শিল্পীদের আন্তরিকতা কমে গেছে

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২৪, ০৯:০৩ এএম

সময়মতোই জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আঁখি আলমগীর এলেন দেশ রূপান্তর অফিসে। কিছুক্ষণ আড্ডার পর গেলেন ছবি তুলতে। বিভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি তোলার পর এলেন ডিজিটাল রুমে। শুরু হলো প্রাণবন্ত আড্ডা। ছিলেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, অনলাইন ইনচার্জ মাহতাব হোসেন, ফটো এডিটর সাহাদাত পারভেজ এবং সহ-সম্পাদক সুমাইয়া সুগরা অনন্যা। ক্যামেরায় ছিলেন কনটেন্ট এডিটর নুরুস সাফা।

চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় মুখ আলমগীরের কন্যা আঁখি আলমগীর অভিনয়ে না গিয়ে সংগীতে কেন নিজেকে পরিচিত করলেন? আঁখি আলমগীর মুচকি হাসলেন। এমন অনেক এলোমেলো কথা চলছিল ক্যামেরা রোলিংয়ের আগে। এক সময় শুরু হলো, গুছিয়ে কথা বলা।

তাপস রায়হান : আমজাদ হোসেন পরিচালিত ‘ভাত দে’ চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৮৪ সালে। নিজেকে অভিনেত্রী হিসেবে ভাবতে কেমন লাগে?  

আঁখি আলমগীর : আমি অভিনেত্রী ছিলাম না, শিশুশিল্পী ছিলাম (প্রাণখোলা হাসি)। এরপর তো সব মিউজিক ভিডিওতেই অভিনয় করেছি। সর্বশেষ ‘এক কাপ চা’ চলচ্চিত্রেও তাই।

সুমাইয়া সুগরা অনন্যা : পড়াশোনা করেছেন কোথায়?

আঁখি আলমগীর : এসএসসি শহীদ আনোয়ার গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ, এইচএসসি শাহীন কলেজ আর বিএ পাস করি সিদ্ধেশ্বরী ডিগ্রি কলেজ থেকে। এরপর কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে ‘ল’ পড়লাম।

তাপস রায়হান : তাহলে তো হয় সেনাবাহিনী নয় ওকালতিতে যাওয়ার কথা ছিল?

আঁখি আলমগীর :  আসলেই। অনেকে বলে। আমার সব বন্ধু সামরিক বাহিনীতে। না হলে অফিসারদের স্ত্রী। আর আইনজীবী হওয়ার ড্রিম ছিল। কিন্তু ... প্রফেশনালি গান গাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। এটা হয়ে গেছে।

সুমাইয়া সুগরা অনন্যা : আপনি এএসএসসি পরীক্ষা কোন সালে দিয়েছেন?

আঁখি আলমগীর : আমার বয়স জানতে চাইছেন? হাহাহাহাহা। কোনো সমস্যা নেই। উইকিপিডিয়া দেখলেই পাওয়া যাবে। ৯১ সালে।

মাহতাব হোসেন : অভিনয়ের বিষয়ে আপনার মধ্যে এক ধরনের বিকর্ষণ কাজ করে। অভিনয়ে এলে এক ধরনের সুবিধা পেতে পারেন, এই কারণেই কি?

আঁখি আলমগীর : আপনার কেন মনে হলো যে এ রকম কথা, আমি গান গাওয়ার পরও ওঠে নাই (সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন)! (হাসতে হাসতে বললেন) আমাকে অনেক শুনতে হচ্ছে গানে যতটা এগিয়ে যাচ্ছি, এর পেছনেও পারিবারিক অবদানটাই বেশি। না হলে হয়তো এত কিছু হতো না। এই আর কী! 

তাপস রায়হান : আপনার মধ্যে কি এ রকম ভয় ছিল, বাবা নায়ক আলমগীরকে কখনো অতিক্রম করতে পারবেন না!

