তৈরি করেছে, যা আমাদের জন্য উদ্বেগজনক।
২০২৩ সালের প্রথম ৯ মাসে প্রবৃদ্ধির হিসাবে যুক্তরাজ্যে পোশাক রপ্তানি সবচেয়ে বেশি কমেছে তুরস্কের। আলোচিত সময়ে তুরস্ক থেকে যুক্তরাজ্যে পোশাক আমদানি কমেছে প্রায় ২৮ শতাংশ। এ সময়ে শ্রীলঙ্কা থেকে আমদানি কমেছে ২৪ দশমিক ১৮ শতাংশ। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া ২৩ শতাংশ, পাকিস্তান ১৩ দশমিক ২ শতাংশ, ভিয়েতনাম ১২ দশমিক ৬ শতাংশ, ভারত ১২ শতাংশ ও কম্বোডিয়া থেকে ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ আমদানি কমেছে যুক্তরাজ্যে।
ফারুক হাসান বলেন, যুক্তরাজ্যের বাজারে আমাদের এখনো সুযোগ রয়েছে। এখন পর্যন্ত আমরা সম্ভাব্য ব্যয় সাশ্রয়, সময়মতো পণ্য ডেলিভারি এবং গুণমান বজায় রাখার মাধ্যমে আমাদের অবস্থান সুরক্ষিত রাখতে সক্ষম হয়েছি, যা আমাদের ফ্যাশন বিশ্বে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রেখেছে।
তিনি বলেন, যেহেতু আমরা স্যাচুরেশন পয়েন্টের কাছাকাছি চলে এসেছি এবং আগামী দশকগুলোতে বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতি এবং প্রতিযোগিতার দৃশ্যপট বদলে যাবে, এ পরিস্থিতিতে বিশ্ববাজারে আরও অংশ করায়ত্ত করা এবং প্রবৃদ্ধি টেকসই রাখার মূল চাবিকাঠি হবে ব্যাকওয়ার্ড ও ফরওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে সক্ষমতা অর্জন করে উচ্চ মূল্য সংযোজনকারী পণ্যে যাওয়া ও উচ্চ মূল্যের বাজারগুলো সম্প্রসারণ করা। যখন আমরা বলি ‘উচ্চ মূল্য সংযোজন’, তখন শব্দটিকে প্রায়শই আউটারওয়্যার, লনজারি, একটিভওয়্যার ইত্যাদির মতো আইটেমগুলোতে আবদ্ধ করে শব্দটির ভুল ব্যাখ্যা করা হয়। আসলে, আমরা বাজারের মধ্য-উচ্চ মূল্যের সেগমেন্টে গিয়ে উচ্চ মূল্য সংযোজন করতে পারি, যেখানে কিনা একটি টি-শার্ট বা পোলো-শার্ট শুধুমাত্র জটিল প্রক্রিয়ার (যেমন, অ্যাডভান্সড ফেব্রিকেশন, এমব্রয়ডারি, প্রিন্টিং, এমনকি ফাংকশনালিটি) কারণেই উচ্চতর এফ.ও.বি আয় করতে পারে।