গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের দায়িত্বে নতুনরা

শপথ নেওয়ার পর নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করে করে দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ৩৭ সদস্য মন্ত্রিসভা গতকাল বৃহস্পতিবার শপথ নেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব মাহবুব হোসেন স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে দায়িত্ব বণ্টনের বিষয়টি জানানো হয়। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা পদে ছয়জনকে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন নতুন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা টানা চতুর্থবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়ে নিজের কাছে রেখেছেন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বিভাগ, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।

সদ্য বিদায়ী মন্ত্রিসভার যে কজনকে আবারও মন্ত্রী করা হয়েছে তাদের মধ্যে আ ক ম মোজাম্মেল হককে আগের মতোই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও পুরনো সেই সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। এ ছাড়া নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূনকে শিল্প মন্ত্রণালয়, আসাদুজ্জামান খান স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দীপু মনিকে এবার নতুন মন্ত্রণালয় সমাজকল্যাণ, মো. তাজুল ইসলামকে তার আগের মন্ত্রণালয় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, আনিসুল হককেও আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ড. হাছান মাহমুদকে এবার দেওয়া হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। আর সাধন চন্দ্র মজুমদার পেয়েছেন তার আগের দপ্তর খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।

এ ছাড়া টেকনোক্র্যাট কোটায় আবার মন্ত্রী হওয়া স্থপতি ইয়াফেস ওসমানকে তার পুরনো মন্ত্রণালয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়েই রাখা হয়েছে।

মন্ত্রী হিসেবে এবারই প্রথম অন্তর্ভুক্ত হওয়া আবদুস শহীদকে কৃষি, র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত, আবদুর রহমানকে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, আবদুস সালামকে পরিকল্পনা, জিল্লুল হাকিমকে রেলপথ, নাজমুল হাসানকে (পাপন) যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। টেকনোক্র্যাট মন্ত্রী ডা. সামন্ত লাল সেনকে দেওয়া হয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব।

আবারও মন্ত্রী পদে আসা ফারুক খানকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন, আবুল হাসান মাহমুদ আলীকে অর্থ, জাহাঙ্গীর কবির নানককে বস্ত্র ও পাট, নারায়ণ চন্দ্র চন্দকে ভূমি ও সাবের হোসেন চৌধুরীকে বন, পরিবেশ ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

একাদশ মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে উপমন্ত্রী থেকে পদোন্নতি পেয়ে মন্ত্রী হওয়া মহিবুল হাসান চৌধুরী শিক্ষা এবং প্রতিমন্ত্রী থেকে মন্ত্রী পদে আসা ফরহাদ হোসেন জনপ্রশাসন ও ফরিদুল হক খান ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন।

প্রতিমন্ত্রী পদে আগের যারা এ মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন তাদের মধ্যে নসরুল হামিদ বিদ্যুৎ বিভাগেই রয়েছেন। জুনাইদ আহমেদ পলক ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। খালিদ মাহমুদ চৌধুরী নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আবারও এসেছেন। জাহিদ ফারুকও তার আগের দপ্তর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন।

নতুন সাত প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে সিমিন হোসেন রিমি মহিলা ও শিশুবিষয়ক, মোহাম্মদ আলী আরাফাত তথ্য ও সম্প্রচার, মহিববুর রহমান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ, কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক, বেগম রুমানা আলী প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, শফিকুর রহমান চৌধুরী প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং আহসানুল ইসলাম টিটু গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন।

সদ্য বিদায়ী সরকারের মেয়াদে করোনা মহামারী ও ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের কারণে বৈশি^ক অর্থনৈতিক অস্থিরতার শিকার হয় বাংলাদেশ। এ কারণে ডলার সংকট, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সংকট সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের বাজার ব্যবস্থাপনা গত কয়েক বছরে সবচেয়ে দুর্বল এবং আস্থাহীন অবস্থায় পৌঁছেছে। গত দেড় বছর ধরে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৯ শতাংশের ওপর। শুধু বাজার সিন্ডিকেটের কারণে সরকার এখনো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে বাজার সিন্ডিকেট ছিল তুমুল আলোচনায়। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি সংসদে সিন্ডিকেট ভাঙা যাবে না বলে বক্তব্য দিয়ে সমালোচিত ও বিতর্কিত হয়েছেন। তিনি নতুন মন্ত্রিসভায় বাদ পড়েছেন।

গত পাঁচ বছরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে একজন পূর্ণমন্ত্রী থাকার পরও বাজার ব্যবস্থাপনা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। এখন প্রতিমন্ত্রী দিয়ে এ মন্ত্রণালয় কতটুকু সামলানো যাবে সেটিই এ সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ। এবার সরকারের হয়ে সেই চ্যালেঞ্জ নিতে হবে নবনিযুক্ত বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী ও টাঙ্গাইল-৬ আসনের সংসদ সদস্য আহসানুল ইসলাম টিটুকে।

গত আগস্টে বাজার পরিস্থিতি সামাল দিতে সাতটি চ্যালেঞ্জ ও সমস্যা চিহ্নিত করেছিল বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এগুলো হচ্ছে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণ, বৈশি^ক বাণিজ্য ব্যবস্থার ভঙ্গুরতা, আমদানি পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, নিত্যপণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং বিশ্বায়নের ফলে পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়ানো।

ঘুরেফিরে নতুন প্রতিমন্ত্রীকেই এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। চলমান ডলার সংকটের এ সময়ে রপ্তানি খাতের বিস্তার বাড়ানো ছাড়া উপায় দেখছেন না দেশের অর্থনীতিবিদরা। রিজার্ভ বাড়ানোর দুটি উৎসের মধ্যে একটি রপ্তানি খাত।

শীতের মৌসুম শাকসবজির মৌসুম। অথচ বাজার অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের সবজির মৌসুমেও দাম আকাশচুম্বী। নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখাই এই মুহূর্তে নতুন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রীর মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল না রাখলে দেশের মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে। যদিও সরকারের এ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য রয়েছে। এখন মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৯ শতাংশের বেশি।

একইভাবে বিদায়ী বছরে নতুন পাঠ্যক্রম নিয়ে তুমুল আলোচনা-সমালোচনা হয়েছে। এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন দীপু মনি। তাকে এবার সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া হয়েছে। উপমন্ত্রী থেকে পদোন্নতি পেয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন মহিবুল হাসান চৌধুরী। তাকে নতুন পাঠ্যক্রম বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জিং কাজটি করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর ছয় উপদেষ্টা : মন্ত্রীর পদমর্যাদায় যে ছয়জনকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়েছে তারা হলেন ড. মসিউর রহমান, ড. গওহর রিজভী, ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, সালমান ফজলুর রহমান, মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক ও কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী। তাদের মধ্যে প্রথম পাঁচজন আগের মেয়াদেও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ছিলেন।

এ ছাড়া অবসরপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিনকে আবারও মন্ত্রীর পদমর্যাদায় অ্যাম্বাসাডর অ্যাট লার্জ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।