যে সত্য কল্পনারও অতীত

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সর্বসাধারণের ওতপ্রোতভাবে অংশগ্রহণের কারণে একে জনযুদ্ধও বলা হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০ লাখেরও বেশি বাঙালিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী হত্যা করে। প্রাণের ভয়ে মানুষ ছুটে বেড়িয়েছে দেশের একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে। মানুষ প্রাণের ভয়ে পালানোর পথেও ত্যাগের যে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, অস্ত্রহীন সাধারণ গৃহী মানুষটাও যেভাবে প্রশিক্ষিত সেনাবাহিনীকে প্রতিরোধ করেছে তার দৃষ্টান্ত যুদ্ধ ইতিহাসে বিরল। এই ঘটনাগুলো গল্প উপন্যাসের চেয়েও রোমাঞ্চকর, অবিশ্বাস্য ও শিহরণ জাগানিয়া। এমন দশটি ঘটনার গল্পরূপের সংকলন হলো শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক তুষার আবদুল্লাহর ‘১৯৭১ গল্প নয় সত্যি’। বইটি শৈশব উত্তীর্ণ কিশোর-কিশোরীদের উদ্দেশ করেই লিখিত। নতুন প্রজন্ম যাদের হাতে এ দেশের দায়িত্ব সমর্পিত হবে কিছুদিন পরে সেই তাদেরই এই দেশটি কীভাবে আমরা পেয়েছি তা জানানোর একটা প্রয়াস হলো লেখক ‘১৯৭১ গল্প নয় সত্যি’। লেখক তাদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘আমি একাত্তর দেখিনি। তোমরাও দেখনি। কিন্তু যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন তাদের দেখেছি। ...মুক্তিযোদ্ধা মানে অস্ত্র হাতে রণক্ষেত্রে যাওয়া যোদ্ধাই শুধু নন, যে কিশোরী মেয়েটি পাক হানাদার বাহিনীর কাছ থেকে একটি পরিবারকে বাঁচাতে নিজে সালদা নদীতে ডুবে জীবন দিয়েছে, প্রতিরোধ গড়ে তুলতে যে মহিলা পাক সেনাদের ওপর গরম চিনির সিরা ফেলে দিয়েছিলেন, যে কিশোরীরা মরিচের গুঁড়া ছিটিয়ে পাক সেনাদের আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছিল, যিনি রাজাকারের ছদ্মবেশে মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র সরবরাহ করতেন, এমনকি যে রেডিও যন্ত্রটি একাত্তরে এই জনপদের মানুষকে মুক্তির স্বপ্ন দেখিয়েছে, আমার কাছে সেই রেডিওটিও মুক্তিযোদ্ধা।’

এদের সবাইকে যে মুক্তিযুদ্ধের পরে খুঁজে পাওয়া গেছে এমনটি নয়। সালদা নদীতে যে নিজেকে ডুবে মরতে দিয়েছে তাকে আর পাওয়া যাবে না এটাই সত্যি, কিন্তু যে কিশোরী মেয়েটি মরিচের গুঁড়া দিয়েছিল পাকিস্তানি সেনাদের চোখে সে তো বেঁচেছিল। দুঃখের ব্যাপার হলো, তাকেও চিহ্নিত করা যায়নি, সম্মানিত করা যায়নি। কিন্তু যাদের খুঁজে পাওয়া গেছে, যেমন মেহেরুন নেছা মীরা; তাকেও তো আমরা সম্মানিত করতে পারিনি। আজও ইব্রাহিম মোল্লার ডেকোরেটরের কাছে তাকে সবজি বিক্রি করতে হয়। তাহলে তুষার আবদুল্লাহ এই গল্পগুলো কিশোর-কিশোরীদের কেন শোনাচ্ছেন। কারণ এই দেশটা তারাই পরিচালনা করবে। এই মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করা এবং রক্তস্নাত এই বাংলাদেশের সম্মান সমুন্নত করার দায়িত্ব এখন তাদেরই। ১৯৭১ গল্প নয় সত্যি বইটি তাদের এই দায়িত্ব গ্রহণ ও পালন করতে অনুপ্রাণিত করবে।  

রাজিয়া সুলতানা