তিনি কৃষকের সন্তান। দুঃখ-কষ্ট-যন্ত্রণায় কেটেছে স্কুল ও কলেজজীবন। অসম্ভব মেধাবী এই আলোকিত মানুষটি ছুঁয়ে এসেছেন স্বপ্ন জাগানিয়া শীর্ষাসন। দীর্ঘ চাকরিজীবনের পথপরিক্রমায় ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ইমেরিটাস অধ্যাপক। এ পর্যন্ত লিখেছেন ১০০ বই। আসছে বইমেলায় প্রকাশিত হতে যাচ্ছে ৫টি নতুন বই। মৃদুভাষী, হাস্যোজ্জ্বল ড. আতিউর রহমান এসেছিলেন দেশ রূপান্তরের আড্ডায়। সকালের সেই হৈ-হুল্লোড়ে ছিলেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, আলোকচিত্র সম্পাদক সাহাদাত পারভেজ, সিনিয়র সহ-সম্পাদক সালাহউদ্দিন শুভ্র ও স্টাফ রিপোর্টার ইমদাদ হোসাইন। ক্যামেরার বাইরে ছিলেন কনটেন্ট এডিটর নরুস সাফা
তখনো ক্যামেরা রোলিং হয়নি। শুরুর আগের কথা। সবাই বিভিন্ন প্রশ্ন করছেন। ড. আতিউর রহমান হাসিমুখে সেসব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। এলোমেলা সব কথা। তিনি বলছেন, কত ছাত্রছাত্রী যে দেখেছি। ওদের প্রশিক্ষণ দিতাম। এখন সেই ছেলেমেয়েরা অনেক ওপরে উঠে গেছে। কথার ফাঁকে সাহাদাত পারভেজ বললেন কিন্তু স্যার, আপনারই তো বয়স বাড়ল না! হাহাহাহাহা। সশব্দে হেসে আতিউর রহমান বললেন দোয়া করো, আর যেন না বাড়ে। এক জায়গায় আটকে থাকুক। হো হো করে হাসলেন সবাই।
তখনো সালাহউদ্দিন শুভ্র আসেনি। এমন সময় তাপস রায়হান বললেন আমরা না হয় শুরু করি। এরপর ও এসে জয়েন করবে। ড. আতিউর রহমান বললেন হ্যাঁ, আমি আরেকটা জায়গায় যাব। শুরু করো। ক্যামেরার দায়িত্বে কনটেন্ট এডিটর নরুস সাফা বললেন ৩, ২, ১, ০ অ্যাকশন। শুরু হলো কথা বলা। তাপস রায়হান আড্ডার ভূমিকা দিলেন। এরপর ড. আতিউর রহমানের উদ্দেশে বললেন
তাপস রায়হান : আমরা অনেকেই আপনার আর্থিক সংগ্রামের কথা জানি। সেই শৈশব, কৈশোর, তারুণ্যের যে ভয়াবহ জীবন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আপনি আজ এই জায়গায়, তা আমাদের জন্য অফুরন্ত প্রেরণার। সেদিকে আমরা যাচ্ছি না। আমরা জানি, সারভাইবল অব দ্য ফিটেস্ট। আপনি কীভাবে দেখেন বিষয়টি?
