নতুন মন্ত্রিসভা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি গত মন্ত্রিসভার বড় অংশ কেন বাদ পড়ল তা নিয়ে বেশ কৌতূহল তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন পর্যায়ে সমালোচনাও শুরু হয়েছে। মূলত গত সরকারের প্রভাবশালী অনেক সদস্য ছিটকে পড়লেন কেন, সেই আলোচনা গুরুত্ব পাচ্ছে বেশি। আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদায়ী মন্ত্রিসভায় যেসব সদস্য দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন,একই সঙ্গে বেফাঁস মন্তব্য করে সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, তারাই মূলত বাদ পড়েছেন।
এ ছাড়া মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী থাকার পরও গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয় পরিচালনায় অতিরিক্ত চাপ নিতে হয়েছে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনাকে। এবার বাড়তি চাপ থেকে কিছুটা মুক্ত থাকতে চান তিনি। এ কারণেও কিছু মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী বাদ পড়েছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার, দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণও বাদ পড়ার একটি কারণ।
মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী মিলিয়ে ৩৬ জনের নতুন মন্ত্রিসভায় সদ্য বিদায়ী মন্ত্রিসভার ১৭ সদস্য রেখে বাকি ১৯ নতুন মুখ বেছে নিয়ে দেশ পরিচালনায় যাত্রা শুরু করেছেন বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা।
টানা চতুর্থ মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী পদে নিয়োগ পাওয়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ২৫ মন্ত্রী ও ১১ প্রতিমন্ত্রী নিয়ে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। গত বুধবারই তাদের সবার নাম জানা গিয়েছিল।
অর্থ ও পররাষ্ট্রে গুরুত্ব
পুরনো মন্ত্রীদের বাদ পড়ার কারণ নিয়ে বুধ ও বৃহস্পতিবার সারা দিন আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের এ প্রতিবেদক।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্র বলছে, এবার মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ব্যক্তিদের গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বারবার সংসদ সদস্য হয়েছেন, এমন ব্যক্তিদের কথা বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী সরকারকে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে বলে মনে করছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। এগুলো হচ্ছে অর্থনৈতিক সংকট ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন।
এ বিবেচনায় অর্থ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পুরনো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা বাদ পড়েছেন। এ দুই মন্ত্রণালয়ে নতুন চিন্তা যুক্ত করা, নতুন করে শুরু করার একটা চেষ্টা বলে আওয়ামী লীগের নেতারা মনে করছেন। তবে মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা থাকলেও বেফাঁস মন্তব্য বড় কারণ বলে আলোচনা রয়েছে। তাছাড়া নতুনদের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করাও পুরনোদের বাদ পড়ার অন্যতম কারণ।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা ও প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজনদের কয়েকজনের দাবি, বেফাঁস মন্তব্য, দায়িত্ব পালনে অদক্ষতা, বয়সের কারণ ও দুর্নীতির অভিযোগ গত মন্ত্রিসভার ৩০ জন সদস্যকে নতুন যাত্রায় সঙ্গী করেননি তিনি।
করোনা-পরবর্তী সময়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা এখন। একই সঙ্গে নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের নানান তৎপরতা মোকাবিলা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ ওঠে। এতে নতুন মন্ত্রিসভায় কপাল পোড়ে তাদের।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানান চ্যালেঞ্জকে মোকাবিলা করে শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বের কারণে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু শত্রুদের ষড়যন্ত্র এখনো শেষ হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে আগামী দিনের পথচলা সুগম করতে সংসদ সদস্যদের মধ্যে যাদের যোগ্য মনে করছেন তাদের নিয়েই মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর গত মেয়াদে যাদের কারণে সরকার ও আওয়ামী লীগ মানুষের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তাদের অধিকাংশই বাদ পড়েছেন। তিনি বলেন, প্রশ্ন থাকতে পারে এতদিন তাহলে কেন রাখা হয়েছে তাদের। এজন্যই রাখা হয়েছে, শেখ হাসিনা সহজে কাউকে শাস্তি দেন না। সর্বোচ্চ ছাড় দেন। তাই তারা টিকেছিলেন। এখন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা কাজে লাগিয়েছেন।
২০১৯ সালের ৭ জানুয়ারি টানা তৃতীয় মেয়াদে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছিল। এরপর ২০২০ সালে বৈশ্বিক করোনার ঢেউ আঘাত হানে, এতে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নানান দুর্বলতা ফুটে উঠেছিল। সে সময়ে দেশের বাইরে থেকেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক। এ বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী ভালো চোখে দেখেননি। তাছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যেও মন্ত্রীকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জাহিদ মালেকের পরিবারের সদস্যদের মন্ত্রণালয়ে ‘দখলদারিত্বও’ তাকে বাদ দেওয়ার কারণ বলে জানা গেছে। স্বাস্থ্যের নানান অনিয়ম নিয়ে সংসদ ও সংসদের বাইরে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছিলেন তিনি। করোনাকালে করোনা টিকা, করোনা কিট কেনার নানান অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পাশাপাশি টানা দুই মেয়াদে প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পরও স্বাস্থ্য খাতকে জনমুখী করতে ব্যর্থ হওয়ায় জাহিদ মালেক বাদ পড়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর একজন সদস্য।