আঁখি আলমগীর : যে মানুষ মহিরুহ হয়ে যায় তাকে ক্রস করা কঠিন। আসলে ছেলে-মেয়েকে অন্যরা তুলনা করে তাদের সঙ্গে। কেউ তারকা হওয়ার পর তার ছেলে-মেয়ে একই প্রফেশনে গেলে সেই তুলনাটা হয়। সেই তুলনার ভয় আমার কখনো ছিল না। কারণ হচ্ছে, জিতলেও বাবার কাছে আর হারলেও বাবার কাছে।

তাপস রায়হান : মেয়ে হিসেবে নয়। একজন দর্শক হিসেবে বলেন আলমগীরের অভিনয় কেমন লাগে?

আঁখি আলমগীর : দর্শক হিসেবে বললে বলব আমার দেখা সবচেয়ে হ্যান্ডসাম হিরো হচ্ছে আলমগীর। একই সঙ্গে একজন চমৎকার অভিনেতা হচ্ছেন নায়ক আলমগীর। আর মেয়ে হিসেবে বলব চমৎকার মানুষ এবং বাবা।

মাহতাব হোসেন : আপনার মা খোশনূর আলমগীর একজন গীতিকার, লেখালেখি করেন। আপনার একসময় লেখালেখির ইচ্ছাও হয়েছিল। এখন কী অবস্থা?

আঁখি আলমগীর : আসলে ছোটবেলা থেকেই একটু একটু  ছড়া লিখতাম। হয়তো মায়ের কাছ থেকেই এটা এসেছে। কিন্তু কখনো মনে হয়নি, মায়ের মতো গুণ আমার আছে।

সাহাদাত পারভেজ : কতগুলো ছড়া লিখেছেন? বই প্রকাশিত হয়েছে?

আঁখি আলমগীর : ছোটবেলার ছড়া ৪-৫টা। সেগুলো একেবারেই শিশুতোষ। যখন যা ভালো লেগেছে, তাই নিয়ে কবিতা লিখেছি। বড় হয়ে যখন দেখলাম ছন্দ না মেলালেও কবিতা হয়, তখন আরও স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করলাম। এরপর কিছু লিখেছি। একটা বই প্রকাশিত হয়েছে।

সাহাদাত পারভেজ : কবে?

আঁখি আলমগীর : অনেক আগে। ১৯৯৭ সালে যখন প্রথম অ্যালবাম বের হলো, ‘প্রথম কলি’-এর পরের বছর।

তাপস রায়হান : আপনি প্লেব্যাক শুরু করলেন কত সালে? এ পর্যন্ত কতগুলো গান হবে?

আঁখি আলমগীর : ১৯৯৪। মনে হয়, ১০০ হবে।

মাহতাব হোসেন : সর্বশেষ কোথায় গান করলেন?

আঁখি আলমগীর : চরকির জন্য একটা ওয়েব ফিল্ম।

তাপস রায়হান : কিছুদিন আগে কক্সবাজারে একটা জমজমাট কনসার্ট করে এলেন। শুরু হয়েছিল কবে?

আঁখি আলমগীর : গানের ক্যারিয়ার যদি ৯৪ সাল থেকে হয়, তাহলে কনসার্ট করছি (একটু ভাবলেন) ৯৮ সাল থেকে। কনসার্ট নিয়ে বই লিখলে, ৩-৪ খন্ড হবে। হাহাহাহাহা।

তাপস রায়হান : আপনি অনেক বরেণ্য সংগীত পরিচালকের সঙ্গে কাজ করেছেন। সত্য সাহা, আলাউদ্দিন আলী, সুবল দাস, আনোয়ার পারভেজ, সমর দাস, খান আতাউর রহমানসহ অনেকেই। আবার এ সময়েও অনেকে আছেন। তাদের মধ্যে ফাঁরাক কেমন?