ড. আতিউর রহমান : আসলে সংগ্রাম করে করে বড় হওয়ার আনন্দই আলাদা। আমরা যারা একেবারেই অজানা, অপরিচিত পরিবেশ থেকে আজকে নগরের এই পাদপ্রদীপে আসতে পেরেছি, নিশ্চয়ই সেই জার্নিটা কিন্তু সহজ ছিল না। আমি এতদূর আসতে পেরেছি, তার একটা বড় কারণ কিন্তু লেগে থাকা এবং আরেকটি হচ্ছে ভালো শিক্ষক। সেই গ্রামের মধ্যে প্রাথমিক স্কুলে আমরা যে শিক্ষক পেয়েছিলাম, সেই শিক্ষকের যে কোয়ালিটি আজকে আর পাই না। সেই যে গুণমানের শিক্ষক তারাই কিন্তু চাবি মেরে আমাদের ছেড়ে দিয়েছেন। আমরা যারা অদম্য মানুষ, এত দূর আসতে পেরেছি কেবল তাদের জন্যই। শুধু প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষক না। পরবর্তীকালে আমরা যখন মাধ্যমিক, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এসেছি প্রতিটি ক্ষেত্রে আমি লক্ষ করেছি একজন ছাত্রের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভালো শিক্ষকের যে অবদান সেটা বর্ণনার অতীত। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল, একেবারে অজপাড়াগাঁয়ের একজন ছাত্র হিসেবে আমি ক্যাডেট কলেজে পড়ার সুযোগ পাই। এখন যেটা মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ। তখন সেটা ছিল, মোমেনশাহী ক্যাডেট কলেজ। সেখানের প্রিন্সিপাল ছিলেন মি. এম. ডব্লিউ পিট। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ, অক্সফোর্ডের স্নাতক। নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে না দেখলে কখনোই বুঝতাম না, একজন শিক্ষক কী মানের হতে পারে! কী দরদ দিয়ে তার ছাত্রদের আগলে রাখেন। তার সঙ্গে আরও একদল শিক্ষক যুক্ত হয়েছিলেন। তাদের সবার প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাই। কলেজ থেকে বের হয়ে যখন ’৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলাম, দেখলাম সেখানের একেকজন শিক্ষক যেন নক্ষত্র। প্রফেসর রেহমান সোবহান, প্রফেসর নুরুল ইসলাম, প্রফেসর আনিসুর রহমান, প্রফেসর মোশাররফ হোসেন স্যার ছাড়াও একদল তরুণ মেধাবী শিক্ষকের সান্নিধ্য আমরা পেয়েছি। আমি অসম্ভব কৃতজ্ঞ, আজকে তাদের কারণেই আমি এই পর্যায়ে। সেই ঋণ কোনোদিন শোধ করতে পারব না।
সাহাদাত পারভেজ : প্রাইমারি স্কুলের কোনো শিক্ষকের কথা মনে পড়ে?
ড. আতিউর রহমান : খুব মনে আছে। প্রাইমারি স্কুলের একজন শিক্ষক ছিলেন, ফয়েজ মৌলবী স্যার। তিনি এতটাই ভালো গণিত শেখাতেন যে, আজও স্যারকে ভুলতে পারি না। তিনি শুধু ভালো শিক্ষক ছিলেন না, ভালো মানুষ ছিলেন। এখন বুঝি ভালো শিক্ষক হতে গেলে, আগে ভালো মানুষ হতে হয়। যখন আমার খুব সংকটকাল, তখনো তিনি আমার পাশে ছিলেন। জীবনের শুরু থেকেই আমি ভয়াবহ আর্থিক কষ্টের মধ্য দিয়ে এসেছি একটা পর্যায় পর্যন্ত। একটা কৃষি পরিবারের সন্তান আমি। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার। অনেক ভাইবোন আমরা। সামান্য জমি। সেই জমি দিয়ে তো সংসার চলত না। উদ্বৃত্ত তো দূরের কথা। খুবই কষ্টের ছিল সেই জীবন। সেখান থেকে আমরা বের হয়ে এসেছি, একমাত্র মেধার জোরে এবং শিক্ষকদের অবদানের কারণে।
সাহাদাত পারভেজ : আপনার বাবা-মায়ের কথা একটু যদি বলতেন?
ড. আতিউর রহমান : আমার বাবা ছিলেন একজন কৃষক। সেই অর্থে তিনি লেখাপড়াও জানতেন না। কিন্তু আমার মা, সামান্য লেখাপড়া জানতেন। চিঠি লিখতে পাারতেন। খুব বুদ্ধিমতী ছিলেন। পারিবারিক নেতৃত্ব দিতেন মা-ই।
লেখাপড়ার ঝোঁকটা মায়ের কাছ থেকেই পেয়েছি। পরিবারে তো অনেক অভাব-অনটন ছিল। আমার বড় ভাই এই কারণে পড়াশোনাই করতে পারেনি। আমার পড়াশোনাও কিন্তু বছরখানেকের মতো বন্ধ ছিল। আমরা ছিলাম ৫ ভাই, ৩ বোন।
তাপস রায়হান : আমরা একটু আপনার কর্মজীবনের দিকে আসি?
