পদ্মায় ফেরিডুবিতে তিন রকম ভাষ্য নিখোঁজ ১

মানিকগঞ্জের পাটুরিয়ায় পদ্মা নদীতে ৯টি পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান নিয়ে ডুবেছে রজনীগন্ধা নামে একটি ফেরি। পাটুরিয়া ৫ নম্বর ফেরিঘাটের অদূরে গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। ডুবে যাওয়া ফেরি থেকে ২০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও একজন নিখোঁজ রয়েছেন।

এই ফেরিডুবির কারণ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) কর্মকর্তারা বলেন, বালুবাহী বাল্কহেডের ধাক্কায় ফেরিটি ডুবে যায়। অন্যদিকে নদীতে ডুবোচরে ধাক্কা খেয়ে তলা ফেটে ফেরিটি ডুবেছে বলে ভাষ্য নৌ-পুলিশের। আর ফেরিতে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, পানি উঠে কাত হয়ে ধীরে ধীরে ফেরিটি তলিয়ে যায়।

জানা গেছে, গত মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাট থেকে পাটুরিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে আসে ইউটিলিটি (ছোট) ফেরি রজনীগন্ধা। ফেরিটিতে ছোট-বড় ৯টি ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ছিল। ঘন কুয়াশার কারণে রাত দেড়টার দিকে ফেরি চলাচল বন্ধ করে দেয় নৌ-কর্র্তৃপক্ষ। ফেরিটি তখন মাঝ নদীতে নোঙর করে রাখা হয়। পরে ভোর ৪টার দিকে পাটুরিয়া প্রান্তের ৫ নম্বর ঘাটে আসে ফেরি। কিন্তু ঘাট খালি না থাকায় ২০০ মিটার দূরে ফের নোঙর করে রাখা হয় ফেরিটি। পরে গতকাল সকাল ৮টার পরপরই রজনীগন্ধা ফেরিটি ডুবে যেতে থাকে। তখন ফেরিতে থাকা যানবাহনের চালক, তাদের সহকারী ও ফেরিটির কর্মীরা নদীতে ঝাঁপ দেন। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, নৌ-পুলিশ ও বিআইডব্লিটিসির লোকজন ট্রলার নিয়ে ঘটনাস্থলে যায়। এর আগেই নদীতে ঝাঁপ দেওয়া কয়েকজন সাঁতরে নদীর তীরে ওঠেন। এ ছাড়া ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা কয়েকজনকে উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসেন। এভাবে ২০ জন উদ্ধার হন। এরই মধ্যে ফেরিটি যানবাহন নিয়ে পানিতে তলিয়ে যায়। পরে বিআইডব্লিউটিএর উদ্ধারকারী জাহাজ হামজার মাধ্যমে ফেরিটি থেকে একটি ট্রাক উদ্ধার করা হয়।

নৌ-পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় ফেরিটির সহকারী ইঞ্জিন কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির (৩৯) নিখোঁজ আছেন। তিনি পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়নের মাটিভাঙ্গা গ্রামের আবদুল লতিফের ছেলে।

নিখোঁজ হুমায়ুনের ছোট ভাই রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ফেরির স্টাফরা আমাকে বলেছেন, ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে স্যার (নিখোঁজ হুমায়ুন) সবাইকে ফেরি থেকে নামতে সতর্ক করেন। সবাই জীবিত উদ্ধার হলো। অথচ আমার ভাই সবাইকে সতর্ক করে নিজেই নিখোঁজ। আমার ভাইয়ের এক ছেলে ও দুই মেয়ে রয়েছে।’

ক্ষতিগ্রস্তদের আকুতি : ট্রাকচালক সাজ্জাদ হোসেনের বাড়ি কুষ্টিয়ার। ট্রাকের চাকা ঘুরিয়ে চলে সংসার। সেই ট্রাক ডুবে গেছে পদ্মায়। এতে নিজে বেঁচে ফিরলেও সাজ্জাদের চিন্তা পেটের, সংসারের। ডুবে যাওয়া রজনীগন্ধা ফেরিতে থাকা একটি ট্রাকের চালক সাজ্জাদ। বিকেলে পদ্মার কিনারে দেখা যায় সাজ্জাদকে। বেঁচে ফেরার আনন্দ ভুলে তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। সাজ্জাদের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেই তার প্রথম প্রশ্ন, ‘আমার ট্রাকটা কবে ফিরে পাব?’

সাজ্জাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কবে ট্রাক পাব, কবে ট্রাক নিয়া রুটে নামব। ট্রাক না চললে আমার পেট চলব কেমনে?’

তিনি বলেন, ‘কাঁচপুরে মাল নামাতে পারলেই মিলত রোজের টেহা। টেহা পাইয়া মোবাইলেত পাডামু কইছিলাম বউরে। এহন আমার ট্রাকটিই পাইতিছি না। কী পরিমাণ ক্ষতি অয়ছে, ট্রাক পাইলে বুঝতাম। এহন আমার টাকা দ্বার করা ছাড়া উপায় নাই।’

ডুবে যাওয়া ট্রাকে ছিলেন ব্যবসায়ী শহিদুল ইসলাম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি ঋণ করে চামড়ার ব্যবসা শুরু করছি। ১৪ লাখ টাকার পশুর চামড়া নিয়ে যাচ্ছিলাম সাভারের হেমায়েতপুরে। বিকেল ৫টা পর্যন্ত আমার ট্রাকের হদিস পাইনি। চামড়া যদি ট্রাকে থাকে তাহলে আমার ক্ষতির পরিমাণ কম হবে। চামড়া সম্পূর্ণ নষ্ট কিংবা হারিয়ে গেলে আমার পথে বসা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না।’

আরেক ট্রাকমালিক সোলায়মান হোসেন বলেন, ‘আমার সব মিলিয়ে প্রায় কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আমার নিজের ৬০ লাখ টাকার মাল আর ৩০ লাখ টাকার ট্রাক। আমি এখন শেষ হয়ে গেলাম।’

মানিকগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক মো. আব্দুল হামিদ জানান, বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে ডুবে যাওয়া ফেরি থেকে একটি কাভার্ড ভ্যান উদ্ধার করা হয়েছে। বাকিগুলো উদ্ধারে কাজ চলছে।

বিআইডব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাট শাখার ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মোহাম্মদ সালাউদ্দিন বলেন, বাল্কহেডের ধাক্কায় ফেরিটি ডুবে গেছে।

তবে নৌ-পুলিশের ফরিদপুর অঞ্চলের পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান বলেন, নিচের অংশ ছিদ্র হয়ে ফেরিটি ডুবে গেছে।

মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক রেহেনা আকতার জানান, এ ঘটনায় ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছেন। এ ছাড়া নৌ-মন্ত্রণালয় আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

এর আগে ২০২১ সালের ২৭ অক্টোবর ১৭টি ট্রাক, একটি প্রাইভেট কার ও ৮টি মোটরসাইকেল নিয়ে দৌলতদিয়া ঘাটে ডুবে যায় রো রো ফেরি শাহজালাল।