আঁখি আলমগীর : অনেক। একটা কথা বলি। যখন আমি শুরু করি, তখন আমি অনেক ছোট। যাদের সঙ্গে কাজ করেছি, তখন তারা একেকজন লিজেন্ড। তাদের সঙ্গে কাজ করার সময় এমনিতেই নার্ভাস থাকতাম। প্রথম ১০-১২ বছর প্রত্যেকটা রেকর্ডিং ছিল, আমার জন্য লার্নিং এক্সপেরিয়েন্স। শুধু স্টুডিওতে যাচ্ছি, ভয়েস দিচ্ছি, গান হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। প্রতিটি গানের রেকর্ডিংয়ে আমি তাদের কাছে শিখেছি। গান যেমনই গাইছেন, শিখেই আসছেন তাদের কাছ থেকে। তখন ছিল আপনি স্টুডিওতে যাবেন। তাদের সামনে গান তুলবেন। সেখানে রিহার্সেল হবে। এরপর আপনি ভয়েস দেবেন। সামনে ১০-১২ জন বসে আছেন। আপনি নার্ভাস হচ্ছেন। বারবার কাট হচ্ছে। কোনো সমস্যা নেই। আর এখন? আচ্ছা, গানটা পাঠিয়ে দাও। আমি তুললাম। পছন্দমতো সময়ে গাইলাম। এখন তো তেমন স্টুডিও নেই। অধিকাংশই হোম স্টুডিও। আসলে শিল্পীদের সবার সঙ্গে যোগাযোগ আগের মতো নেই। আন্তরিকতা অনেক কমে গেছে।

তাপস রায়হান : আন্তরিকতা কমে যাওয়ার কারণ?

আঁখি আলমগীর : প্রযুক্তি। স্টুডিওতে না গিয়েও কিন্তু ভয়েস দেওয়া সম্ভব। বাসা থেকে দেব। এরপর তারা তাদের মতো করে নেবে।

সুমাইয়া সুগরা অনন্যা : সবার জীবনেই সমস্যা আছে। মেয়েদের ক্ষেত্রে আরও বেশি। আপনার ক্যারিয়ার এবং সংসার জীবনে কীভাবে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন?

আঁখি আলমগীর : একদম। অনেকে বলে তুমি তো চাকরি করো না, এর মানে ফ্রি। হাউজ ওয়াইফ। যে চাকরি করে না, কেবল মাত্র ঘরে থাকে তার কাজ কিন্তু বিশাল। ঘরে থাকা এবং তা চালানো যে কত কঠিন, তা যে চালায় কেবল সেই বোঝে। ‘হাউজ ওয়াইফ’ হচ্ছে, কঠিন প্রফেশন। (হাসতে হাসতে) এর জন্য নিয়মিত ‘পে’ করা উচিত। ডে অফ নেই, ছুটি নেই। অসম্ভব কঠিন চাকরি। আরেকটা ‘জব’ হচ্ছে মা হওয়া।  এরপর যদি বাইরে কাজ করো, তাহলে তো কথাই নেই। প্রত্যেক বিবাহিত মেয়েকে সুপার ওমেন হতে হয়। সেভাবেই সব ম্যানেজ করেছি। আর পরিবার যদি সাপোর্ট করে, তাহলে তো কথাই নেই। আমি মেন্টালি এবং ফিজিক্যালি খুব স্ট্রং মানুষ।

তাপস রায়হান : আপনি একবার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন, রুনা লায়লার গানের রিমেক করবেন। বর্তমানে কী অবস্থা?

আঁখি আলমগীর : করেছি তো। আমার ইউটিউব চ্যানেলের জন্য। একটু নাচানাচি, মজা করে করা।

তাপস রায়হান : কোন কোন গান?

আঁখি আলমগীর : ইস্টিশনের রেল গাড়িটা, এই বৃষ্টি ভেজা রাতে চলে যেও না, তুমি আমার জীবন, আমি তোমার জীবন, ও আমার বন্ধু গো চিরসাথি পথ চলার...। এ সব আর কী। শুনে নিয়েন, আর সাবস্ক্রাইবও করবেন কিন্তু, এরপর আরও করব। সবচেয়ে বেশি ইচ্ছে আছে ‘তোমাকে চাই আমি, আরও কাছে’ গানটা করার। ওই যে গানের মধ্যে উহু, আহাঃ। হাহাহাহাহা, মনে হয় এটা আমি ভালো পারব।

মাহতাব হোসেন : সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যাণে আমরা জানি, আপনার ২ মেয়ে।  মেয়েদের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। সেই বিষয়ে যদি বিস্তারিত বলেন?

