ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেছে, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল একপক্ষীয় ও পাতানো প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। নির্বাচন অবাধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়নি। এ ছাড়া নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা শতভাগ আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন। ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রক্রিয়া ট্র্যাকিং’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনে এই দাবি করেছে টিআইবি। গতকাল বুধবার রাজধানীর ধানম-িতে নিজেদের কার্যালয়ে এই গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির জ্যেষ্ঠ গবেষক মাহফুজুল হক, নেওয়াজুল মওলা ও সাজেদুল ইসলাম।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। এটি ছিল নির্বাচনকেন্দ্রিক প্রাথমিক গবেষণা প্রতিবেদন। পরে চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে টিআইবি। গবেষণায় ৫০টি আসন দৈবচয়ন পদ্ধতিতে বাছাই করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সব বিষয়ের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনে শেষের এক ঘণ্টায় ১৫.৪৩ শতাংশ ভোটসহ ৪১.৮ শতাংশ ভোট পড়া বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপিসহ ১৫টি নিবন্ধিত দলের অনুপস্থিতি ও তাদের নির্বাচন বর্জনের কারণে অন্তত ২৪১টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক দেখাতে আওয়ামী লীগ নিজ দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থী দিয়ে নির্বাচন করলেও বেশিরভাগ আসনে নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়নি। নির্বাচনের এমন প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। সারা দেশে অধিকাংশ ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাড়া অন্য দলের প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট ছিলেন না। প্রতিপক্ষের প্রার্থীদের এজেন্টদের হুমকির মাধ্যমে কেন্দ্রে প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখা হয়। ভোটের দিন স্বল্প ভোটার আগমন এবং ডামি লাইন তৈরি করে বিভিন্ন আসনে অন্য দলের প্রার্থীর এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ভোটের আগে ব্যালটে সিল মারা, ভোট চলাকালে প্রকাশ্যে সিল মারাসহ আওয়ামী লীগের পরাজিত প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগ থেকে প্রতিবেদনের এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, তফসিল ঘোষণার আগে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা গড়ে ব্যয় করেছেন ১ কোটি ৬৭ লাখ ৮০ হাজার ১০২ টাকা। আর নির্ধারিত সময়ে ব্যয় করেছেন ১ কোটি ৪৮ লাখ ৯৪ হাজার ১৬৭ টাকা। এমনও দেখা গেছে, তফসিল ঘোষণার আগে ও পরে মিলিয়ে শুধু একজন প্রার্থীই ৩৮ কোটি ৭৭ লাখ ১০ হাজার ১৪৪ টাকা ব্যয় করেছেন। তবে টিআইবি তার নাম প্রকাশ করেনি।
গবেষণায় দেখা যায়, তফসিল ঘোষণার আগ থেকে নির্বাচন পর্যন্ত নির্ধারিত ব্যয়সীমার বেশি ব্যয় করেছেন ৬৫ দশমিক ৭৭ শতাংশ প্রার্থী। প্রার্থীদের নির্বাচনী ব্যয় ২৫ লাখ টাকা নির্ধারিত থাকলেও দ্বাদশ নির্বাচনে তা হয়েছে গড়ে ১ কোটি ৫৬ লাখ ৮৩ হাজার ৭৭ টাকা, যা নির্ধারিত পরিমাণের ছয় গুণ বেশি। সবচেয়ে বেশি ব্যয় করেছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা, যা ১১ দশমিক ৪৫ গুণ বেশি। বিজয়ী প্রার্থীরা গড়ে ৩ কোটি ৯ লাখ ৫৬ হাজার ৪৩৮ টাকা ব্যয় করেছেন। বিজয়ী একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ৩৮ কোটি ৭৭ লাখ ১০ হাজার ১৪৪ টাকা ব্যয় করেছেন। সর্বনিম্ন একজন প্রার্থী ব্যয় করেছেন ১৬ লাখ ৪৫ হাজার টাকা।
গবেষণায় ৫০টি আসনে ১৪৯ জন প্রার্থীর বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৮ জন প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো না কোনো ফৌজদারি মামলা রয়েছে। তারা সবাই আওয়ামী লীগের প্রার্থী। তাদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ আগে কখনো নির্বাচনে অংশ নেননি। আওয়ামী লীগ মনোনীত শতভাগ প্রার্থী কোনো না কোনো আচরণবিধি ভেঙেছেন। ভোটারদের অর্থ প্রদান এবং তাদের ওপর বল প্রয়োগ করেছেন ৪০ শতাংশ আওয়ামী লীগ প্রার্থী। ৮৫ দশমিক ৭ শতাংশ ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা দেখা গেছে। জোর করে ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে ৫৫ শতাংশ ভোটারকে, বুথ দখল ও সিল মারার ঘটনা ৫১ শতাংশ।
টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে পেশাজীবী, তারকাখ্যাতি এবং একসময় গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দায়িত্ব পালন করেছেন এমন ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বেছে নেওয়া হয়েছে। এ রকম ৪০ জনকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসক ছিলেন ১৬ জন, সাবেক সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তা ৭, খেলোয়াড় ৬, সাবেক আমলা ৫, সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান পরিবারের সদস্য ৩, অভিনেতা ও শিল্পী ৩, শিক্ষক ও প্রকৌশলী ৩ এবং সাংবাদিক ১ জন।
গবেষণার সার্বিক পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে দুই বড় দলের বিপরীতমুখী ও অনড় অবস্থানের কারণে অংশগ্রহণমূলক ও অবাধ নির্বাচন হয়নি। এই বিপরীতমুখী ও অনড় অবস্থানকেন্দ্রিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের লড়াইয়ে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের জিম্মিদশা প্রকটতর হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ক্ষমতায় অব্যাহত থাকার কৌশল বাস্তবায়নের একতরফা নির্বাচন সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। যার আইনগত বৈধতা নিয়ে কোনো চ্যালেঞ্জ হয়তো হবে না বা হলেও টিকবে না। তবে এই সাফল্য রাজনৈতিক শুদ্ধাচার, গণতান্ত্রিক ও নৈতিকতার মানদণ্ডে চিরকাল প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে।’