হুতিদের ওপর হামলায় অস্থির তেলের বাজার

ইয়েমেনের শিয়া মতাবলম্বী যোদ্ধা দল হুতি বিদ্রোহীদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। লোহিত সাগরের জাহাজগুলোকে সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে যুদ্ধবিমান, জাহাজ ও সাবমেরিন থেকে হামলা চালায় তারা। হামলার পরই জ¦ালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে, গাজার যুদ্ধের ব্যাপক প্রাণহানির পর হুতি অবস্থানে হামলা আরও বিস্তৃত আকারে আঞ্চলিক সংঘাত সৃষ্টি করতে পারে।

রাতভর বিমান হামলার খবর জানিয়ে গতকাল শুক্রবার আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর তাইজে এবং লোহিত সাগরের তীরবর্তী হোদেইদাহ বন্দরে বিস্ফোরণের শব্দ পাওয়া গেছে। উত্তরের বন্দরে বিস্ফোরণের শব্দ শুনে জেগে ওঠেন সানার বাসিন্দা খিলোদ। তিনি বলেন, ‘যেখানে আক্রমণ হয়েছে সেখানে আমরা বড় আগুন দেখেছি। আধঘণ্টা ধরে চলে ভীতিকর হামলা।’

এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বলেন, ‘এসব লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলার মধ্য দিয়ে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা নিজ সেনাদের ওপর আক্রমণ এবং মুক্ত সামুদ্রিক অভিযাত্রার বিরুদ্ধে আসা শত্রুতামূলক আচরণ সহ্য করবে না।’ আবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বলেন, এ হামলার মধ্য দিয়ে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হলো যে, লোহিত সাগরে আক্রমণ ভুল এবং তারা পার পাবে না।

৭৩টি হামলার ফলে পাঁচজন যোদ্ধা নিহত হওয়ার খবর দিয়ে হুতি বিদ্রোহীদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা এর প্রতিশোধ নেবে এবং লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা অব্যাহত রাখবে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের সূত্র ধরে বলা হচ্ছে, আক্রমণগুলো ছিল প্রতীকী। তবে এসব আক্রমণের মধ্য দিয়ে হুতি বিদ্রোহীদের সক্ষমতা দুর্বল হয়ে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বিমান অভিযানের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমান্ডার এয়ার ফোর্স লেফটেন্যান্ট জেনারেল অ্যালেক্স গ্রিংকিউইচ বলেন, ১৬টি আলাদা জায়গায় ৬০টির মতো আক্রমণ চালানো হয়েছে।

এদিকে ইয়েমেনে হামলার পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দামে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। এমনিতেই গত আড়াই মাস ধরে লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের হামলার কারণে বাজার চড়া হওয়ার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছিল। ইয়েমেনে হামলার পর সেই শঙ্কা সত্যি হলো। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর, তেলের দাম বেড়েছে ৪ শতাংশের মতো।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হারিগ্রিয়েভস ল্যান্সডাউনের অর্থ ও বাজারবিষয়ক প্রধান সুসান্নাহ স্ট্রিটার বলেন, ‘হামলার পর তেলের দাম বেড়েছে। গত ডিসেম্বর মাসের শুরুতে যখন হুতিরা লোহিত সাগরে হামলা শুরু করে, তখন ব্রেন্ট ক্রুড তেলের যে মূল্য ছিল, তার তুলনায় মূল্য এখন ৭ শতাংশ বেশি।’

তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের বিমান হামলা অব্যাহত থাকলে ব্রিটিশ সরকারের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি বাড়বে ১০ ডলারের মতো। আর গ্যাসের দামও ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।’

অন্যদিকে বৈশি^ক পণ্যবাণিজ্যও সংকটে পড়েছে। বিশ্বের বড় বড় পণ্য পরিবহনকারী জাহাজ পরিচালনা সংস্থাগুলো লোহিত সাগরপথে না দিয়ে ঘুরে নিয়ে যাচ্ছে জাহাজগুলো। লোহিত সাগরের প্রবেশমুখ বাব আল-মান্দেব প্রণালি এড়িয়ে জাহাজগুলো আফ্রিকা মহাদেশের উত্তমাশা অন্তরীপের কোল ঘেঁষে পশ্চিমের দিকে যাচ্ছে। কিন্তু এতে করে পণ্য পৌঁছতে বাড়তি সময় লাগবে ১০ দিনের মতো। খরচ বাড়বে লাখ লাখ ডলার। অর্থাৎ গোটা পরিস্থিতি পণ্যের দাম বাড়াতে ভূমিকা রাখবে, যা গুনতে হবে ক্রেতাদের।

লোহিত সাগর দিয়ে বছরে বৈশি^ক পণ্যবাণিজ্যের ১২ শতাংশ হয়ে থাকে। সুতরাং এ পথে পণ্য পরিবহনের সংকট গোটা বিশ্বের সরবরাহ শৃঙ্খলে বড় ব্যাঘাত তৈরি করতে যাচ্ছে। প্রায় তিন মাস ধরে জাহাজ চলাচলে সমস্যা হচ্ছিল। তবে এখন চূড়ান্ত সংকটে পড়ল এই জলপথ।

ইয়েমেনের সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্বের সংঘাতের কারণ গাজার যুদ্ধ। গাজায় ইসরায়েলের বর্বর আক্রমণের জবাবে হামাসের পক্ষ নিয়ে লোহিত সাগরে ইসরায়েলমুখী জাহাজে আক্রমণ করে যাচ্ছে ইরান সমর্থিত শিয়া মতাবলম্বী হুতি বিদ্রোহীরা।

ইয়েমেনের জায়দি শিয়া সম্প্রদায়ের নেতা হুসেইন আল হুতির হাতে গড়া হুতি বিদ্রোহীদের সংগঠনের প্রকৃত নাম হচ্ছে ‘আনসার আল্লাহ’। দেশটির সুন্নি মতাবলম্বী সরকারকে উৎখাত করতে গিয়ে তারা গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে যায়। প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর শাসন উৎখাত করতে চাইলে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট তাতে হস্তক্ষেপ করে। ২০১৪ সাল থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এবং সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছিল তারা। ইয়েমেনের এই গৃহযুদ্ধে প্রায় ৩ লাখ ৭৭ হাজার প্রাণহানি ঘটেছে। বর্তমানে তারা সানাকেন্দ্রিক আলাদা প্রশাসন চালাচ্ছে।