আঁখি আলমগীর : আমার মেয়েরা মাশাআল্লাহ বড় হয়ে গেছে। একজন এমবিবিএস ফাইন্যাল ইয়ারে। আরেকজন ইউনিভার্সিটিতে যাবে। সে পড়বে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি নিয়ে। এই মেয়েরাই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড। ওরাই আমার বিশ্ব। বড় মেয়ে স্নেহা, ছোট মেয়ে আরিয়া। মেয়েদের জন্যই আমি এত দূর আসতে পেরেছি। প্রথম পার্ট হচ্ছে, আমার মা যদি ওদের না দেখত, আমি পারতাম না। পরের পার্ট হচ্ছে, ওরা যদি আমাকে মিস আন্ডারস্ট্যান্ড করত তাহলে আমি বাকি জার্নিটা করতে পারতাম না। এরপর আমার বাবা। সে যদি সবসময় আমার সমালোচনা না করত, আমি আমাকে বেটার করার চেষ্টা করতাম না। বাবাই আমার সবচেয়ে বড় ক্রিটিক। আমার গান শেখাটাই বাবার উৎসাহের কারণে। সবমিলিয়ে বলব, পরিবারই আসল। যেকোনো মানুষের জন্য পরিবারই তার বড় শক্তি।

মাহতাব হোসেন : আপনার মেয়েরা যে বিষয়ে পড়াশোনা করছে, ওটাই কি ক্যারিয়ার হবে?

আঁখি আলমগীর : ডাক্তার হওয়া ভীষণ কঠিন বিষয়। প্রথম কথা হচ্ছে, জোর করে এটা পড়ানো যায় না। নিজের প্রবল ইচ্ছা থেকে এটা পড়তে হয়। ওর স্বপ্নই ডাক্তার হবে। মনে হয়, ও এখানেই থাকবে। ছোট মেয়েও, তার লাইনেই থাকবে। আমার মনে হয় না, ওরা কেউ মিডিয়াতে কাজ করবে।

সাহাদাত পারভেজ : তারপরও কখন যে মনোজগতে মানুষের কোন পরিবর্তন আসে, কে জানে?

আঁখি আলমগীর : তা ঠিক। এটা আসলে আমিও বলতে পারি না। তখন বেঁচেও থাকব কি না, কে জানে? কিছুই বলতে পারব না।

সাহাদাত পারভেজ : আপনারা থাকেন কোথায়?

আঁখি আলমগীর : সবাই উত্তরায়। একেকজন একেক বাসায়।

মাহতাব হোসেন : সহ-শিল্পীদের কথা যদি বলতেন?

আঁখি আলমগীর : প্রথম অ্যালবামের কাজ করেছিলাম মানাম ভাইয়ের সঙ্গে। আর সায়েম ভাই, খায়েম ভাই। তারা ৩ ভাই মিলে আমার প্রথম অ্যালবামটা করেছিলেন। এরপর যাই প্রণব ঘোষের কাছে। তার সঙ্গে পরিচয় ছিল না। তিনি প্রথমে আমার গান করতে চাননি। তখন তপন চৌধুরী বললেন আপনি অবশ্যই আঁখির অ্যালবামের কাজ করবেন। ওর গান আমি শুনেছি। ও ভালো গান করে। এরপর তো প্রণব আঙ্কেল আমাকে মেয়ে বলে সম্বোধন করত। ওখানে অ্যালবাম হলো ‘বিষের কাঁটা’। আসলে তপন দার সঙ্গে কাজ করতে করতেই আমার স্টেজের বিষয়টা আয়ত্বে এলো।

তাপস রায়হান : আপনি প্লেব্যাক করছেন, সেখানে এক পরিবেশ। অ্যালবামে কাজ করছেন, স্টেজে গাইছেন সেখানেও আলাদা পরিবেশ। কোন পরিবেশে গান করতে ভালো লাগে?

আঁখি আলমগীর : চোখ বন্ধ করে বলব সবচেয়ে ভালো লাগে স্টেজে। কারণ হচ্ছে, শ্রোতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ হয়। মনে হয় সৃষ্টিকর্তা আমাকে স্টেজের জন্যই তৈরি করেছেন।

মাহতাব হোসেন : নাকি মিউজিক ভিডিওর জন্য?

আঁখি আলমগীর : তাও হতে পারে।

মাহতাব হোসেন : সহ-শিল্পীদের বিষয়টি শেষ করেননি?