ড. আতিউর রহমান : (তিনি হেসে বললেন) বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার বের হওয়ার কথা ছিল ’৭৪ সালে। বের হলাম ’৭৬ সালে। মাস্টার্সে তো ফার্স্ট ক্লাস পেলাম। এর আগের বছর অনার্সে সেকেন্ড ক্লাস ফার্স্ট হলাম। আমি অনার্স পরীক্ষা পর্যন্ত ডেইলি পিপল পত্রিকায় কাজ করতাম। সহকারী সম্পাদক ছিলাম। সেখান থেকে মাসে ২৫০-৩০০ টাকা পেতাম। সেই টাকা দিয়ে হোস্টেল জীবন তো চলতই, কিছু বাড়িতেও পাঠাতাম। তাই দিয়ে ভালোই চলছিলাম। কিন্তু অনার্স পরীক্ষার আগে পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যায়। অনেক কষ্ট করে পরীক্ষা দিলাম। কিন্তু এরপর কী করব? খুব চিন্তায় পড়ে গেলাম। তখন একজন স্যার একটা চাকরির জন্য চিঠি লিখে দিলেন, পটর্যটন চেয়ারম্যানের কাছে। তখন চেয়ারম্যান ছিলেন রফিকউল্লাহ চৌধুরী। আমাদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর বাবা। আরেক জন স্যার ছিলেন, মোশাররফ স্যার, তিনি টেলিফোন করে দিলেন। আমি গেলাম। এরপর তিনি লিখে দিলেন, তাকে প্লানিং কমিশনে এক্সিকিউটিভ অফিসার পদে নিয়োগ দেওয়া হোক। কিন্তু আমলাতন্ত্র তো নড়ে না। প্রায়ই সচিবের কাছে যাই। তিনি বলেন লিখে তো দিয়েছেন। কিন্তু দেখতে হবে। এই করতে হবে, সেই করতে হবে। এভাবে এক সময় বেশ ক্লান্ত হয়ে গেলাম। তখন পরিচালক ছিলেন হেমায়েত সাহেব। তাকে বললাম স্যার, চেয়ারম্যান তো লিখে দিয়েছেন। কিন্তু সচিবালয় থেকে তো কোনো সাড়া পাচ্ছি না। আমার তো না খেয়ে থাকতে হবে। এখন আমি কী করব? এরপর তিনি সচিবকে বললেন। কেন তার চিঠি দিচ্ছ না? তারপর চিঠি পেলাম। ফুল টাইম প্ল্যানিং অফিসার হলাম। মনে আছে, সূর্যসেন হল থেকে পুরনো একটা কোট আর টাই পকেটে নিয়ে বের হতাম। মাঝপথে পরতাম। আবার হলে আসার আগে টাই খুলে ফেলতাম। কোনো ছাত্র যাতে না দেখে। এরপর বিকেলে এসে ক্লাস পেলে করতাম। এভাবে বন্ধুদের সহযোগিতায় মাস্টার্স করলাম। এরপর বিআইডিএসে গবেষণা কর্মকর্তা হিসেবে জয়েন করলাম। সেটা ১৯৭৬ সালের কথা। তারপর সেখান থেকে কমনওয়েলথ স্কলারশিপে ’৭৮ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করতে গেলাম। স্কলারশিপটা ছিল ৩ বছরের। প্রথম বছর মাস্টার্স। ২ বছর পিএইচডি। ২ বছরে তো পিএইচডি করা কঠিন। এরপর দেশে চলে এলাম।
সাহাদাত পারভেজ: মনে হয় এতক্ষণ একটা ছোট গল্প শুনছিলাম?
ড. আতিউর রহমান: আসলে আমাকে তো এ ধরনের প্রশ্ন কেউ করেনি। তাই বলাও হয়নি।
তাপস রায়হান: এ কারণে কি শিক্ষক পরিচয় দিতেই খুব ভালো লাগে?
