একদিকে বিজয়ী দলের শপথ। অন্যদিকে পশ্চিমা জোটের নির্বাচন সুষ্ঠু না হওয়ার বয়ান। এর মধ্যেই মন্ত্রিসভা প্রথম বৈঠকে বসছে আজ সোমবার। এই বৈঠকে সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির দেওয়া ভাষণের খসড়া অনুমোদনের বিষয়টি অনুমিতই ছিল। কিন্তু তার সঙ্গে আর কোনো বিষয় এজেন্ডাভুক্ত না হওয়া অনুমিত ছিল না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ভ্রু কুঁচকেছেন। তাদের মতে, ‘মর্নিং শোজ দ্য ডে’। টানা চতুর্থবার সরকার গঠন করলেও সরকারের কাজে নতুনত্ব থাকবে না। আগে যেভাবে চলেছে, এবারও সেভাবেই চলবে। টানা চারবার ক্ষমতায় এসেও সরকার সেই একই পথে হাঁটবে। এ কারণেই গতানুগতিক ধারায় মন্ত্রিসভা বৈঠকের এজেন্ডা।
রাষ্ট্রপতি সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন। এটা বাংলাদেশের রীতি। কিন্তু সেই ভাষণ যদি মন্ত্রীদের পড়ে দিতে হয়, তাহলে রাষ্ট্রপতির ভাষণের মৌলিকত্ব থাকে না। যদিও এই প্রশ্ন নতুন না। তারপরও রাষ্ট্রপতি কী বলতে কী বলে ফেলেন এই ভরসা নেই! তাই দেখে দেওয়াটাকেই ভালো মনে করে সরকার। এই সুযোগে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে সরকারের উন্নয়নের ফিরিস্তিও দেওয়া যায়। এসব নিয়ে বিতর্ক বহু পুরনো।
নতুন যা, তা হচ্ছে রাষ্ট্রপতির ভাষণের খসড়া তৈরি করা হয়েছে। নতুন মন্ত্রীদের হাতে তা পৌঁছেও গেছে। গতকাল দপ্তরে গিয়ে প্রথম যে গোপনীয় দলিল তারা পেয়েছেন তা হচ্ছে মন্ত্রিসভা বৈঠকের নোটিস। বৈঠকের এজেন্ডায় একমাত্র বিষয়, রাষ্ট্রপতির ভাষণের খসড়া। আরও বহু বিষয় ঝুলে থাকলেও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এই একটি বিষয়ই বৈঠক উপযোগী করতে পেরেছে।
নতুন মন্ত্রিসভার একজন মন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, এজেন্ডায় কী কী বিষয় আছে। জিভ কেটে তিনি ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ফিসফিস করে বললেন, ‘এসব কথা মুখে আনতেও মানা। এবার মন্ত্রিসভা অন্য রকম হবে।’ কিন্তু অন্য রকমের মন্ত্রিসভার নমুনা এজেন্ডায় দেখা যায়নি। এজেন্ডায় সেই বহুল চর্চিত রাষ্ট্রপতির ভাষণই রয়েছে। ভাষণে দেশের সার্বিক পরিস্থিতি, অর্থনৈতিক চিত্র, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী বা দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে নেওয়া পদক্ষেপ রয়েছে। সেই সঙ্গে যেসব সাফল্য এসেছে তার একটি সংক্ষিপ্ত বিবরণ রয়েছে। ডিজটাল থেকে কীভাবে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়া হবে তা থাকছে। দেশে-বিদেশে যে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র, প্রশাসনিক নীতি-কৌশল, ভবিষ্যৎ কর্মপন্থার দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয়েছে।
এ মাসেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর সম্ভাবনা রয়েছে। রাষ্ট্রপতির ভাষণ তৈরির জন্য হালনাগাদ তথ্য-উপাত্ত চেয়ে গত ২৬ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সচিবদের কাছে চিঠি দেয়। তারা এরই মধ্যে তথ্য-উপাত্ত পাঠিয়েছেন। এরই সংক্ষেপিত রূপ আজ মন্ত্রিসভায় তোলা হচ্ছে।
এর আগে ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল নতুন সরকার। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হিসেবে আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত হয়েছিল ৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভা। যার প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২১ জানুয়ারি সোমবার। রাষ্ট্রপতির ভাষণ ছাড়াও ওই মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে আরও পাঁচটি বিষয় ছিল। এগুলো ছিল গণপ্রতিনিধিত্ব (সংশোধন) আইনের খসড়ার নীতিগত অনুমোদন, ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) আইনের খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন, জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদ আইনের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন, বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্র আইনের নীতিগত অনুমোদন এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সুরক্ষা বিধিমালা-২০১৫-এর আলোকে প্রতিবন্ধীবিষয়ক জাতীয় কর্মপরিকল্পনার খসড়ার অনুমোদন।
এদিকে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীরা নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন। গতকাল রবিবার বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীদের বরণ করে নেওয়া হয়েছে। কোনো কোনো মন্ত্রণালয়ে তাদের সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে টানা চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেওয়ার পর ৩৭ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন শেখ হাসিনা। এর মধ্যে ২৫ জন পূর্ণ মন্ত্রী এবং ১১ জন প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। শপথ পড়ানোর পরই মন্ত্রীরা তাদের পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনা ও প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে। ধারাবাহিক উন্নয়নে যেসব কাজ বাকি আছে সেসব তো করবেনই, সেই সঙ্গে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ের কথা জানিয়েছেন তারা।