আঁখি আলমগীর : এন্ডু কিশোর আঙ্কেল, মিলু আঙ্কেল, আগুন, এস.ডি রুবেল, রবি চৌধুরী, মুনির ভাই। অনেকে আছেন। এরপর যারা আছেন, তাদের সঙ্গেও মোটামুটি কাজ করেছি।

মাহতাব হোসেন : আপনি ৮০টা চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন। কোন চলচ্চিত্রে কাজ করে সবচেয়ে ভালো লেগেছে?

আঁখি আলমগীর : প্রথমে চলচ্চিত্রের গান শুনি টং দোকানের রেডিওতে। সেটা আমার আর আগুনের গাওয়া। ‘আসামি বধূ’ ছবির গান। মিল্টন খান ভাইয়ের লেখা। আলম খান আঙ্কেলের সুর। আর মেন্টাল সেটিসফেকশন হয়েছে, ‘কতো যে আপন ছবিতে’ আনোয়ার পারভেজের সুরে ৩টা গান আছে ওই ছবিতে আমার গাওয়া।

তাপস রায়হান :  আপনার গাওয়া, আপনার ভালো লাগা তিনটি গান বলবেন?

আঁখি আলমগীর : ‘কতো যে আপন’ ছবির টাইটেল ট্র্যাক। ‘তুমি আমার কতো যে আপন/ কাছে থেকো সারাটি জীবন’। এই ছবিরই আরেকটি গান ‘গান যদি জীবনের মতো হয়/ জীবন কেন গানের মতো হয় না।’ তৃতীয় গানটি স্পেশাল। ‘একটি সিনেমার গল্প’তে গাজী মাজহারুল আনোয়ারের লেখা, রুনা লায়লা আন্টির সুরে ‘গল্প কথার ঐ কল্পলোকে/ জানি একদিন চলে যাবে’। যেটা গেয়ে আমি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলাম সংগীতশিল্পী হিসেবে। এটা ২০১৮ সালে।

সুমাইয়া সুগরা অনন্যা : আপনি কণ্ঠ ঠিক রাখতে এখনো রেওয়াজ করেন?

আঁখি আলমগীর : একদম না। কোনো দিন করি নাই।

মাহতাব হোসেন : আপনার লাইফ স্টাইলটা একটু বলবেন? এ সময়েও নিজেকে এত ফিট রেখেছেন?

আঁখি আলমগীর : এই বয়সে, এটা বলতে চাইছেন? হাহাহাহা।

মাহতাব হোসেন : না, ডিরেক্ট বললে...

আঁখি আলমগীর : আপনি বলতে পারেন। বয়স নিয়ে আমার কোনো দ্বিধা বা সংকোচ নেই। আমার বয়স যেদিন ৭০ হবে, তখন আমি প্রাউডলি বলব। ৭০ বয়সে আমার কাছে কম মনে হয়। আমার বাবা ৭৪। হি লুকস লাইক ৫৪! মাশাআল্লাহ।

মাহতাব হোসেন : উত্তরটা দেন প্রশ্নের?

আঁখি আলমগীর : আমার জীবনযাপনে অনিয়ম বেশি। আমি মুভি দেখি অনেক বেশি। যারা মুভি দেখে, তারা রাত জাগে। যারা বই পড়ে বেশি, তারা রাত জাগে। ওটাই রিল্যাক্স টাইম। এখন আমার মেয়েরাও রাত জাগে। ওদের ছুটি থাকলে রাতে চুটিয়ে সবাই ছবি দেখি। একবার ডিনার করি, রাত ৯টায়। আবার রাত ২টায়। কখনো ভোর হয়ে গেলে, সকালের নাশতাটাও করে ফেলি। রাতে কিন্তু কোনো ঘুম নেই। পরের দিন কাজ নেই। যে কারণে আমরা ৩ জন চিল করি। এভাবেই আমাদের সময় পার হয়। কখনো রাত দুটোর সময়, সিনেমা শেষ। ছোট মেয়ে এসে বলল আম্মু, মেকআপ করবা? আমি বলি চলো? ওকে, ৩ জন তিন লুক। হাহাহাহাহা। এত্ত মেকআপ নিয়ে আমরা খাটে বসে যাই। আলহামদুলিল্লাহ, খুবই মজার একটা লাইফ। আমার লাইফের মেইন হেপিন্যাস হচ্ছে, আমার ফ্যামেলি। আমার ভালো লাগা, ভালো থাকা, আমার যেটা ভালো লাগে সেটা করতে পারার স্বাধীনতা, আমার সুন্দর থাকা, খাওয়া, শপিং এবং ফ্যামেলি এটাই আমার লাইফ। আর সঙ্গীত ভালোবাসার জায়গা। এটা আমার প্রফেশন। আসলে আমার পরিবারই সঙ্গীতের মূল প্রেরণা।

সাহাদাত পারভেজ : সকালে বা বিকালে হাঁটেন?