গত সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন চাকরি জীবনে কূটনৈতিক হিসেবে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। এতে ২০১৮ সালে বড় ভাই আবুল মাল আবদুল মুহিতের ছেড়ে দেওয়া সিলেট-১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়েই সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। পাঁচ বছরে নানান বিতর্কিত মন্তব্য করে সরকারকে চাপে ফেলেছিলেন মোমেন। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে মন্তব্য করে বেশ চাপেও পড়েছিলেন। একই সঙ্গে দায়িত্ব পালনকালে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সম্পর্ক উন্নয়নে আশানুরূপ সফলতা দেখাতে ব্যর্থ হন এ মন্ত্রণালয়ের দুই মন্ত্রীই। ভবিষ্যতে ঝুট-ঝামেলার সম্ভাবনায় আরও একটু দক্ষ মন্ত্রী দেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ এই মন্ত্রণালয়ে।
প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ একজন বলেন, গত আমলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী থাকার পরও প্রধানমন্ত্রীকে চাপ নিতে হয়েছে, এটাও মোমেনের বাদ পড়ার কারণ। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের বাদ পড়ার পেছনে প্রতিবেশী একটি দেশের ভূমিকা আছে বলে জানা গেছে।
নির্বাচনের আগে গণমাধ্যমে বেফাঁস মন্তব্য করে সরকারকে প্রশ্নের সম্মুখীন করায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর প্রভাবশালী সদস্য আবদুর রাজ্জাক মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েছেন বলে আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র দাবি করেছেন। ওই সূত্র আরও দাবি করেন, গত সম্মেলনে আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রত্যাশা করে ক্ষমতাশালী একটি দেশের অনুরোধকে ভালোভাবে নেননি প্রধানমন্ত্রী। টাঙ্গাইলের স্থানীয় রাজনীতিতে দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে দূরত্বও তার মন্ত্রিত্ব যাওয়ার অন্যতম কারণ।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নিয়ে গত সরকারের মেয়াদ জুড়ে আলোচনায় ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। বাজারের অস্থিরতার কারণে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস হলেও মন্ত্রী ছিলেন নির্বিকার। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে পারবেন না বলে সংসদে স্বীকারোক্তিও দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে দ্রব্যমূল্য কমানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
অর্থ পাচার, ব্যাংকে অনিয়ম গত কয়েক বছর আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল। শারীরিক অসুস্থতার কারণে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল কার্যকর কোনো ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারেননি। এমনকি বাজেট পেশও সরকারপ্রধানকে করতে হয়েছে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে বাদ পড়েছেন তিনি।
শ ম রেজাউল করিম গত সরকারের প্রথম ছয় মাস গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী ছিলেন। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে ছয় মাসের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে তাকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। স্বজনপ্রীতির অভিযোগও উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। দেশের ভূমি ব্যবস্থায় মানুষের ভোগান্তি দূর করার জন্য পরিকল্পিত কর্মকাণ্ডে প্রশংসিত ছিলেন ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। কিন্তু নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিদেশে বিপুল অর্থ পাচারের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
সরকারে বড় আয়ের খাত হলো রেমিট্যান্স। গত কয়েক বছর সেই অর্থে রেমিট্যান্স বাড়াতে পারেননি প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমদ। যে কারণে ডলার সংকটে পড়তে হয়েছে। সরকারের রিজার্ভ অর্ধেকে নেমে এসেছে। নতুন নতুন দেশে শ্রমবাজার খোঁজা হলেও দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। বড় শ্রমবাজার মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির জটিলতা কাটাতে পারেননি।
বেফাঁস মন্তব্যের অভিযোগ রয়েছে পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নানের বিরুদ্ধে। বয়সও একটা কারণ। সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ এসেছে খোদ নিজ পরিবার থেকেই। এ ছাড়া দলের স্থানীয় রাজনীতিতে বিভেদ তৈরির অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
পার্বত্য তিন জেলার রাঙ্গামাটি আসনের দীপঙ্কর তালুকদার ২০০৯ সালের পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। এরপর গত দুই মেয়াদে বান্দরবানের বীর বাহাদুর প্রতিমন্ত্রী ও মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। রোটেশনের কারণে এবার খাগড়াছড়ির কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরাকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে। শিল্প প্রতিমন্ত্রী কামাল আহমেদ মজুমদার বয়সের কারণে এবং যুব ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী গাজীপুরের রাজনীতিতে বিভেদ ও সিটি করপোরেশনে নির্বাচনে ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় বাদ পড়েছেন বলে জানা গেছে।