ড. আতিউর রহমান: একদম। সারাটা জীবন আমি শিক্ষকদের কাছ থেকে অনেক পেয়েছি। এই পেশার প্রতি সবসময়ই একটা মোহ কাজ করে। আমি যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলাম, আমাকে একজন সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেছিলেন, স্যার, আপনার শেষ পরিচয়টা কী দিতে চান? আমি বলেছিলাম আমি যেন একজন ভালো শিক্ষক হিসেবে মারা যেতে পারি। (হাসতে হাসতে বললেন) আমার শিক্ষক পরিচয়টা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে, গভর্নর পরিচয়ের কাছে। আজকে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক। ১০০ বছরে মাত্র ১২ জন হয়েছেন, ইমেরিটাস অধ্যাপক। আমি তাদের একজন। আর তোমরা শুধু বলো, আমি একজন গভর্নর! হা হা হা হা হা। হাসতে হাসতে বললেন, তোমরাও আমার ছাত্র। শুধু ক্লাসের স্টুডেন্টরাই যে স্টুডেন্ট তা তো নয়। আমার জীবনঘন স্টুডেন্ট প্রচুর, লাখ লাখ।
তাপস রায়হান: আমরা একটু বর্তমান রাজনীতি, অর্থনীতি বিষয়ে যাই? সামনে অর্থনীতি এবং রাজনীতির একটা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সেটা কীভাবে মোকাবিলা করতে হবে?
ড. আতিউর রহমান: ভালোই হলো যে, ভালোমতো নির্বাচন হয়ে গেল। আবার নতুন সরকার হলো। কারণ হচ্ছে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না
থাকলে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা খুব কঠিন। সমাজে বিভিন্ন রকম অশান্তি দেখা দেয়। অ্যাট লিস্ট একটা নেসেসারি কন্ডিশন আমরা পূরণ করেছি। এখন সাফেসিয়েন্ট কন্ডিশনটা হবে, বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ আমরা কীভাবে মোকাবিলা করব? ২০২৩ সাল অর্থনীতির ক্ষেত্রে খুব চ্যালেঞ্জিং ছিল। প্রথমে যেটা লক্ষ করেছি, সেটা হলো মূল্যস্ফীতি। তখন মূল্যস্ফীতি কিন্তু প্রায় ১০ শতাংশে চলে গিয়েছিল। এরপর এটা চলে যায় ১২-এর ওপর। সেখান থেকে আমরা আস্তে আস্তে কমাচ্ছি। কিন্তু এখনো স্বস্তির জায়গায় আসতে পারিনি। এ বছরে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ হবে, মূল্যস্ফীতিকে কীভাবে বাগে আনা যায়। এটা এমন একটা জিন, এটাকে বোতলে ভরা বেশ কঠিন। যারা অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেবেন, তাদের জন্য একটা চ্যালেঞ্জিং সময় অপেক্ষা করছে। এক নম্বর চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, মূল্যস্ফীতিকে বাগে নিয়ে আসা। এই মূল্যস্ফীতি গরিবের শত্রু। মূল্যস্ফীতি মধ্যবিত্তের পকেট কাটে। এই মূল্যস্ফীতি সমাজে এক ধরনের অশান্তি তৈরি করে। এটা কী করে সামলানো যায়? সেটাও কিন্তু আমরা জানি। মুদ্রানীতি এবং রাজস্বনীতির মধ্যে একটা ভালো সমন্বয় করতে হবে। আমাদের পলিসি রেটটা বাড়াতে হবে। যতই বাড়াব ততই মূল্যস্ফীতি বাগে আসবে। আমরা পলিসি রেট বাড়িয়েছি। হয়তো আরও বাড়াতে হবে। শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে আমাদের মতো দেশে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায় না। সাপ্লাই চেন আরও বাড়াতে হবে। বর্তমান সরকার কৃষিকে খুব গুরুত্ব দিয়েছে। প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে গত ১৫ বছরে। তাতে কিন্তু কৃষি উৎপাদন বেড়েছে। উৎপাদন বাড়লেই আবার মূল্যস্ফীািত কমানো যায় না। মানুষের হাতে টাকা না থাকলে লাভ হবে না। যারা মূল্যস্ফীতির শিকার তাদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা কমসূচি নিতে হবে। আমাদের এক্সচেঞ্জ রেট নমনীয় রাখতে হবে। আমাদের বিনিময় হারে একটা করিডর তৈরি করতে হবে। ফিসকাল পলিসি বা রাজস্বনীতিতেও সংকোচন করতে হবে। আয় বুঝে ব্যয় করতে হবে। আমার বিশ্বাস, সরকার এটা বোঝে। যে কারণে বাজেট ঘাটতিটা একটা নিয়মের মধ্যে রয়েছে।
ইমদাদ হোসাইন: আমাদের মতো দেশে পলিসি রেট বাড়ালে আমদানিতে কোনো প্রভাব পড়বে?
ড. আতিউর রহমান: গত এক বছরে ২০ শতাংশের মতো আমদানি কমে গেছে। এটা ম্যাক্রো ইকোনমির স্ট্যাবিলিটির জন্য হয়তো দরকার ছিল। কিন্তু এটাও ভুলে গেলে চলবে না, প্রতিটি আমদানির সঙ্গে রপ্তানি জড়িত। রপ্তানির ওপর যাতে বেশি প্রভাব না পড়ে, সেজন্য খুব কৌশলে অগ্রসর হতে হবে। কোন বিষয়টিকে আমি বেশি চাপ দেব। আমাদের দুর্ভাগ্য, আমরা চাইলে গত বছর মার্সিডিজ, অডি গাড়ি আমদানি বন্ধ রাখতে পারতাম। যদি তা করতাম, তাহলে আমদানির ওপর চাপ কমে আসত। বিলাসী পণ্য আমদানি না করলে কি এমন হতো?
ইমদাদ হোসাইন: ডলারের একটা সংকট চলছে। দেশে রিজার্ভ সংকট চলছে। এই রিজার্ভ বাড়ানোর উপায়টা কী?
ড. আতিউর রহমান: একটাই উপায়, ডলারের প্রবাহ আরও বাড়াতে হবে। এটা কয়েকভাবেই করা যায়। একটা স্মার্ট বিনিময় হার আমরা করতে পারি। আমার মনে হয়, বাংলাদেশে ব্যাংক সেই পথেই হাঁটছে।
সালাহউদ্দিন শুভ্র: বাজার সিন্ডিকেট নিয়ে বলতে চাইছি? এ বিষয়টা নিয়ে যদি কিছু বলতেন?
ড. আতিউর রহমান: আমি ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটা ব্যবহার করতে চাইছি না। আসলে মার্কেট ফেইলিউর হচ্ছে। মানে প্রতিযোগিতা হচ্ছে না। কয়েকজন মিলে বাজারটা নিয়ন্ত্রণ করছে। সব ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতার অভাব। যে কারণে এইরকম।
সাহাদাত পারভেজ: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সমবায়’ বিষয়টা আড়ালেই রয়ে গেছে। তার সামাজিক গবেষণা নিয়ে জানতে চাইছি?
ড. আতিউর রহমান: এ বিষয়ে এতক্ষণ পড়ে তোমরা কথা বললা? এটা নিয়ে আমার বই আছে। আমি আনন্দিত এই কারণে যে, তার বহু পরিচয়ের ভেতরে যে একজন অর্থনীতিবিদ রয়েছে, সেটা আমরা কেউ আবিষ্কার করিনি। তার এই পরিচয় কিন্তু বাংলাদেশে রয়েছে। খুব গভীরভাবে তিনি গরিবের দুঃখ-যন্ত্রণা উপলব্ধি করেছেন। তিনি সমাজের অসংগতি চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। যেসব বৈষম্যের কারণে মানুষ সামনের দিকে অগ্রসর হতে পারে না, তা তিনি চিহ্নিত করেছেন। তিনি বলেছেন মানুষকে ঋণ বা দান করে হিত সম্ভব নয়। একটি মাত্র ঈশ্বর প্রদত্ত জিনিস আছে হিতের, সেটা হচ্ছে প্রীতি, ভালোবাসা। যে ভালোবাসা দিয়ে গ্রামের মানুষকে আমাদের বঙ্গবন্ধু দেখেছেন। তিনিই কিন্তু দুঃখী মানুষের দুঃখ মোচনের কথা বলেছেন। কথায় কথায় তিনি বলতেন, ভায়েরা আমার। এটাই প্রীতির সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথ লিখছেন, আমি এমন একজনের অপেক্ষায় আছি, যার সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে পুরো সমাজের যোগাযোগ থাকবে। তেমনি একজন বঙ্গবন্ধুকে আমরা পেয়েছিলাম। যার সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে, বাঙালি সমাজকেই জানা যেত। সেই কারণে বঙ্গবন্ধু এবং রবীন্দ্রনাথকে অর্থনীতির একজন ছাত্রকেও পড়া উচিত।
গ্রন্থনা : অনিন্দিতা আচার্য
ছবি : আবুল কালাম আজাদ
লোকেশন : গ্রিন লাউঞ্জ