আঁখি আলমগীর : নিয়মিত বিকালে হাঁটি।

সাহাদাত পারভেজ : এত ছবি দেখেন চোখে সমস্যা হয় না?

আঁখি আলমগীর : আমি চশমা পরি। অনেক ভক্ত বলে আপনাকে এই চশমায় মানাচ্ছে না। ফ্রেম পরিবর্তন করেন।

সাহাদাত পারভেজ : ভালো লাগার মতো কোনো কথা আছে?

আঁখি আলমগীর : অনেক কথা আছে। সব কথা বলা যায় না। সিরিয়াস বিষয়ে আলোচনা হলে হয়তো তখন বলা যাবে। নিজের থেকে কিছু লিখলে তখন হয়তো প্রকাশ করা যাবে। আমার আসলে কিছুই খারাপ লাগে না। এটাই সবচেয়ে বড় ভালো লাগা। কোনো নেগেটিভিটিই আমাকে বিচলিত করে না।

মাহতাব হোসেন : একঘেয়েমি লাগে না?

আঁখি আলমগীর : কেন? মোটেও না। চূড়ান্ত বিচারে ভালো লাগা, ভালো

থাকা, ভালোবাসা স্থায়ী কোনো বিষয় না। ভালো লাগা খুঁজে নিতে হয়।

মাহতাব হোসেন : আপনি রুনা লায়লা আন্টির কাছে থেকে অনেক গিফট পান। বলা যাবে?

আঁখি আলমগীর : আমাদের পরিবারে সবাই সবাইকে গিফট দেই। উনি এমন একজন মানুষ, তিনি একটা কিছু দিলে নিউজ হয়ে যায়। একই গিফট কিন্তু আমার বাবাও দিচ্ছেন। মেয়েরাও সারা বছর টাকা জমিয়ে আমার জন্মদিনে গিফট দেয়। সবচেয়ে বড় গিফট পেয়েছি, সেটা গান। যেটার জন্য আমি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেলাম। এই গানটা আসলে আমি গাইতে চাইনি। এটা আমার স্টাইলের বাইরে, ঘরানার বাইরে। সেমি ক্ল্যাসিকাল। আমি গাইতে চাইনি। উনি জোর করে গাইয়েছেন। আমি রেকর্ডিংয়ের দিনও বলেছি, আপনি গান। উনি বলেছেন এটা তোমার গান। গাও, পারবে। আজকেই গাইতে হবে। এটাই বেস্ট গিফট। আর উনি যখন প্রথম ডায়মন্ড নেকলেস কিনেছিলেন, নিজের উপার্জন দিয়ে, সেটা আমাকে পরিয়ে দিয়েছিলেন। এটা হচ্ছে, সেকেন্ড বেস্ট গিফট। এই বিষয় নিয়েও কত কথা! এখন আসলে অস্থির সময় পার করছি আমরা। এর মধ্যেই ভালো থাকতে হবে। যা আসার তথা আমার কাছে আসবেই। যা আসেনি, তা আমার নয়। সেটা পাওয়ার জন্য জোর করতেও নেই।

তাপস রায়হান : জীবনের উপলব্ধি কী?

আঁখি আলমগীর : বিগেস্ট গিফট ফ্রম গড। আল্লাহর বেস্ট গিফট। জীবন থেকে চলে যাওয়াটা বেদনার। আবার দীর্ঘদিন থেকে যাওয়াটাও ভীষণ কষ্টের।

শেষে বললেন নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। তাহলে আপনার জীবন কখনোই থেমে থাকবে না। যা হবে, তা সুন্দর।

গ্রন্থনা : অনিন্দিতা আচার্য

ছবি : আবুল কালাম আজাদ

লোকেশন: গ্রিন লাউঞ্জ

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত