বাকরুদ্ধ স্বামী প্রতিবাদেরও ভাষা হারিয়েছেন

দিপু সানাকে বন্ধুরা দীপান্বিতা নামে ডাকত। মনোযোগী শ্রোতা হিসেবে কিংবা গল্পে ভুলিয়ে রাখার অদ্ভুত মুনশিয়ানার জন্য দীপান্বিতা সবার প্রিয় ছিল। শিক্ষকের লেকচার আর বইয়ের পাতায় তার ছিল ভীষণ মনোযোগ। কর্মজীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও বন্ধুতা ভোলেননি দিপু। উদার মনের এ বন্ধুটি এবার তাদের ভুলে গেল, ছেড়ে গেল চিরদিনের জন্য। ফুটপাত ধরে হেঁটে বাসায় ফেরার পথে ওপর থেকে পড়া ইটের আঘাতে দীপান্বিতার মৃত্যুর খবর মন ভেঙেছে শহরের সবার।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তা দিপু সানার এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না কেউ। বন্ধু মাহাবুব আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে একসঙ্গে পড়েছি আমরা। সে মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল, কর্মজীবনেও সাফল্য দেখিয়েছে। দীপান্বিতার কথা-কাজ প্রশংসা করার মতো। অমায়িক একজন মানুষ হঠাৎ চলে যাবে, মেনে নেওয়া যায় না। বাসায় ফেরার পথে ইটের আঘাতে তার মৃত্যু হয়েছে। এটা আসলে হত্যাকান্ড। এর বিচার চাই। ঢাকায় আমরা সবাই এভাবে চলাফেরা করি। দীপান্বিতার জায়গায় আমি আপনি যে কেউ থাকতে পারতাম।’

বুধবার সন্ধ্যায় মৃত্যুর পর ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয় তার মরদেহ। গতকাল বৃহস্পতিবার সেখানে উপস্থিত ছিলেন তার সহকর্মী,স্বজনরা। দুপুরে মর্গের পাশে তার বাকরুদ্ধ স্বামী তরুণ কুমার বিশ্বাসকে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। কারও সঙ্গে কথা বলছেন না। প্রতিবাদও তিনি করছেন না। শোকাচ্ছন্ন। এড়িয়ে চলছেন সবার জিজ্ঞাসা। তার পাশেই অপেক্ষা করছিলেন দিপুর সহকর্মীরা। তারা কেউ বিরক্ত, কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করছিলেন। কেউ স্মৃতিকাতর হয় চোখের পানি ঝরাচ্ছিলেন। তাদের একজন গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ।

শ্রাবণ বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘আমরা চাই সুষ্ঠু তদন্ত; দায়ীদের চিহ্নিত করা হোক; আইনের আওতায় নেওয়া হোক। আইনি প্রক্রিয়া যেন ঠিকমতো চলে তাও চাই। এ দুর্ঘটনায় অবশ্যই অবহেলা রয়েছে। আমি রাস্তা দিয়ে হাঁটব, আমি নাগরিক আমার নিরাপত্তা চাই। এ ঘটনায় যারা যারা দায়ী সঠিক তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।’

দিপু সানার চাচা স্বপন কুমার সানা জানান, তাদের বাড়ি খুলনার পাইকগাছা থানার সোলদানা গ্রামে। দিপুর বাবার নাম তপন কুমার সানা। স্বামী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার তরুণ কুমার বিশ্বাস ও তিন বছরের ছেলে নিশিরাজ বিশ্বাসকে নিয়ে মগবাজারের গাবতলা এলাকায় থাকতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স করেন দিপু। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকে কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। সহকারী পরিচালক হিসেবে সদরঘাট শাখায় কর্মরত ছিলেন।

স্বপন কুমার জানান, সানা রোজ বাসা থেকে বাসে করে সদরঘাটে কর্মস্থলে যেত। বুধবার অফিস শেষ করে বাসায় ফিরছিল। মালিবাগে বাস থেকে নেমে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে সিদ্ধেশ্বরী নিউ সার্কুলার রোডের বাসায় ফিরছিল। সে সময় ওপর থেকে একটি ইটের সø্যাব দিপুর মাথায় পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। খুলনার তেরখাদা থানার শ্রীপুর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে তার মরদেহ সৎকার করা হবে।

সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, হাতে ব্যাগ নিয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটছিলেন দীপান্বিতা। হঠাৎ ইট আকৃতির একটি ব্লক ওপর থেকে সরাসরি মাথায় পড়তেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। ব্লকটি কীভাবে এলো বা কোথা থেকে ছোড়া হয়েছে তা নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে।

এ ঘটনায় রমনা মডেল থানায় হত্যা মামলা করেছেন দীপান্বিতার স্বামী তরুণ বিশ্বাস। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মোজাম্মেল হোসেন বলেন, ‘ঘটনাস্থলের ওপরে নির্মাণাধীন কোনো ভবন নেই। ফখরুদ্দিন পার্টি সেন্টার আছে। ব্লকটি কোথা থেকে পড়ল তা জানা সম্ভব হয়নি ভিডিও দেখে।’

তিনি বলেন, ‘যেটির আঘাতে মৃত্যু হয়েছে, সেটি ফুটপাত নির্মাণে ব্যবহার করা হয় এমন একটি সিমেন্টের খাঁজকাটা ব্লক। দেখতে ইটের মতো। ভিডিওতে শুধু ওপর থেকে ব্লকটিকে পড়তে দেখা যায়। ফ্লাইওভার নাকি উঁচু ভবন থেকে পড়েছে তা স্পষ্ট নয়। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।’

গতকাল সরেজমিনে দেখা গেছে, চারতলা ভবনটির নাম সুলতান টাওয়ার। নিচে পার্কিং, দ্বিতীয়তলায় ফখরুদ্দিন রেস্টুরেন্ট, তৃতীয়তলায় পার্টি সেন্টার ও চতুর্থতলায় ভবন মালিকের স্টোররুম। ভবনটির ছাদে কেউ থাকে না। খোলা ছাদের এক পাশে কিছু পাথর, পরিত্যক্ত কিছু আসবাবপত্র রয়েছে। ছাদের চাবি শুধু মালিক ও ফখরুদ্দিন রেস্টুরেন্টের ম্যানেজারের কাছে থাকে।

রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার রিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘ঘটনার সময় আমরা অফিসে ছিলাম। পার্টি না থাকায় তেমন ভিড় ছিল না। আমাদের ছাদ থেকে বা অন্য কোনো ভবন থেকে কংক্রিটের কিছু পড়ার সম্ভাবনা নেই। অন্য কোথাও থেকে এটা পড়ে থাকতে পারে।’