ভারতের উত্তরপ্রদেশে রামমন্দির নির্মাণকাজ শেষ মুহূর্তে। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আগামী ২২ জানুয়ারি রাম মন্দির উদ্বোধনের অনুষ্ঠান ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে। রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় চলছে এলাহি কারবার। ‘ভগবান’ রামের ‘কথিত জন্মভূমিতে’ মন্দির নির্মাণের প্রকল্পকে বিশ্লেষকরা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পুনর্নির্বাচনের মঞ্চ বলছেন। বিরোধীদের সমালোচনা যেন কোনোমতেই হালে পানি পাচ্ছে না। ১৬ শতকে নির্মিত ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ হিন্দুত্ববাদীরা ভেঙে ফেলে নব্বইয়ের দশকে। আদালতের নির্দেশে সেই বিতর্কিত জমিতেই চলছে মন্দির নির্মাণের কাজ। আগামী লোকসভার নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার যখন কিছু সপ্তাহ বাকি তখন, বিজেপি এবং তার আদর্শিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) নরেন্দ্র মোদিকে সামনে রেখে আরও একবার নির্বাচনী সাফল্য ঘরে তুলতে মরিয়া। এই আয়োজনে মোদির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সব হিন্দুত্ববাদী সংগঠন।বিরোধী রাজনীতিকরা এরই মধ্যে অভিযোগ করতে শুরু করেছেন, অযোদ্ধায় রাম মন্দির উদ্বোধনের অনুষ্ঠানটিকে ঘিরে বিজেপি নির্বাচনী অঙ্ক কষছে। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী গত বুধবার ‘ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা’ থেকে অভিযোগ করেছেন, রাম মন্দির অনুষ্ঠানটি নরেন্দ্র মোদির অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। উদ্বোধনী দিনে ৬ হাজারের মতো অতিথিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। মঞ্চ আলো করে মোদির সঙ্গে থাকবেন উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ, বি হিন্দু পরিষদের প্রধান মোহন ভগবত। ভারতের প্রধান প্রধান সরকার-প্রভাবিত গণমাধ্যগুলোতে এমনভাবে সংবাদ প্রচার করা হচ্ছে, নরেন্দ্র মোদি মন্দির নির্মাণের এই অসম্ভব প্রকল্পকে বাস্তব রূপ দিয়েছেন। সেইসঙ্গে চলছে বিরোধীদের তুলোধুনো করা। অযোদ্ধার রাম মন্দির কার্যক্রমকে ঘিরে গত দুই তিন মাস ধরেই ব্যাপক প্রচার চালাচ্ছে বিজেপি ও হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো। পুরো বিষয়টিকে এমনভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, এটি যেন ভারতের একটি সামাজিক কোনো আন্দোলন। রাম মন্দিরকে কেন্দ্র করে শুধু যে মন্দিরই হচ্ছে তা নয়, বরং একে কেন্দ্র করে পর্যটন থেকে শুরু করে, যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনা হচ্ছে। মন্দির উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে যেন উন্মাদনা চলছে। সবচেয়ে বড় কথা, নরেন্দ্র মোদির সরকার মন্দির তৈরির কাজকে নিজের সরকারের সবচেয়ে অগ্রাধিকারপূর্ণ কাজে পরিণত করেছেন। এতে বিনিয়োগ থেকে শুরু করে যাবতীয় খাতে অঢেল অর্থ ঢালছেন। গতকাল বৃহস্পতিবার পোস্টাল কার্ড চালু করেছেন মোদি। আর এসবের কেন্দ্রে রয়েছেন একজনই, তিনি হচ্ছেন মোদি। সরযূ নদীর তীরের নগরী অযোদ্ধাকে কেন্দ্রীয় সরকার তীর্থযাত্রী ও পর্যটকদের জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা করেছে। সেখানে সড়কগুলোর কলেবর বৃদ্ধি করা হচ্ছে, নতুন এয়ারপোর্ট তৈরি করা হয়েছে এবং রেলস্টেশনকে সম্পূর্ণ ঢেলে সাজানো হয়েছে। পুরো নির্র্মাণকাজের জন্য বাড়িঘর, দোকানপাটসহ নানা ধরনের প্রায় তিন হাজারের মতো স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে। নতুন করে নির্মিত হচ্ছে প্রায় ৫০টির মতো হোটেল এবং হোমস্টে। ভারতে আগামী লোকসভায় মোদিকে প্রচারের আলোর কেন্দ্রে রাখতে তৎপর সব হিন্দুত্ববাদী শক্তি। মোটাদাগে রাম মন্দির আন্দোলনের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, এই আন্দোলনের অগ্রভাগে দেখা গেছে বিজেপির অন্যতম বর্ষীয়ান নেতা লালকৃষ্ণ আদভানিকে। রাম মন্দির আন্দোলনকে বেগবান করতে আদভানি যেভাবে ভারত জুড়ে রথযাত্রা শুরু করেছিলেন, তখন মোদি ছিলেন তার ছায়াসঙ্গীর মতো। কিন্তু বিজেপি ওই সময় সর্বভারতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ততটা শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু গত দশকের গোড়ার দিকে বিজেপি যখন ভারতের ক্ষমতায় প্রথম আসীন হলো, তখনো কেউ কল্পনা করেনি, রাম মন্দির সত্যি সত্যি বাস্তবে রূপ দেবে ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা। এখন তাই আদভানিকে প্রচারের আলোর বাইরে রেখে মোদিবন্দনা চলছে। গত দুটি লোকসভায় প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসকে কার্যত ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় বসেছে বিজেপি। আরও একবার মোদি-ম্যাজিক দেখাতে চায় বিজেপি।